বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই, ২০১৪

হিমানী

হিমানী,
রাতের সাগরে ঝিনুকের সন্ধানে বাইশ বছর হেঁটেছি। ভাসমান জলে কিছু কচুরিপানার স্পর্শে অনুসন্ধানী মনটা জেগে উঠতো ;ভাবতাম এই বুঝি পেয়ে গেলাম স্বপ্নের সমান ঝিনুক ;যে ঝিনুকের মালার আদলে বাকিটুকু সময় যাপন করা যায়। কিন্তু না! যাপিত কচুরিপানা কখনো মনের দাবি পূর্ণ করতে পারে না, পারার কথা নয়।
তাই ভাবি বিষ্ণু দে কেন সাইনারার প্রার্থনা করেন, কেন বলে উঠেন "লেকে আজকাল সকলেই যায়/ ভালো লাগেনিকো তোমার যাওয়া।  মিশে গেলে তুমি সাধারণে হায়!  "
 শিল্পীত মনের রোদেলা আকাশে পাখি উড়তে পারে না, সেখানে মনপাখির উড়াউড়ি, ঘুরাঘুরি। আর মন তো অরশ্রী মার্কেট পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় সেঁজুতির আন্তরিক কামনায়, ব্লাক হাউজের চিত্রকর্মে নয়, চিত্রশিল্পীর মনের রৌদ্র-ছায়া বনে। তাই নারী কিংবা পুরুষ প্রজাপতি দেখে কিন্তু প্রজাপতি পায় না! আর প্রজাপতি মহাকালর্ষি একাকিত্ব ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি কষ্ট চাষাবাদ করে। ফলে সমকালীনমন হয়ে যায় কষ্টের খামার! তুমিও সে খামারবাড়ির এককালীন সদস্য, ভুলের ফুলের বাগান।
জানো
ভুলের একটি মহান শক্তি হলো তা মানুষকে চিন্তাশীল করে । চিন্তাশীল মানুষদের একটি জীবন থাকে, মৌলিক জীবন। মৌলিক জীবনের কাছে মৌমাছি আসে, জীবনের ঘ্রাণে নয় মৌয়ের  টানে। আহারে বেচারা মাছি! মৌ চিনেছিলো, মৌয়ের জীবন চিনে নি! তাতেও দুংখ নেই, দুংখ কেবল এই জন্য যে আজীবন মৌমাছি মৌজীবনের খোঁজও পাবে না, পাওয়ার কথা না।
কেন যেন!
আমার যাত্রাপথ  পরিবর্তন হলো। রাতের সাগরে নৌকা চালানোর নেশা থেকে মন উঠে গেল। সূর্যের বালুময় আলোতে পথ চলতে শুরু করি, পথ চলতে শুরু করি গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথে। হাঁটতে হাঁটতে এক নাগ কেশরের হাহাকার শুনতে পাই, আমার মায়াবতী মন তার কাছে গিয়ে শীতল এক প্রশান্তি অনুভব করে, এমন এক প্রশান্তি যে প্রশান্তির খোঁজে জীবনানন্দ মহাকাল, মহাদেশ ঘুরে বার বার বনলতার কাছে ফিরে আসতেন। বিস্মিত হওয়ার বিষয় নাগ কেশরের হাহাকার এতই পরিশীলন পরিশীলিত যে আমার মনের নদী-নালাকে কানায় কানায় পূর্ণ করে দিলো। বুঝলাম, হাহাকারই কেবল সকল হাহাকার থামিয়ে দিতে পারে।
আমরা এখন মালতী ফুলের চাষ করি। আমাদের বাগানে আমরাই মালী, আমরাই ফুল।  বিরহ - মধুর সলিল ছন্দে বয়ে চলে ফুলেল জীবন, জীবনের গান, ঘ্রাণ।
সুজাতা এখন পৃথিবীর মিষ্টান্ন মাথায় নিয়ে প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ গৌতম মানুষের অভিমুখী , চলেও আসবে। এখন শুধু সময়ের পালাক্রমে মাটিতে রসের আন্তর্জালে টুইটুই হওয়ার পালা।
তবে হ্যাঁ
হিমানীফুল যেন মাগরিব পর্যন্ত আমার পাশে থাকে, তবে আমি কিংবা আমরা মালতী ফুল, অজস্র ভুল হওয়ার যোগ্যতা রাখি, রাখবো।
ভুলের নৈতিকতা নান্দনিকতাকে সত্যায়িত করে। ভুলগুলো জীবনকে ফুলময় করে। তবে আমাদের ভুল যেন রুমালভুল না হয়!
কথা দাও দূরে যাবে না, জমানো বরফ হয়ে আমার সাগরে ভেসে থাকবে। আবার যখন জলীয় বাষ্পে ছড়িয়ে যাবে প্রকৃতির কুলকুল তালে আমি তখন ছন্দ হবো, তোমার চলার অদৃশ্য জোয়ার, তোমার আন্তাণুবিক দূরত্বে থেকে মজনু নয়, লায়লি -মজনু হবো-- ইতিহাস নয়, সময়ের পাতায়। তুমি প্রত্যুষে শাদা শাড়ি পড়ে মন্ত্রপাঠপূর্বক আমার দিকে তাকাবে, আমি তখন লজ্জায়  করিমুরি, তোমার মন্ত্রের বিনীত পাঠক--
'' আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সে ভাগ্যবানই আমার ধর্ম "
তখনই মনে পড়বে রাতের সাগরে ঝিনুক খোঁজার কথা, আমি মনে মনে হাসবো, আর তোমাকে পড়াবো হাসির সুতোয় বানানো অহংকারের পোশাক যা হবে মেলার মাঠের মতো উদার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন