রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

সবাই ভোগী তিনিই কেবল যোগী

 — আম্মু, চলো আমরা বাইরে যাই। 

— না, মা। আমরা বাইরে যাবো না। 

— কেনো আম্মু? 

— বাইরে আমরা নিরাপদ না, মা! 

— আম্মু কেনো নিরাপদ না? 

— বাইরে ভয়ঙ্কর স্বার্থপর লোক বাস করে? 

— আম্মু, কাল দুপুরে আব্বু তোমাকে স্বার্থপর বলেছিল না? 

— অই চুপ কর, তর বাপ একটা বিজলা স্বার্থপর।  

— আম্মু বিজলা কি? 

— বিজলা অইলো তর মাথা— বুঝা লাগবো না, ঘুমা।

শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

একটু পরে ট্রেন

 — সারারাত জার্নি আজ। 

— কই যাবেন?

—ফেনী ফিরবো। একটু পর ট্রেন।


— আজকের চাঁদ সুন্দর। সুন্দর চাঁদ আর ট্রেন— চমৎকার। খুবই ভালো জার্নি হবে।


— চমৎকার হবার কারণ নাই।  শোভন টিকেট তার উপর একা।


— আপনি একা নন। আপনার সাথে আমাদের আশীর্বাদ আছে ত। যার সাথে আশীর্বাদ থাকে মাটিকে সে স্বর্গলোক  করে তুলে।


— বাংলা সাহিত্যে পড়েছেন না?


— হুম। Blessing is a strong ever bullet proof bin.


এসব সাহিত্য টাহিত্য নিয়ে যত কম ঘাটাঘাটি করবেন তত ভাল থাকবেন বিলিভ মি। এই সাহিত্যে পড়ে আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। স্থূল চিন্তার মানুষের ভিড় দমবন্ধ লাগে।


—সত্য বলেছেন। সঠিক বলেছেন। When life is thought, thought is dangerous. We look for before and after and pine for what is not.


— দুনিয়াদারি ভাল লাগে না! অসহ্য! 


— জানেন আমার কাছে পৃথিবীর কোনো মিনিং নেই তারপর মিনিং খুজঁতে থাকি।


— মিনিং খুঁজে লাভ নেই। 


— একটি শিশির কনা হয়তো মিনিং হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে যাবে।

— শুভকামনা।


আরেকটি কথা, সাহিত্যের কারনেই মানুষ কেবল আমার কাছে মানুষ নয় ভিন্ন কিছুর ছায়া, সাহিত্যের কারনেই মানুষকে ভালোবাসতে পারি, শ্রদ্ধা করতে পারি।


— আমিও একসময় তাই ভাবতাম। তবে শিশির কণা না এসে রীতিমতো জলোচ্ছ্বাস এসেছে আর ভেঙেচুড়ে দিয়ে গেছে সব মাঠঘাট প্রান্তর।


— Things fall apart—  অনেক ভাঙনের পর এক সৃষ্টি।


— Yes things fall apart and centre will not hold anymore. 


— Every center hold for certainly center and center is almost margin. আনন্দের সীমান্তে গেলে মানুষের জ্ঞান থাকে না, কষ্টের সীমান্তে গেলে মানুষের জ্ঞান থাকে না, মানুষ মধ্যবর্তী ফলবতী ফলভোগী গাছ।


—কোন সীমান্তই নেই আমার ধারেকাছে। অদ্ভূত আঁধার এক। 


— জানেন অন্ধকারই একমাত্র চরিত্রবান। 

— কি জানি! 


— ফেনী পৌঁছে যাবেন চারটায়?


— ট্রেন তো আসলো না এখনো। লেইট। 


— ট্রেনের নাম কী?

— উদয়ন। 

— কী সুন্দর নাম!

— হু। বাংলাদেশের সব ট্রেনের নামই কম বেশি সুন্দর শুধু কালনী ছাড়া। 

— হা হা হা। 


— 😐। কেমন একটা কালনাগিনী ভাব আছে। 

— কেন মা কালী ভাব নেই?


— ট্রেন আসছে।  ট্রেনে উঠে কথা বলছি। 


— ঠিক আছে। 


— অতঃপর ট্রেন আসিলো।  আর আমি চাপিয়া বসিলাম। 


— সাথের মহিলা কী ফেনীই যাবেন? 


—সাথে মহিলা কি করে নিশ্চিত হলেন?


— যেহেতু চাপিয়া বসিলেন। 

— 😃। 

— অ। 

— তাহলে সাথে কে?


— সাথে  একজন মহিলাই। অপরিচিতা। 


—অপরিচিতা কারো কাছ থেকে কিছু খাবেন না কিন্তু। 

— হু। 

— আপনার বাড়ি কোথায়?

— ব্রাক্ষণবাড়িয়া এবং পৃথিবী, পৃথিবী আমার বাড়ি।

শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

পাবজিখা ভ্যালি

শুনেন একটি কথা বলি। আপনি আমার কথা শুনতে বাধ্য নন। আমি বলে যাবো আমার কথা। পাবজি ভ্যালি কিংবা পাবজিখা ভ্যালি ইজ মোর দ্যান সুইজারল্যান্ড। আপনি বলতেই পারেন কোথায় বান্দরবান আর কোথায় বৃন্দাবন।  আপনার কথা আপনার কাছেই জমা থাকুক। আমি বলে যাবো আমার কথা।  ভুটানের পাবজি ভ্যালিতে যে পরিমাণ সান আছে, যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে, যে পরিমাণ স্বচ্ছ জল আছে, যে পরিমাণ প্রাকৃতিক বৈচিত্র আছে সেই পরিমাণ সামগ্রিক কিছু সুইজারল্যান্ডে নাই মিয়া ভাই। আপনি বিশ্বাস করার দরকার নাই, সুযোগ থাকলে প্রমাণ করে দেখাবেন আশা করি। 


পাবজিখা ভ্যালিতে শীতে অতিথি পাখি আসে। এবং এই অতিথি পাখির জন্যে ভুটান সরকার সারাবছর এই ভ্যালিতে চাষাবাদ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।  রাতে যাতে বন্যপ্রাণী অতিথি পাখির কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করেছে। ব্লাক নেক ক্রেইন নামে দারুণ দুটি পাখি দেখেছি সেখানকার জাদুঘরে। পাখি দুটি অসুস্থ হয়ে যায়। অসুস্থ দুটি পাখিকে সুস্থ করে ভুটান সরকার। এই উপমহাদেশের আথিতেয়তা পেয়ে পাখি দুটি ভুলে যায় নিজ দেশে ফেরত যেতে। একজনের নাম  রেখেছে প্রেমা, আরেকজনের নাম রেখেছে কর্মা। কে রেখেছে নাম?  ভুটান কর্তৃপক্ষ। 


অতিথি পাখি নিয়ে দারুণ একটি জাদুঘর দেখতে পাই পাজজি ভ্যালিতে।  পাখির জন্যে এমন সুন্দর আদর ভুটানের সুন্দর মানসিকতার পরিচয় বহন করে। অবশ্যই বহন করে।


ভুটানে এখন বসন্ত। এবং আজকে মে মাসের এগারো তারিখ। দুই হাজার ছাব্বিশ সাল।  তাপমাত্রা এগারো ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাবজি ভ্যালিতে হাটছি। হাতে ক্যামেরা। দুই পাশে পাহাড়। মাঝখানে তৃনভূমি। ঘাস খাচ্ছে ঘোড়া।  তৃনভূমির মাঝদিয়ে বয়ে গ্যাছে বাঘের চোখের মতো তৎক্ষনাৎ সজাগ সর্পিল রাস্তা।  সেই রাস্তা দিয়ে হাটছি।  রাস্তার দুই পাশে ঘাস খাচ্ছে গরু। এই গরুগুলো বাংলাদেশের গরুর মতো নয়। শরীরের লোম বটগাছের নিচেবসা ধ্যানরত সাধুর চুলের মতো। এই রাস্তাটি যখন পাহাড়ের পাদভূমিতে যায় ঠিক তখনই ঘন জঙ্গলের পাশ দিয়ে যেতে হয় পাবজি ভ্যালির মূল  শহরে।  


ভাবছি মূল শহরে যাবো। একা একা। হেটে হেটে।  হাতে ক্যামেরা। দেখছি দূরের সেই পাহাড়ের পাদদেশের রাস্তা দিয়ে কারা যেনো আসছে।  কাছে আসতেই দেখি বিউটিফুল এক মানবী।  বিউটিফুল মানে বিউটিফুল। রোমানিয়া তার বাড়ি। নারীর হাতে ক্যামেরা। এবং আমার হাতে ক্যামেরা।  বিউটিফুল মানবীর সাথে দুইজন গাইড। 


মানবীকে জিজ্ঞেস করলাম— Is that any tiger through that jungle?  


মানবী সিরিয়াস মোডে উত্তর দিলো— There is no tiger but beautiful deer. You should careful about that beautiful deer. 


আমি সিরিয়াস মোডে ভয় পাওয়ার চেষ্টা করলাম।  আমার অভিনয়কে সে বাস্তব মনে করে আমাকে স্বাভাবিক করার জন্যে সে হেসে হেসে বললো— Just kidding.  


ঠিক তখন আমি তাকে বললাম— I am in proof that you are that beautiful deer and I am always very much careful about you. 


আমার কথা শুনে তারপর সে এমন এক হাসি দিলো যেনো  পাবজি ভ্যালির সৌন্দর্যে অতিথি পাখি এসে নামলো। 

তারপর আর কথা বাড়লো না আমাদের। বাড়লো না ঠিক নয়— কথা বাড়ালাম না। কিছু সৌন্দর্য দূরত্বেই ভালো লাগে।


হাটছি— সেই পাহাড় পাদদেশের রাস্তার দিকে। পাহাড় পাদদেশের রাস্তায় গিয়ে মনে হলো আর নাই যাই।  এই রাস্তায় মায়াময়ী টান আছে। ফিরতে পারবো না শেষে। রাত হয়ে যাবে।  


ভ্যালির তৃনভূমির কাছে ফিরে আসি। ফিরে আসি ঘোড়া আর গরুর কাছে।  একটা গান লেখার চেষ্টা করছি। লিখেও ফেলছি। কাউকে শুনাতে পারলে ভালো লাগতো।


হঠাৎ দেখি এই নীরব রাস্তা দিয়ে এক নারী হেটে আসছে— লেইফ রাইট লেইফ রাইট ভঙ্গিতে।  বললাম— আমি কী তোমার সাথে হাটতে পারি। সে বললো— অবশ্যই।  নারীর সাহস দেখে ভালো লাগলো।  অবশ্যই আমার কাছে যা সাহস মনে হচ্ছে ভুটানের জীবনে তা স্বাভাবিক।


হাটতে হাটতে তার সাথে গল্পে জমে গেলাম। জানলাম তার নাম কর্মা। নাম শুনে অতিথি পাখির কথা মনে পড়লো। তার স্বামী এখানকার নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। সে পরিপূর্ণ হাউজওয়াইফ।  হাটতে হাটতে আমার সদ্য লেখা গানটি শুনালাম। সে গানটির অর্থ জানতে চায়লো। আমি তাকে অর্থ শুনালাম।  সে বললো— খুবই সুন্দর কথা এবং মিষ্টি সুর।  এবং সে জানতে চায়লো— আমি গায়ক কিনা।  গান গাওয়ার চেষ্টা করি— বললাম তাকে।  তারপর আমরা আরও হাটলাম। অন্ধকার নেমে আসবে প্রায়। সে চললো তার বাড়ির দিকে, আমি চল্লাম my home resort এর দিকে।  আমি তাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ এক্সারসাইজ শেখালাম। কর্মা আমাকে শেখালো কেমন করে অতিথিদের দাওয়াত দিতে হয়।  সন্ধ্যা নেমে এলো। আমি নামলাম আমার অভিসুন্দর রুমে যেখান থেকে পাজভি ভ্যালির সেই বিখ্যাত পাহাড়টি দেখা যায় যেখানে মেঘ আর পাইন গাছ একসঙ্গে অভিসারে যায়।

সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

সোনার বাংলা

নৌকা যেমন জলে বাঁচে

ধান বাঁচে শিষে 

নদী বাঁচলে কৃষক বাঁচে

সোনার বাংলাদেশে

রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

নোবডি এন্ড সামবডি

নোবডি হওয়ার চর্চা আসলে হারিয়ে যাওয়া নয়— বরং নিজেকে সীমাবদ্ধ ‘আমি’ থেকে মুক্ত করা। যখন মানুষ নিজের অহংকে ধীরে ধীরে সরিয়ে রাখে তখন সে আর আলাদা কোনো সত্তা হয়ে থাকে না— সে প্রবাহ হয়ে যায়, অনুভব হয়ে যায়, এক ধরনের অদৃশ্য শক্তির মতো কাজ করতে থাকে— যেন উচ্চ কম্পাঙ্কে চলা এক নীরব অস্তিত্ব— যার উপস্থিতি আছে কিন্তু কোনো দাবি নেই।


এই চর্চা গভীরভাবে ব্যক্তিগত। এখানে ভাষা অনেক সময় ব্যর্থ হয়, আর ব্যাখ্যা অনেক সময় বিভ্রান্ত করে। তাই নোবডি হওয়ার পথটা একান্তই নিজের— নিঃশব্দ, সংযত, আর সচেতন।


যোগাযোগের মুহূর্তে তাই প্রয়োজন সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা— কারণ সব অনুভব প্রকাশের জন্য নয়, কিছু অনুভব কেবল উপলব্ধির জন্য।


নোবডি মানে নিজের ইগো বা ‘আমি’ ভেঙে ফেলা। তখন ব্যক্তি নিজেকে আলাদা সত্তা হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর কোনো প্রবাহের অংশ হিসেবে অনুভব করে। 


Somebody হওয়া মানে শুধু কেউ একজন হওয়া নয়— এটা নিজেকে একটি আলাদা সত্তা হিসেবে দেখায়, নিজের অস্তিত্বকে কেন্দ্র করে দাঁড়ানো, নিজের পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা। আর Nobody হওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়— বরং নিজেকে অতিক্রম করা। ‘আমি’র সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে ব্যক্তি আর আলাদা থাকে না— সে হয়ে যায় অনুভব, প্রবাহ, নীরব এক উপস্থিতি।


তাই Somebody আমাদের গড়ে তোলে— আর Nobody আমাদের মুক্ত করে।


সুফিরা একে বলে নফসের তাসাউফ বা নফস ও আমির শুদ্ধিকরণ। অর্থাৎ ভেতরের ‘আমি’কে পরিশুদ্ধ করার নীরব সাধনা। নফসের তাসাউফ মানে নিজের ভেতরের আমিকে চিনে ফেলা— তার লোভ, অহং, কামনা আর অস্থিরতাকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা। Somebody হতে চায় নফস— নিজেকে বড় করতে, আলাদা করে তুলতে। আর Nobody হতে শেখায় তাসাউফ— নিজেকে অতিক্রম করতে, নীরবে পরিশুদ্ধ হতে।


নফস যখন আম্মারা থেকে লাওয়ামা— আর লাওয়ামা থেকে মুতমাইন্না হয়ে ওঠে— তখন মানুষ আর শুধু মানুষ থাকে না— সে হয়ে ওঠে এক প্রশান্ত সত্তা। এই পথ উচ্চারণের নয়— অনুভবের, প্রদর্শনের নয়— নীরব সাধনার। 


এই পথ কোনো থিউরি নয়— এটা সম্পূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল সাধনা। শুধু ধারণা বা আলোচনা দিয়ে এখানে পৌঁছানো যায় না। এটি অভিজ্ঞতার আগুনে তেলে ভেজে নেওয়ার মতো এক রূপান্তর। যে জ্ঞান বাস্তব অনুশীলনে পরিণত হয় না, তা কেবল কথা হয়ে থাকে— পরিবেশনযোগ্য হয় না।


তাই নফসের এই পথকে সত্যিকার অর্থে অর্জনযোগ্য করতে হলে প্রয়োজন একজন যোগ্য পথপ্রদর্শক— একজন গাইড, একজন উস্তাদ। কারণ এই পথচলা মানে শুধু জানা নয়—নিজেকে বদলে ফেলা। আর নিজেকে বদলাতে হলে দরকার এমন একজন, যিনি আগে নিজে পথটা হেঁটে দেখেছেন।


যেটাকে কুরানের ভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম বলা হয়। সিরাতুল মুস্তাকিম শুধু একটি পথের নাম নয়— এটা জীবনের ভারসাম্য, সত্য ও আলোর দিকে চলার নির্দেশনা। এই পথে চলার বাস্তব চিহ্ন হলো— “সিরাতাল্লাজিনা আন‘আমতা আলাইহিম”— যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, যারা সেই পথে হেঁটে সফল হয়েছেন। অর্থাৎ পথ একটাই, কিন্তু সেই পথে সফল মানুষের জীবনই আমাদের জন্য দিকনির্দেশনা।


পথকে বুঝতে হলে পথিকদের চিহ্ন পড়তে হয়। সিরাতুল মুস্তাকিম হলো দিক— আর আন‘আমতা আলাইহিম হলো সেই দিকের জীবন্ত প্রমাণ।

চা গরম

ডাক্তার আইরিনের প্রথম দেখা পাই ট্রেনে। চা গরম সিনেমার ট্রেনে। পুরো সিনেমাতে ট্রেনের ভেতর শট একটিই। এই শটের সাইকোলজি হলো ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে মানসিক দূরত্বের কারন আবিষ্কারের একটি কচ্ছপ চেষ্টা। এই চেষ্টায় সফল হতে গেলে আরও গভীরে যেতে হবে। সেই গভীরতার নাম মানুষের ইকোনমি লাইফ এবং শিক্ষা লাইফ। চা গরম সিনেমাটিতে অবহেলিত চাশ্রমিকশ্রেনির করুনদৃশ্য দেখানো হয়েছে, অবহেলিত হওয়ার কারনদৃশ্য দেখানো হয়নি। 


সিনেমা শুরু হয় ড্রোন শটের মধ্য দিয়ে যেখানে চাবাগান দেখা যায়, তার পরপরই পূজাভোগদৃশ্য যেখানে একধরনের চাবাগানস্থ বিশ্বাস প্রকট হয়ে উঠে। প্রকৃতি এবং লোকজ বিশ্বাস দিয়ে সিনেমা শুরু হয়, নন্দিনির পরিশ্রমের ফলজয় দিয়ে সিনেমা শেষ হয়— যা লোকজ জীবনবোধ থেকে বৈজ্ঞানিক জীবনাচারে পর্দাপন প্রক্রিয়ার সিনেমিক ট্রিটমেন্ট। 


চা গরম— পরিচালনায় শঙ্খ দাশগুপ্ত— শুধু একটি ওয়েবফিল্ম নয় বরং আমাদের সমাজের এক অবহেলিত বাস্তবতার নির্মম অথচ সংবেদনশীল প্রতিচ্ছবি।


চরকি, Oxfam in Bangladesh এবং European Union-এর সহায়তায় নির্মিত এই কাজটি শুরু থেকেই আলাদা মনোযোগ দাবি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে তা হলো— এর গল্প বলার ভঙ্গি এবং চরিত্রগুলোর জীবন্ত উপস্থিতি। 


শুনুন— বাংলায় একটি প্রবাদ আছে— সাগরে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কিসের ভয়। চাশ্রমিক, যাদের সাগরসম কষ্ট বেদনা  যাতনা, তাদেরকে ধারণ করবে এমন নির্মিত গল্প আমরা এখনো পাইনি, আর সেই গল্পে প্রাণ দিবে এমন অভিনয়প্রাণ পাওয়ার কাজটা এতটাও সহজ নয়— তবে চা গরম কঠিন কাজটাকে সহজ করার পথে সহায়তা করেছে— বিভাত আসবেই এমন ডকুফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে, বিভাত আসবেই অভিনয় জগতে এমন ওয়েবফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে।


এমন মানে কেমন?  


তাহলে বলছি। যেখানে  মানবিক মূল্যবোধ থেকে গল্পবোধ জন্মে এবং গল্পবোধ থেকে লাইট ক্যামেরা এ্যাকশন হাটতে চলতে এবং দৌড়াতে শুরু করে। 


সিনেমায় আইরিন চরিত্রে সাফা কবির নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে হাজির করেছেন। তার পারফরম্যান্সে যে পরিমিতিবোধ, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কমেডি, আবেগ, দ্বিধা— সবকিছুতেই সে  অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক পরিমিতিবোধ সমান। আমার কাছে এটি তার এখন পর্যন্ত সেরা কাজ বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। মিঠু চরিত্রে পার্থ শেখ বরাবরের মতোই নির্ভরযোগ্য। তবে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠেছেন রবিন দা চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ। তার অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক যে, চরিত্র আর অভিনেতার সীমারেখা যেন মুছে যায়। কোথাও কোথাও তাকে দেখে রাজেশ শর্মা-র কথা মনে পড়েছে।


কি বলেন তো— চা গরম সিনেমাটিকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করে দেখতে চাই— শহরের চরিত্র, চা-বাগানের শ্রমিক চরিত্র, আর বাবু/ম্যানেজার চরিত্র। শহরের মানুষগুলো স্পষ্টতই প্রিভিলেজড— তাদের ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি সমস্যা দেখার ভঙ্গিও আলাদা। অন্যদিকে, চা-বাগানের শ্রমিকরা চরম আনপ্রিভিলেজড— তাদের জীবন শুধু কষ্টের নয়, একধরনের নীরব বন্দিত্ব। আর মাঝখানে যে বাবু বা ম্যানেজার চরিত্র— সে আপোষকামী। ম্যানেজার বা বাবু চরিত্রটিকে অনেকেই হয়তো “No Man’s Land” ভাবতে পারেন— কিন্তু সে আসলে ঠিক তা নয়। সে কোনো শূন্য ভূখণ্ড না বরং এক জীবন্ত বাফার জোন— উপরের ক্ষমতা আর নিচের বঞ্চনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক আপোষকামী সত্তা। তার সহানুভূতি আছে, কিন্তু তা প্রতিরোধে রূপ নেয় না; তার অবস্থান আছে, কিন্তু তা অবস্থানহীনতার মতোই অনিশ্চিত। সে যেন দুই দিকের টানাপোড়েনে আটকে থাকা এক মানুষ— যে না পুরোপুরি মালিকপক্ষের, না পুরোপুরি শ্রমিকের। এই মাঝামাঝি অবস্থানই তাকে সবচেয়ে বেশি মানবিক এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি অসহায় করে তোলে— আর ঠিক এখানে এ কে আজাদ সেতুর সেতুময় অভিনয় একেবারে চায়ের মধ্যে যেনো চিনি— ভালো কিন্তু সমালোচনা আছে। সমালোচনা কোথায় তাহলে? সমালোচনাটা হলো তিনার গাম্ভীর্য তেমন করে প্রকাশ পায়নি, গাম্ভীর্য অহংকারের রূপ নিয়েছে। 


নন্দিনীর বাবার মদ্যপান কিংবা মৃত্যুঞ্জয়ের বারবার “মরে গিয়েও বেঁচে থাকা”— এসব কেবল প্রতীক নয়, এগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষা। প্রশ্নটা এখানে— চা-বাগানে মদ এত সহজলভ্য কেন? এটা কি নিছক অভ্যাস, নাকি পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণের অংশ? এই জায়গাতেই সিনেমা কিছুটা থেমে যায়। মৃত্যুঞ্জয় আসলে বেঁচে আছে— কিন্তু কীভাবে, কেন— এই অস্তিত্বের প্রশ্নটাকে পরিষ্কার করে না। যেন বাস্তব আর প্রতীকের মাঝখানে ঝুলে থাকে চরিত্রটি।


আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে— ভর্তি কোচিংকে এখানে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। শিক্ষা এখানে মুক্তির পথ নয়  বরং আরেক ধরনের চাপের যন্ত্র। তবে অভিনয়ের জায়গায়—

শহরের চরিত্ররা শহরের মতোই হয়েছে, স্বাভাবিক। কিন্তু চা-শ্রমিক চরিত্রগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এমনকি বলা যায়— ওরাই পুরো সিনেমাটাকে টেনে সামনে নিয়ে গেছে।


নমস্কার দিদি— আমি রবিন চাঁদ মুর্মু— এই কথার মধ্য দিয়ে আমার চোখ অভিনেতা হিসাবে তাকে প্রথম আবিষ্কার করে। সাফা কবিরকে আলো দিয়েছে রবিন চাঁদ মুর্মু। সাফা কবিরের অভিনয় ভালো হয়েছে, তবে তার ভালোকে সামনের দিকে প্রাগ্রসর করেছে রবিন চাঁদ মুর্মু যার ভাষা থ্রোয়িং এবং অভিনয়ের মধ্যে ফারাক খুবই কম যা তাকে অনন্য অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জন্মের পর থেকে চা বাগানের রবিন দা গোফ রেখেছে। আর কাঠালগাছটা সেই উচু টিলায় রয়ে গেছে। তাই গোফে তেল দিয়েও লাভ হচ্ছে না— রবিনদা রবিনদা-ই থেকে গেলো— গরীবের কাছে স্বপ্ন হলো চিড়িয়াখানার বাঘের মতো, যেটা বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর লাগে, কিন্তু ভেতরে যাবার আর সাহস হয় না। 


নন্দিনী চরিত্রে সারাহ জেবীন অদিতি ছিলেন পুরো গল্পের প্রাণ। তার অভিনয়ে এতটা স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল যে মনে হয়েছে সে অভিনয় করছেন না বরং বেঁচে আছে সেই চরিত্রের ভেতর। এর আগে তাকে বোহেমিয়ান ঘোড়া-তে দেখা গেলেও  “চা গরম”-এ সে যেন নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।


গল্প ও চিত্রনাট্যে সাইফুল্লাহ রিয়াদ অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সংলাপগুলো যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি কমিক রিলিফগুলোও এসেছে খুব স্বাভাবিকভাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা— শেষটা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে একটি আলাদা স্বাদ দিয়েছে।


চা বাগানের শ্রমিকদের জীবন যেখানে দিনের পর দিন পরিশ্রমের পরও মজুরি থাকে মাত্র ১৮০-১৮৫ টাকা— এই নির্মম বাস্তবতাকে চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে। আমরা যারা চা বাগানে ঘুরতে যাই, ছবি তুলি, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি— তাদের জীবনের এই দিকটি প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। “চা গরম” সেই অদেখা জীবনকেই সামনে নিয়ে আসে।


লোকেশন, লাইট, ক্যামেরা, কালার গ্রেডিং— সবকিছু মিলিয়ে ভিজ্যুয়াল দিক থেকেও চা গরম সিনেমাটি চোখের জন্য এক ধরনের শান্তি। সিলেটের সবুজকে যেভাবে ফ্রেমবন্দী করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। স্কিনে কালারটোন  কোনো কোনো জায়গায় মার খেয়েছে— তাড়াহুড়ো করার কারনে এমনটা হয়ে থাকে তবে নন্দিনির কালারটোন একেবারে পারফেক্ট— চাকন্যা নন্দিনি। কস্টিউম ঠিক আছে তার। 


আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা বলি— চা-বাগানের শীতের সকাল এক ধরনের জাগরণ। কুয়াশার শাড়ি ধীরে ধীরে খুলে নেয় সূর্য, আর সেই মুহূর্তে চোখে একধরনের ঝাঁকুনি লাগে— যেন হাজার বছরের ঝিমুনি এক নিমিষে কেটে যায়— মন হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে অদ্ভুত চাঙা, ফুরফুরে। কিন্তু চা গরম-এ সেই স্পর্শটা পাইনি। চা-বাগানের বৃষ্টিও আলাদা এক ভাষা— সে বৃষ্টি থামতে চায় না, মনে হয় যেন চা-শ্রমিকের কান্না, ঘাম আর রক্তেরই আরেক নাম অথবা এক অনিবার্য সর্বনাশের প্রতিধ্বনি। এই বৃষ্টির সৌন্দর্য, এই বেদনার গভীরতা— সিনেমার প্রবাহে সেভাবে উঠে আসেনি।


পঞ্চগড়ে গিয়ে কোনো এক শীতে দেখেছিলাম একটি চাগাছ— চাগাছটি আম গাছের মতো বড়। চা গরম সিনেমা দেখে জানতে পারি, চাগাছ বটগাছের মতো বড় হতে পারে কিন্তু তাকে বড় হতে দেয়া হয় না। চাগাছকে খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার স্বপ্ন। চাগাছের মতোই চাবাগানের শ্রমিক— তাদের শ্রম খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার পেট। শ্রমিকদের ঘাম আর রক্তে টিকে থাকে, বেচে থাকে সভ্যতা অথচ তারা থাকে অন্ধকারের ভেতর আরও এক অন্ধকারে। রবিনদা শ্রমিকদের লিডার টাইপের তবে লিডার নয় ঠিক। চা গরমে তার হাটার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত। দুর্দান্ত অভিনয়। তার কথা বলার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত।  দুর্দান্ত অভিনয়।  নন্দিনি একেবারে মাটির মানুষ এবং পুরো স্কিনে তাকে মাটিঘেষা স্বপ্নপুরির মতো লাগছে। নন্দিনীর বাড়িটিও কিন্তু মাটির। দুদিন পরে মেয়েটার বিয়ে। তারপরও তার মন যেনো স্বপ্নবাড়ি। তার স্বপ্নবাড়ি যখন বাস্তবতার মুখ দেখে ঠিক তখনই সিনেমায় ড্রামাটিক প্রবাহ আসে যা দর্শকের মনে করুন রসের প্রবাহ আনে যা বীররসের আরেক নাম। 


অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও চা গরম কেবল একটি গল্প নয়— এটি একটি জীবন ধারার গল্প। এখানে নায়ক-নায়িকা নয় বরং মানুষের বেঁচে থাকা, স্বপ্ন দেখা আর সংগ্রামমুখর ইমেজই চরিত্র হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

কালের শাম

মেঘ আমি আশা ছিলো পাখি হয়ে উড়বো 

রঙিন আকাশ সবুজ পাহাড় স্বপ্নমতো ধরবো

গরম বাতাস হঠাৎ করে লাগলো আমার ডালে 

বৃষ্টি হলাম জন্ম আমার পানসে নদীর খালে 

খাল থেকে নদীতে যাবো যাবো সাগর বাড়ি 

নদী থেকে গরম বাতাস নিলো আমায় ধরি 

বাষ্প হয়ে আকাশ মাঠে মেঘ হলো আমার নাম 

মৃত্যুঘরে জন্ম হবো গল্প হবো হবো কালের শাম

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

আশরাফুল মাখলুকাত

 — আসুন আমরা ধর্ম নিয়ে কথা বলি।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে টেবিল গরম থাকবে। টেবিলে খাবার সার্ভ না করলেও চলবে।


— আসুন অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র এই বিষয়ে কথা বলি।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে মানুষ ভাইরে নিয়া পইরা থাকবো— বাইরে কি দরকার, কি দরকার না— তা নিয়ে কোনো কথা হবে না।


— বাহ! আপনার মাথায় তো ব্যাপক বুদ্ধি!


— এইভাবে প্রসংশা করবেন। তাহলে প্রসংশা নির্ভর সোসাইটি নির্মাণ হবে এবং সোসাইটি একসময় নিন্দা বা সমালোচনা সহ্য করতে পারবে না।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে সমালোচনা করলেই গুম হবে, এ্যারেস্ট হবে, মারামারি হবে, রাষ্ট্র অস্থির হবে, জল ঘোলা হবে, ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করবে কতিপয় সুবিধারা।


— সুবিধারা ঘোলা জলে মাছ শিকার করলে কি হবে?


তাহলে যারা সুবিধা দেন তারা দিনে দিনে সুবিধাদের হাতে মারা পরবেন এবং একসময় সুবিধা প্রদানকারী যখন থাকবে না তখন সুবিধা গ্রহণকারী এবং গ্রহণকারী মারামারি করে শেষ হয়ে যাবে!


— তারপর? 

— তারপর মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত!?

১৪৩৩ বাংলা

মুন্নী আপার সঙ্গে আমার প্রথম আড্ডা— মাটি ক্যাফেতে। আজ। আজ শুক্রবার ১৪৩৩। আপা অসাধারণ লেখেন। অনেকের কাছে তিনি একজন প্রখর সাংবাদিক, কিন্তু আমার কাছে তিনি মূলত একজন লেখক। গল্প লিখেন, কবিতা লিখেন— আর তাঁর লেখায় ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ তেমন গুরুত্ব পায় না; বরং জীবন আর ভাষার যাপনই সেখানে প্রধান হয়ে ওঠে।


শাহনাজ মুন্নী আপার কবিতায় আছে দৃশ্যায়নের ঝলক, সম্পর্কের এক সহজ, স্বচ্ছ প্রবাহ।


আমিন ভাইও আলাদা করে বলার মতো মানুষ— তিনি সুন্দরভাবে জীবনকে চর্চা করেন। তাঁর ভ্রমণসঙ্গ আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমিন ভাই আর মুন্নী আপা ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছেন— এই যাত্রার সঙ্গেও যেন এক ধরনের গল্প জড়িয়ে আছে।

একবার এক দূতাবাসে মুন্নী আপা কবিতা পড়ছিলেন। আমি আর আমিন ভাই গিয়েছিলাম শ্রোতা হয়ে। কবিতা পাঠ বা আবৃত্তি  শেষ হওয়ার পর এক বিদেশি কবি বললেন, “একটা প্রেমের কবিতা পড়বেন?” মুন্নী আপা হেসে বললেন, “এতক্ষণ তো প্রেমের কবিতাই পড়লাম!”


তখন বুঝলাম— তাদের কাছে প্রেমের কবিতা মানে আরও খোলামেলা, আরও প্রকাশ্য কিছু। আমরা মজা পেয়েছিলাম— সেই মুহূর্তটা এখনো মনে আছে।


মেঘনা নদীর পাড়ে ছোট্ট একটা কফির দোকান—‘মাটি ক্যাফে’। উজ্জ্বল ভাই লন্ডন থেকে ফিরে এসে এটি গড়ে তুলেছেন। নরসিংদীতে যাত্রাবিরতির দিনে সেখানে জড়ো হলাম আমরা— মুন্নী আপা, সরকার আমিন ভাই, প্রথম আলোর নরসিংদী প্রতিনিধি প্রণব দা, আর আমি।


নীরব, নির্মল বাতাস আমাদের চুপ করে থাকতে দেয়নি— আমরা কথা বলেছি। সব আড্ডা মুখর হয় না— কিন্তু আজকের আড্ডাটা হয়েছিল।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

ফুলবাহার

ফুল যখন ফুটতে চায়

ফুটতে দিও তাকে

রঙের ভেতর স্বপ্ন থাকে

গন্ধ লুকিয়ে ডাকে

কাঁটা হয়ে থেকো না আর মৃত্যুধরা হাতে

প্রতি শ্বাসে বেচে থাকো ঘাত-প্রতিঘাতে

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

জীবনের খালবিল

এক বছর আগের কথা। আমার চুল তখন বড়— ঝুটি বেঁধে রাখি। ভ্রমণে বের হয়েছি। কোনো এক গ্রাম এলাকায় ভ্রমণ করছি। রিকসাওয়ালা মামা খুবই মজার মানুষ। মামার সব কথা বেশ মজা লাগছিলো। রিকসা থেকে নেমে যাবো এমন সময় হঠাৎ করে তিনি মাটিতে শুয়ে গেলেন এবং আমার পায়ে চুম্বন করতে লাগলেন। আমি না সড়াতে পারছি পা, না সড়াতে পারছি রিকসাওয়ালা মামাকে। মানুষ জমে গ্যাছে। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন! সে কি কান্না!  


অবশেষে উনাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যাই। খাবার খেতে খেতে কাহিনি কী জানতে চাই।


— যখন আপনার কাছ থেকে ভাড়া নিতে যামু তখন আমার পীরের চেহারা ভাইসসা উঠছে আপনার মধ্যে। তারপর আমি কি করছি কিচ্ছু কইবাম পারুম না। 


মামা কইবাম না পারলেও, আমি ঠিকই কইবাম পারছি। পরের দিন সেলুনে গিয়ে সব চুলকে আল্লার রহমতে ইন্নালিল্লাহি করে দিছি।


আজকের ঘটনা। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকের ঘটনা। বাজারে যাচ্ছি। খাসির মাংস খেতে ইচ্ছে করছে— ঝালঝাল করে।  মাথায় টুপি।  হঠাৎ এক লোক— চিনি না জানি না— আমাকে দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয়। ওরে দয়াল— একি অবস্থা। যাক, যেকোনো উপায়ে উনাকে নিয়ে চায়ের দোকানে যাই। চা খেতে খেতে কাহিনি কী জানতে চাই। 


— ভাই, গতকাল রাতে এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখি। গভীর এক গর্ত। গর্তে আগুন আর আগুন। আগুনে পড়ে যাচ্ছি। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করছি। কিন্তু কোনোক্রমেই রক্ষা পাচ্ছি না— আগুনের দিকে যাচ্ছি তো যাচ্ছি। হঠাৎ একটি হাত আসে। এবং সেই হাত আমাকে রক্ষা করে। যে লোকটা আমাকে রক্ষা করে চেহারাটা হুবহু আপনার মতো। তাই আফনাকে দেখে আমার মাথা ঠিক রাখতে পারি নাই। আফনে মনে কিছু নিয়েন না ভাই। 


বাসায় আসি। বহুদিন নিজেরে আয়নায় দেখি নাই। আজকে দেখলাম। দেখি, চুল আবার বড় হয়ে গ্যাছে। টুপির নিচে বড় চুলে বেশ ভালো মানুষ  ভালো মানুষ একটা লুক আসছে।


গ্রাম এলাকায় একটা প্রবাদ আছে— আগে দর্শনধারী, পরে গুনবিচারী। আজকে থেকে প্রবাদ ঘুরে গেলো— আগে গুনবিচারী, পরে দর্শনধারী।

সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

আরবি থেকে বাংলা— ভাব থেকে ভাষা

আরবিতে একটি শব্দ আছে  غريب (উচ্চারণ: ঘোরীব)। এই ঘোরীব থেকে বাংলা গরীব শব্দের আমদানি। আরবিতে غريب (উচ্চারণ: ঘোরীব) শব্দের বাংলা হলো অদ্ভুত, অস্বাভাবিক, অচেনা যার ইংরেজি হলো “Weird”।  কিন্তু বাংলা ভাষায় গরীব শব্দটা অর্থহীন, সহায়সম্পত্তির কমতি বা ঘাটতিকে ইঙ্গিত করে। পুরো বাংলাদেশে একটি কথা প্রায় প্রবাদবাক্যের মতো হয়ে গ্যাছে— "গরীব গজবের সৃষ্টি"— এখন অবশ্যই এই কথার শক্তিগত জায়গা পরিবর্তন হয়েছে। তবে একটি প্রশ্ন কিন্তু থেকে যায়— অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়, নাকি নষ্ট স্বভাবে অভাব আসে? 


বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল বা ঈসা খাঁর অঞ্চলের মানুষ গরীব শব্দের উচ্চারণ করে গুরিব— হে একটা গুরিব মানু, হের লগে বারাবারি করিছ না। 


ঈসা খাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ ইছাহা বলে— এই অঞ্চলের প্রচুর মানুষের নাম আছে ইছা মিয়া। রাজা না হতে পারলেও রাজার নাম রেখে রাজা রাজা একটা ফিল নেয়ার চেষ্টা আর কি। ঈসা খাঁর শাসনামল বাংলার অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী প্রবাহচিহ্নের নাম— ঈসা খাঁ ছিলেন বাংলার ইতিহাসের এক অসাধারণ নেতা, যিনি বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁর শাসনকেন্দ্র ছিল ভাটি বাংলা—এক বিস্তৃত জলাভূমি, খাল-বিল ও নদীবেষ্টিত অঞ্চল। এই ভাটিতে মেঘনা, তিতাস ও বাঁশাই নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ছিল, যা তাঁর সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে আরও মজবুত করত।


ঈসা খাঁর প্রভাব বর্তমান ঢাকার আশপাশের এলাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁর প্রধান দুর্গ ও রাজধানী ছিল জঙ্গলবাড়ি, যা কিশোরগঞ্জে অবস্থিত— সোনারগাঁও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ঘাঁটি হিসেবে সমাদৃত—

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুরো অঞ্চল তাঁর অধীনে ছিল না, তবে নদীভিত্তিক দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশ অবশ্যই তাঁর প্রভাবাধীন ছিল। নদীভিত্তিক যুদ্ধকৌশল এবং নৌবাহিনী ব্যবহার করে তিনি মোঘল শক্তির বিস্তারকে বারবার প্রতিহত করেন।


ঈসা খাঁ কেবল ভূখণ্ডের শাসক ছিলেন না, তিনি ভাটি বাংলার সাহস, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের এক প্রতীক— তাঁর শাসনাধীন অঞ্চল আজও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বিবেচিত।


বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম কেদার রায়। কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করে ঈসা খান— তাতে রেগে গিয়ে কেদার রায় ঈসা খানের রাজধানী আক্রমণ করেন । কেদার রায়ের আক্রমণে ঈসা খান প্রাণভয়ে মেদিনীপুর পালিয়ে যায়। কেদার রায় ঈসা খানের প্রায় সম্পূর্ণ জমিদারির দখল নিয়ে নেন। ঈসা খান অজ্ঞাত রোগে তার স্ত্রী ফাতেমা খানের বাড়ি ফুলহরি (ফুলদি) জমিদার বাড়িতে ১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মারা যায়।


বারো ভূঁইয়াদের আলোচনা করতে করতে একটি শব্দ মাথায় চলে আসছে। আর শব্দটা হলো 'হিরিক'। বারো ভূঁইয়াদের অঞ্চলের মানুষ হিরিক শব্দটা ব্যবহার করে ঘন জমায়েত বুঝাতে— আম অহনে হস্তা, আম কিনার হিরিক লাগঝে চহে। হিরিক শব্দটা মূলত ইংরেজি শব্দ Hayrick (হেরিক) থেকে আগদ। মূলত খোলা মাঠে খড় বা শস্য শুকিয়ে রাখার জন্য যে বড় স্তূপ তৈরি করা হতো, তাকেই 'Rick' বলা হতো। পরবর্তীতে এর সাথে 'Hay' যুক্ত হয়ে 'Hayrick' শব্দটি সুনির্দিষ্টভাবে খড়ের গাদাকে বোঝাতে শুরু করে। ব্রিটিশ ইংরেজিতে শরীরের কোনো অংশ (বিশেষ করে ঘাড় বা পিঠ) হঠাৎ মোচড় লেগে ব্যথা পাওয়া বা মচকানোকে 'rick' বলা হয়। বাংলা বা সংস্কৃত শব্দ 'ঋক' (Ṛc) এর অর্থ হলো প্রশংসা, স্তোত্র বা পবিত্র মন্ত্র, যা হিন্দুধর্মের প্রাচীন গ্রন্থ 'ঋগ্বেদ'-এর মূল ভিত্তি।


তাহলে হিরিক লাগছে মানে খেড় যেমন গোল করে এক জায়গায় একত্রিত করা হয় তেমনি বিভিন্ন জায়গার মানুষ যখন এক জায়গায় একত্রিত হয় কোনো উদ্দেশ্যে তখন তাকে হিরিক বলে। খেড় এক জায়গায় একত্রিত করে গোল করে রাখার পর কম্বোজের মতো যে অবস্থা দৃশ্যমান হয় তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ বনগোলা বলে। খেড়কে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ 'বন' বলে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে রোদে শুকানো ধান গাছকে 'বন' বলে। বনগোলা/বনগুলা মানে রোদে শুকানো ধান গাছের সজ্জিত স্তুপ।


মচকানোকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ 'মছকা', 'মইচকা' বলে। আর শরীরের কোনো অংশ মচকানোর ফলে যে ব্যথা হয় তাকে মইচকাবেতা বলে। এই ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে গ্রামীণ যে চিকিৎসা পদ্ধতি চালু আছে তাকে মইচকাজারা বলে। মইচকাজারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে যেমন বিখ্যাত তেমনি নরসিংদীর চরাঞ্চলেও তার দারুণ সুখ্যাতি রয়েছে। তেল আর লবন দিয়ে ব্যথার স্থানে আস্তে আস্তে মালিশ করে এবং মালিশকারী ব্যক্তি মনে মনে এক মন্ত্র পরে— এই প্রক্রিয়াই মূলত মইচকাজারা। আমি অনেক কষ্টে আমার এলাকাতো দাদির কাছ থেকে এই মন্ত্র শিখে নিয়েছিলাম। তিনি আমাকে মন্ত্রটা কাউকে জানাতে নিষেধ করেছেন। তাই জানালাম না।


হিরিকের মতো আরেকটি শব্দ আছে। শব্দটা হলো নিরিখ। বৈষ্ণব পদাবলি বা লোকজ গানে 'নিরিখ' বলতে অনেক সময় একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকা বা লক্ষ্য করাকেও বোঝানো হয় (সংস্কৃত 'নিরীক্ষণ' থেকে প্রভাবিত)। কোনো জিনিসের বর্তমান দাম বা নির্ধারিত হারকে নিরিখ বলা হয় (যেমন: "বাজারের নিরিখ বুঝে সওদা করো)। কালু শাহ ফকিরের লেখা একটি গানে নিরিখ শব্দের উচ্চারণ দেখা যায়— 


নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে, ভুইলনা মন তাহারে....

ঐ নাম ভুল করিলে, যাবিরে মারা 

পরবিরে বিষম ফেরে

ভুইলনা মন তাহারে....।।


কালু শাহ ফকির রচিত ‘নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে’ একটি গভীর আধ্যাত্মিক বাউল গান। এ গানের দৃশ্যমান অর্থ হলো—মনের চঞ্চলতা দূর করতে গুরুর ধ্যানে থাকা বা স্মরণে থাকা— আপন মুর্শিদের ধ্যানে চোখ ও মন নিবদ্ধ রাখা। গুরুর দিক থেকে দৃষ্টি ফেরালে বা নাম ভুলে গেলে আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে এবং বিষম ফেরে (সংসার ফাদে) পড়তে হয়। এখানে নিরিখ মানে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা অথবা মানসিক সম্পর্ক স্থাপন করা— সুফিভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলে ফানা ফি শায়েখ (فناء في الشيخ)— নিজের অহং, ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত মতকে আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশনার কাছে বিলীন করে দেওয়া।


“ফানা” মানে বিলীন হয়ে যাওয়া, “ফি” মানে মধ্যে, আর “শায়েখ” মানে আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। অর্থাৎ মুরিদ (শিষ্য) যখন তার শায়েখের নির্দেশনা ও আদর্শকে সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করতে শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে তার নিজের অহং ভেঙে যায়— এটাকেই বলা হয় ফানা ফি শায়েখ। অবশ্যই আরও টেকনিক্যাল বিষয় আছে যা কহতব্য নয়, চর্চার বিষয়। সুফিসাধনার পথে এটিকে অনেক সময় একটি ধাপ হিসেবে ধরা হয়। সাধারণত বলা হয়—

প্রথমে ফানা ফি শায়েখ,

তারপর ফানা ফি রাসূল,

আর শেষ পর্যন্ত ফানা ফিল্লাহ— অর্থাৎ আল্লাহর প্রেম ও ইচ্ছার মধ্যে নিজের সত্তাকে সমর্পণ করা।


বাউল এবং সুফিপথের ডেসটিনি প্রায় এক হলেও পথপ্রক্রিয়া আলাদা। আলাদাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নরসিংদী কিশোরগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের মানুষ উচ্চারণ করে "আলগা"— বর্ষাকালে আলগা বাইত যাইতাম নাও দিয়া।


ইদানিং বাউলকে মহাজনি গান বলেন অনেকে। তারা বলে, বাংলা লোকসংগীতে বাউল গানের আরেকটি পরিচিত নাম হলো মহাজনি গান। এখানে “মহাজন” বলতে সাধারণ অর্থে ধনী ব্যবসায়ী বোঝানো হয় না; বরং বোঝানো হয় মহান আধ্যাত্মিক সাধক বা গুরুদের— যারা জীবন, প্রেম, আত্মা ও মানবতার গভীর সত্য নিয়ে গান ও বাণী রেখে গেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে—


বাওলা গান হাওলায় চলে না। 


আসলেই বাউলা গান হাওলায় চলে না। হাওলা শব্দটি এসেছে আরবি “হাওয়ালা (Hawala)” থেকে। মূল অর্থ ছিল দায়িত্ব বা অর্থ অন্যের কাছে স্থানান্তর করা। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি পরে ধার দেওয়া/নেওয়া অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাওয়ালা (Hawala) শব্দটা উচ্চারিত হয় "হাওলাত" হয়ে— টেহা হাওলাত নিলে ঠিক সময়ে ফেরত দিতে অই।

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

রেজা এমরানুর

 — রেজা, তোমার জন্ম কোথায়?

— আমার জন্ম তো সেখানে, যেখানে আমার মৃত্যু নেই! 

মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কথোপকথন

 — সবচেয়ে গরিব মানুষ কে, বলতে পারো?


— সবচেয়ে গরিব তো সে, যার সঙ্গে মানুষ সম্পর্ক করে কোনো এক প্রয়োজনের আশায়।


— না, সবচেয়ে গরিব তো সেই মানুষ, যে নিজেই প্রয়োজনকে সামনে রেখে সম্পর্ক নির্মাণ করে।


— তাহলে কি কোনো সম্পর্ক আছে, যা প্রয়োজন ছাড়া?


— আছে। তবে আগে একটি দৃশ্য কল্পনা করো। ধরো, নদীর ওপারে তোমার মা দাঁড়িয়ে আছেন, আর এপারে তুমি— তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তোমাকে নদী পার হতে হবে। এখন তোমার একটি নৌকা লাগতে পারে, অথবা একটি সেতু। এই যে নৌকা বা সেতু— এগুলো কিন্তু তোমার প্রয়োজন নয়, এগুলো তোমার আয়োজন। তোমার প্রকৃত প্রয়োজন হলো—মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ। যারা আয়োজনকে প্রয়োজন বানায়— যারা অভিনয় করে, মিথ্যা কথা বলে আয়োজনকে প্রয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারাই ব্যক্তিগত জীবনবোধে সবচেয়ে গরিব


— আর কোনো গরীব আছে আপনার দৃষ্টিতে?


— আছে।


— সে কে?


— সে হলো সেই মানুষ, যে কারো উপকার করে, তারপর তার আশেপাশে ঘুরতে থাকে, বারবার মনে করিয়ে দেয়— “আমি তোমার উপকার করেছি।”


— তাহলে তার কী করা উচিত?


— যদি ক্ষমতা থাকে, তবে কারো উপকার করো তাকে না জানিয়ে। যদি ক্ষমতা থাকে, তবে উপকার করে তার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাও। উপকার করে কাউকে কৃতজ্ঞতার দাস বানিয়ে ফেলো না।


— বুঝলাম।


অর্থাৎ, যে উপকার করে বিনিময় চায়, আর যে নারী বা পুরুষ সান্নিধ্যের বিনিময়ে অর্থমূল্য দাবি করে— তারা একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে— দুজনেই বিনিময় চায়; দুজনেই সম্পর্ককে রূপান্তর করেছে লেনদেনে।


— তাহলে প্রকৃত ধনী কে?


যে ভালোবাসে বিনিময়হীনভাবে। যে দেয়, কিন্তু মনে রাখে না। যে পাশে থাকে, কিন্তু মালিকানা দাবি করে না। সেই মানুষই প্রকৃত অর্থে ধনী।

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

শ্রীলঙ্কার সিনেমা হলে


PVR Cinemas— One Galle Face Mall–এর ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত বিশাল এক মাল্টিপ্লেক্স। সাগরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মলের ভেতরে ঢুকলেই আলোর ভিন্ন এক জগৎ।

আমি যেখানে যাই, চেষ্টা করি সেখানকার অন্তত একটি  সিনেমা হলেও দেখতে। ভাষা না বুঝলেও সমস্যা নেই— সেই দেশের ভাষায় অন্তত একটি চলচ্চিত্র দেখি। আমার কাছে এটা ভ্রমণেরই অংশ, সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকে পড়ার এক নীরব উপায়।


সেদিনও আগেভাগেই অন্য একটি ছবির টিকিট কেটে রেখেছিলাম। হলে গিয়ে দেখি ভিন্ন এক আবহ— নায়ক-নায়িকার উপস্থিতিতে যেন ছোট্ট এক উৎসব বসেছে। নতুন সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, তাই চারদিকে উচ্ছ্বাস—আলোকচ্ছটা, ক্যামেরা, শুভেচ্ছা আর কৌতূহলী দর্শকের ভিড়।


নায়ক-নায়িকার সঙ্গে দু-একটি কথা হলো। আন্তরিক আমন্ত্রণও পেলাম— তাঁদের সঙ্গে বসে সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবিটি দেখার জন্য। ইচ্ছে ছিল, কিন্তু হাতে সময় ছিল না। আগের টিকিট, আগের পরিকল্পনা— আমাকে অন্য হলে টেনে নিল।


তবু মন ভরে গেল তাদের সিনেমা মুক্তির সংস্কৃতি দেখে। রীতিমতো পূজা দিয়ে তারা ছবির সূচনা করে— শিল্পকে শুধু বিনোদন নয়, একধরনের পবিত্র আয়োজনে পরিণত করে। সেই দৃশ্য মনে রয়ে গেছে।

রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বোম্বাই এয়ারপোর্ট

সাদা গোলাপের ওপর বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়লে মনে হয় পৃথিবী আজ খুব আস্তে কথা বলছে 🌧️🤍— নিষ্পাপ পাপড়ির গায়ে জল জমে থাকে, মুক্তোর মতো নয়— যেন নীরব প্রার্থনার অশ্রু। সে বৃষ্টি শুধু ফুলকে ভেজায় না, ভিজিয়ে দেয় তাকিয়ে থাকা মনটাকেও— কিছু না–বলা স্মৃতি, কিছু অদৃশ্য ভালোবাসা। কিছু সৌন্দর্য ব্যাখ্যা চায় না, শুধু নীরবে ছুঁয়ে যায়। 🌹


বাচ্চাটির বয়স ছয় কি সাত হবে। বই পড়ছে। বইটিকে মনে হচ্ছে সাদা গোলাপ এবং বাচ্চাটিকে মনে হচ্ছে সেই সাদা গোলাপের উপর অর্পিত প্রথম বৃষ্টির জল। বোম্বাই এয়ারপোর্টে এমন সুন্দর মনমাতানো দৃশ্য দেখে জার্নির ক্লান্তি যেনো বাগানবাড়িতে বিশ্রাম নিতে গ্যাছে। এয়ারপোর্ট দেখছি আর শক্তিশালী হচ্ছি। সে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। এখনকার সময়ের বাচ্চাদের এতো মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে দেখা যায় না— দেখা যায় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত সারাক্ষণ।


বোম্বাই এয়ারপোর্ট খুবই সুন্দর গোছানো। এই পর্যন্ত যত এয়ারপোর্ট আমি দেখেছি কোনো এয়ারপোর্টে এমন উন্মুক্ত বইবিক্রি সেন্টার দেখিনি। সেই বইবিক্রির সেন্টার থেকে ডলার দিয়ে দুটি বই কিনেছি।


একটি বইয়ের নাম Butter, জাপানি লেখক Asako Yuzuki-র একটি বিখ্যাত উপন্যাস, যা ২০১৭ সালে জাপানে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল এবং ২০২৪ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং Waterstones Book of the Year 2024 নির্বাচিত হয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য পুরস্কার হিসেবে।


“Butter” বইটি বাস্তব জীবনের “কনকাতসু কিলার” মামলার দ্বারা অনুপ্রাণিত, যিনি তার তিনজন প্রেমিককে বিষাক্ত খাবারের মাধ্যমে হত্যা করেছিলেন। গল্পে দেখা যায়, এক সাংবাদিক ক্রমে এই দোষী সাব্যস্ত হত্যাকাণ্ডকারীর প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠে, যিনি তার ঘরে বানানো খাবারের মাধ্যমে ভিকটিমদের আকর্ষণ করতেন। Laura Wilson (দ্য গার্ডিয়ান) লিখেছেন—

“এটি বন্ধুত্ব, সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ আনন্দ এবং সমাজের নারীদের প্রতি অতি দ্বন্দ্বপূর্ণ প্রত্যাশা নিয়ে ভাবান্বিত এবং আশ্চর্যজনকভাবে মনোমুগ্ধকর এক দৃষ্টিভঙ্গি।”


বই দুটি রেস্ট হাউজে রেখে আবার এয়ারপোর্টে হাটতে থাকি। মোবারক ভাই নিজের মতো হেটে হেটে দেখছে এয়ারপোর্ট— তিনি ডলার খরচ করতে নারাজ— তাই তিনি কোনো রেস্টহাউজ ভাড়া নেননি— আমি নিয়েছি— তাতে আমার ত্রিশ ডলার খরচ করতে হয়েছে— তারপরও শান্তি। কারণ হেটে হেটে ক্লান্ত হলে সেখানে গিয়ে চা খাই কফি খাই বিছানায় একটু গতর লাগাই, আবার হাটি আর দেখি— চোখ যেনো সরতে চায় না। 


বোম্বাই এয়ারপোর্টে প্রতিদিন প্রায় একহাজার ফ্লাইট উঠানামা করে, প্রায় দেড় লাখ যাত্রী আসা যাওয়া করে।  ভোরে আমাদের ফ্লাইট— এয়ার ইন্ডিয়া। বাংলাদেশ যাবো। বোম্বাই ট্রানজিট। শ্রীলঙ্কা যাওয়ার সময় ট্রানজিট পড়ে দিল্লিতে। সারারাত দিল্লিতে বসা ছিলাম— আমি আর হাবিব।  আমরা বসে বসে মানুষের আসাযাওয়া দেখি— কত রকমের মানুষ অথচ প্রায় একই রকমের পোশাক। পুজিবাজার মানুষকে এক সংস্কৃতিতে নিয়ে আসার চেষ্টায় ব্যস্ত— তাতে ব্যবসা করতে সুবিধা। বোম্বাই এয়ারপোর্টে কিন্তু মানুষের দিকে আমার দৃষ্টিযোগ কম— অধিক দৃষ্টিযোগ বোম্বাই এয়ারপোর্টের সাজসজ্জার দিকে— এখানে বহুমাত্রিক খাবার দোকানের সক্রিয় অবস্থান। কোনো খাবারের দিকে আমার ক্ষুধাদৃষ্টি যাচ্ছে না কিন্তু চোখের দৃষ্টি তো আরোপিত থাকছেই।  ত্রিশ ডলারের ভেতরে পর্যাপ্ত খাবার সেবা দিয়েছে আমাকে রেস্টহাউজ। রেস্টহাউজ বলতে তাবুর ⛺ মতো ছোটো ছোটো ঘর— একজন থাকতে পারে একটি তাবুতে।  আমার তাবুর পাশেই জঙ্গল— তাবুর জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যায় সেই জঙ্গল— মানুষের বানানো জঙ্গল— ইট সিমেন্টের পেটের ভেতর এক প্রাকৃতিক জঙ্গল— তালা হিসাব করলে আমার তাবুটি তিন তালায় হবে— তালারে আধুনিক সময়ের মানুষ  আবার ফ্লোর বলে। 


ফোর্থ ফ্লোরে গিয়েছিলাম স্পা নিতে। কিন্তু স্পা সেন্টার বন্ধ। কারন কয়েকদিন আগে স্পা সেন্টারে একজন মানুষের মৃত শরীর পড়ে থাকে। সেই থেকে স্পা সেন্টারটি বন্ধ ❎! বোম্বাই এয়ারপোর্টে সারারাত সব দোকান ওপেন থাকে— থাকার হোটেলে রাত বারোটার পর সাধারণত কোনো সিট কিংবা রুম পাওয়া যায় না— হোটেলে প্রতি রুমের জন্য গুনতে হয় একশো থেকে একশো ত্রিশ ডলার— তবে তাবুতে ⛺ সারারাত সারাদিন সিট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


আজকে তাবুর দায়িত্বে যে ছেলেটা রয়েছে সে খুবই ভালো মানুষ। অল্প সময়ের মধ্যে সে আমার ঘরের মানুষ হয়ে যায়। কারন সে একজন কবি। তার অনেকগুলো কবিতা শুনি— উর্দুতে হিন্দিতে। মির্জা গালিবের প্রভাব তার কবিতায় স্পষ্ট। এতো ব্যস্ততার মাঝেও যে কবিমন আছে তার সেইজন্য তাকে সাধুবাদ জানাই এবং আফালের মাছ বইটি উপহার হিসাবে দেই তাকে। সে আমাকে তার পুরো ঠিকানা লিখে দেয় এবং বোম্বাই আসলে তার বাড়িতে থাকার অনুরোধ জানায়।  আমি আপ্লুত হই তার নেমন্তন্ন পেয়ে। আমিও তাকে বাংলাদেশে এসে আমাকে ধন্যযোগ করার প্রস্তাব পেশ করি। আশা করি সে বাংলাদেশে আসবে একদিন।


ছেলেটার নাম রোহিত এবং বোম্বাই এয়ারপোর্টের কাগজি নাম ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আমার রেস্ট নেয়ার  সুন্দর ব্যবস্থার আয়োজনকারী ম্যানেজমেন্টের নাম  AVserve Circle। এটি crossword বুকস্টলের সাথে। AVserve Circle এ থাকার জন্যে যেটিকে আমি তাবু বলছি তারা সেটিকে বলে স্লিপিং পট।


রোহিত আমার সাথে খুবই সুন্দর একটি আচরণ করেছে। স্লিপিং পটে আমার থাকার সময় চারঘন্টা। অথচ সে আমাকে বলেছে— স্যার, আপনার ফ্লাইটের আগ পর্যন্ত আপনি রেস্ট নেন এখানে, আমি ম্যানেজ করে নিচ্ছি, আপনার ফ্লাইটের সময় আমি আপনাকে ডেকে দিবো।  আমার ফ্লাইট ছয়টায়।  ঠিকই সে পাচটা ত্রিশ মিনিটে আমাকে ডেকে দেয়। কর্পোরেট জগৎ এমন সুন্দর আচরণ করে না— করে অর্থের বিনিময়ে কিন্তু রোহিত অর্থের বাইরে এসে আমার সাথে মানবিক আচরণ করে যেটা তার মর্যাদা আমার কাছে অনেকগুন বৃদ্ধি করে যা অর্থের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না।  


✈️ বন্দরনায়েকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—Bandaranaike International Airport (BIA)— যার অবস্থান 📍কাটুনায়েকে, কলম্বোর কাছে— সেখান থেকে আমাদের উড়োজাহাজ ফ্লাই করে চারটার সময়। আমরা বোম্বাই এয়ারপোর্টে পৌছি ছয়টা কুড়ি মিনিটে। বোর্ডিং  পাসে অনেক সময় লাগে।  আমাদের সাথে বোর্ডিং পাস করে ইন্দোনেশিয়ার বিরাট এক কাফেলা।  তারা মক্কায় যাবে— মানে তারা হাজী হওয়ার নিয়তে বাড়ি থেকে বের হয়েছে।


ইনশাআল্লাহ হাজী  হালিমা নামে একজন ইন্দোনেশিয়ান মেয়ে আমার দেশ জানতে চায়— আমার দেশ বাংলাদেশ শুনে জানতে চায় আমি মুসলমান কিনা— আমি তাকে বলি— I  grew up in a Muslim family; still, I am learning what it means to be a Muslim. হালিমা আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি বিনিয়োগ করে। আমি হালিমার মুগ্ধ দৃষ্টির মাঝে হজ্জের আনন্দ দেখতে পাই এবং দৃষ্টিবৃষ্টি চলাকালীন সময়ে তাকে বলি— Convey my heartfelt, soul-deep salam to the Compassionate One of Madinah. হালিমা মাথা নাড়ে— ঠিক তখনই ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে নড়তে বলে। আমিও নড়েচড়ে আমার ব্যাগপত্র মেশিনে রাখি। মেশিন চেকিং কমপ্লিট হওয়ার পর প্রায় দুইঘন্টার অপেক্ষাক্লান্তি যেনো নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো বোম্বাই এয়ারপোর্টের অবয়ব দেখে— এককথায় দারুণ এবং অসাধারণ। দিল্লি এয়ারপোর্টের মতো এই এয়ারপোর্টটি এতো ব্যস্ত না— টিপটপ গোছানো— জায়গায় জায়গায় গার্ডেন— প্রকৃতির ছোয়া। দোকান আছে। তবে দোকানের কারনে বস্তিময় হয়ে যায়নি— পর্যাপ্ত ফাকা জায়গা— ফ্লোরে আলো পড়ে চিকচিক করছে— মাথার উপরে যে রোফ তাতে ফুলময় ❀ কারুকাজ। হঠাৎ চোখে আসে একটি নান্দনিক স্টল— সদ গুরুর গুরুত্বপূর্ণ কথামালা নিয়ে ব্যানারকর্ম— ছবিকর্ম বলা যায় অর্থাৎ তিনার বিভিন্ন মোশনের ছবি— ছবির নিচে তিনার দার্শনিক কথাবার্তা।  দাড়িয়ে দাড়িয়ে সবগুলো কথা পড়ি— ভালো লাগলো বেশ—

Diversity is a strength.

It has arisen in this culture out of richness, not out of divide.


Grace is subtle.

Unless you are alert you will miss it.


বেশভূষার বাহাদুরি নাই ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কিন্তু বেশভূষার অলঙ্কার আছে— সেই অলঙ্কারের আবার শিল্পমান আছে বোল্ড করে বলার মতো। বলার মতো একটি রাত যাপিত হলো ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু কেমনে বলমু যা লেগে আছে চোখের মন্দিরে মনের অন্দরে— তাকে তো প্রার্থনায় কেবল পাওয়া যায়— পাওয়া যায় না তারে নির্মিত ভাষায়।

জলজয়



ফুলের সাথে আছি প্রিয়

ভুলের সাথে নয়

যতই করো জল ঘোলা 

জলের হবে জয় ✌

মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সখীচার


হলে তুমি সখীচার

লালা আমার মরবেই

থাকে না তার

থাকে না তার উপায় তবে একমুঠোও বাচার

নীলাপ্রিয় নীল শাড়ি চোখে উঠে রোদ

মনজলে কেপে কেপে উঠে বোদ বোদ

আলাবোলা কামবনে ঝড় আসে ঝড় আসে

আসে আসে তুফান

বড় হওয়া সোনা ফসল— পাকা ধানে মই

স্বপ্ন তো ছিলোই

স্বপ্ন তো থাকেই মজা করে খাওয়ার কাঁঠালি ধানের খই 

  কামজোয়ার পথ চিনে না— কানার কানা 

    জোয়ারে জোয়ারে ডুবায় ফসল শুনে না মানা 

      কামজ্বর কামজ্বর অতুল সাগর 

        চাবুক মেরে বলি তারে থামো থামো 

         কামডর কামডর কামড় মারে 

          থামানো যায় না— যায় না তারে 

            শুনো ওরে মন আমার ওহে মন মিয়া 

              ধরো তারে আদরে ধরো মায়া দিয়া

                বান্দো দেহ সোহাগে সোহাগ নিয়া 

                  সন্ধি করে সময়ে বসাও সময়বিয়া 

                    লাগাও হিয়া তবে হিয়ার সাথে হিয়া

সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপদফুলের কলি



লালের সাথে তুমি আছো

আছো নীলের সাথে 

সাদার সাথেও সুড়সুড়িটা চলে মাঝরাতে 

কালোর সাথে দেখা হলে মুচকি মুচকি হাসো

বলো দেখি আসলে তুমি কারে ভালোবাসো

বলবে তুমি 'বিপদে আছি'— ম্যানেজ করে চলি 

তুমি আসলে 'বিপদে রাখো' বিপদফুলের কলি

শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬

সন্ধ্যাচোখ



এইমাত্র দেখা গেলো দূরে 

আবার চলে গেলো আরও আরও দূরে 

চোখ থেকে চোখে 

চোখের সীমানা পেরিয়ে 

অপেক্ষায় বসে আছি আমি বেকুয়ার বিলে

হে অতিথি— ওহে অতিথি পাখি 

এখানে আছেনি—আছে নাকি কোনো 

তোমার শামুকমদে পরিযায়ী সাকি? 

তোমার পাখা মানে না কোনো পাসপোর্ট ভিসা

তোমার মন জানে পৃথিবীর পরতে পরতে তুমি 

পৃথিবীর পরতে পরতে আছে তোমার অধিকার হিস্যা

দেশ শব্দটি— এক বাকুয়াস কথা 

সংবিধান অভিধান— বানোয়াট সুবিধা 

তোমার কাছে পৃথিবী মানে মুসাফিরঘর 

সফরে সফরে আওয়াজ করো

বর্ডারভাঙার গান করো বর্ডারবাজ মগজের ভেতর 

হে অতিথি— ওহে অতিথি পাখি 

আমার সাথে দেখা দিবে নাকি

আমিও তোমার মতো মুসাফির

উড়ে উড়ে নড়ে চড়ে ভ্রমণ আকি

এই পৃথিবী আমার 

আমি এই পৃথিবীর 

বর্ডার টডার মিথ্যা ফেলাসি ফেইক শিয়াল ফাকি

তোমার পা সত্য গতি চন মন 

তোমার ঠোঁট জানে প্রয়োজন 

তোমার ঠোঁটের কথা অনিবার্য হবে 

এবং অনিবার্য হলো 

কুয়াশার টেবিলে রোদের আদরে বসি চলো 

বসি চলো পৃথিবীর বুকে 

ধান গাছের ফাকে শামুকের সাথে 

জলের গতরে ভেসে থাকা শ্যাওলা মাছের হাতে

চলো বসি— হে অতিথি পাখি 

চোখের ভেতর একটা লাল নীল হলুদ সন্ধ্যাচোখ রাখি