রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বোম্বাই এয়ারপোর্ট

সাদা গোলাপের ওপর বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়লে মনে হয় পৃথিবী আজ খুব আস্তে কথা বলছে 🌧️🤍— নিষ্পাপ পাপড়ির গায়ে জল জমে থাকে, মুক্তোর মতো নয়— যেন নীরব প্রার্থনার অশ্রু। সে বৃষ্টি শুধু ফুলকে ভেজায় না, ভিজিয়ে দেয় তাকিয়ে থাকা মনটাকেও— কিছু না–বলা স্মৃতি, কিছু অদৃশ্য ভালোবাসা। কিছু সৌন্দর্য ব্যাখ্যা চায় না, শুধু নীরবে ছুঁয়ে যায়। 🌹


বাচ্চাটির বয়স ছয় কি সাত হবে। বই পড়ছে। বইটিকে মনে হচ্ছে সাদা গোলাপ এবং বাচ্চাটিকে মনে হচ্ছে সেই সাদা গোলাপের উপর অর্পিত প্রথম বৃষ্টির জল। বোম্বাই এয়ারপোর্টে এমন সুন্দর মনমাতানো দৃশ্য দেখে জার্নির ক্লান্তি যেনো বাগানবাড়িতে বিশ্রাম নিতে গ্যাছে। এয়ারপোর্ট দেখছি আর শক্তিশালী হচ্ছি। সে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। এখনকার সময়ের বাচ্চাদের এতো মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে দেখা যায় না— দেখা যায় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত সারাক্ষণ।


বোম্বাই এয়ারপোর্ট খুবই সুন্দর গোছানো। এই পর্যন্ত যত এয়ারপোর্ট আমি দেখেছি কোনো এয়ারপোর্টে এমন উন্মুক্ত বইবিক্রি সেন্টার দেখিনি। সেই বইবিক্রির সেন্টার থেকে ডলার দিয়ে দুটি বই কিনেছি।


একটি বইয়ের নাম Butter, জাপানি লেখক Asako Yuzuki-র একটি বিখ্যাত উপন্যাস, যা ২০১৭ সালে জাপানে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল এবং ২০২৪ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং Waterstones Book of the Year 2024 নির্বাচিত হয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য পুরস্কার হিসেবে।


“Butter” বইটি বাস্তব জীবনের “কনকাতসু কিলার” মামলার দ্বারা অনুপ্রাণিত, যিনি তার তিনজন প্রেমিককে বিষাক্ত খাবারের মাধ্যমে হত্যা করেছিলেন। গল্পে দেখা যায়, এক সাংবাদিক ক্রমে এই দোষী সাব্যস্ত হত্যাকাণ্ডকারীর প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠে, যিনি তার ঘরে বানানো খাবারের মাধ্যমে ভিকটিমদের আকর্ষণ করতেন। Laura Wilson (দ্য গার্ডিয়ান) লিখেছেন—

“এটি বন্ধুত্ব, সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ আনন্দ এবং সমাজের নারীদের প্রতি অতি দ্বন্দ্বপূর্ণ প্রত্যাশা নিয়ে ভাবান্বিত এবং আশ্চর্যজনকভাবে মনোমুগ্ধকর এক দৃষ্টিভঙ্গি।”


বই দুটি রেস্ট হাউজে রেখে আবার এয়ারপোর্টে হাটতে থাকি। মোবারক ভাই নিজের মতো হেটে হেটে দেখছে এয়ারপোর্ট— তিনি ডলার খরচ করতে নারাজ— তাই তিনি কোনো রেস্টহাউজ ভাড়া নেননি— আমি নিয়েছি— তাতে আমার ত্রিশ ডলার খরচ করতে হয়েছে— তারপরও শান্তি। কারণ হেটে হেটে ক্লান্ত হলে সেখানে গিয়ে চা খাই কফি খাই বিছানায় একটু গতর লাগাই, আবার হাটি আর দেখি— চোখ যেনো সরতে চায় না। 


বোম্বাই এয়ারপোর্টে প্রতিদিন প্রায় একহাজার ফ্লাইট উঠানামা করে, প্রায় দেড় লাখ যাত্রী আসা যাওয়া করে।  ভোরে আমাদের ফ্লাইট— এয়ার ইন্ডিয়া। বাংলাদেশ যাবো। বোম্বাই ট্রানজিট। শ্রীলঙ্কা যাওয়ার সময় ট্রানজিট পড়ে দিল্লিতে। সারারাত দিল্লিতে বসা ছিলাম— আমি আর হাবিব।  আমরা বসে বসে মানুষের আসাযাওয়া দেখি— কত রকমের মানুষ অথচ প্রায় একই রকমের পোশাক। পুজিবাজার মানুষকে এক সংস্কৃতিতে নিয়ে আসার চেষ্টায় ব্যস্ত— তাতে ব্যবসা করতে সুবিধা। বোম্বাই এয়ারপোর্টে কিন্তু মানুষের দিকে আমার দৃষ্টিযোগ কম— অধিক দৃষ্টিযোগ বোম্বাই এয়ারপোর্টের সাজসজ্জার দিকে— এখানে বহুমাত্রিক খাবার দোকানের সক্রিয় অবস্থান। কোনো খাবারের দিকে আমার ক্ষুধাদৃষ্টি যাচ্ছে না কিন্তু চোখের দৃষ্টি তো আরোপিত থাকছেই।  ত্রিশ ডলারের ভেতরে পর্যাপ্ত খাবার সেবা দিয়েছে আমাকে রেস্টহাউজ। রেস্টহাউজ বলতে তাবুর ⛺ মতো ছোটো ছোটো ঘর— একজন থাকতে পারে একটি তাবুতে।  আমার তাবুর পাশেই জঙ্গল— তাবুর জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যায় সেই জঙ্গল— মানুষের বানানো জঙ্গল— ইট সিমেন্টের পেটের ভেতর এক প্রাকৃতিক জঙ্গল— তালা হিসাব করলে আমার তাবুটি তিন তালায় হবে— তালারে আধুনিক সময়ের মানুষ  আবার ফ্লোর বলে। 


ফোর্থ ফ্লোরে গিয়েছিলাম স্পা নিতে। কিন্তু স্পা সেন্টার বন্ধ। কারন কয়েকদিন আগে স্পা সেন্টারে একজন মানুষের মৃত শরীর পড়ে থাকে। সেই থেকে স্পা সেন্টারটি বন্ধ ❎! বোম্বাই এয়ারপোর্টে সারারাত সব দোকান ওপেন থাকে— থাকার হোটেলে রাত বারোটার পর সাধারণত কোনো সিট কিংবা রুম পাওয়া যায় না— হোটেলে প্রতি রুমের জন্য গুনতে হয় একশো থেকে একশো ত্রিশ ডলার— তবে তাবুতে ⛺ সারারাত সারাদিন সিট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


আজকে তাবুর দায়িত্বে যে ছেলেটা রয়েছে সে খুবই ভালো মানুষ। অল্প সময়ের মধ্যে সে আমার ঘরের মানুষ হয়ে যায়। কারন সে একজন কবি। তার অনেকগুলো কবিতা শুনি— উর্দুতে হিন্দিতে। মির্জা গালিবের প্রভাব তার কবিতায় স্পষ্ট। এতো ব্যস্ততার মাঝেও যে কবিমন আছে তার সেইজন্য তাকে সাধুবাদ জানাই এবং আফালের মাছ বইটি উপহার হিসাবে দেই তাকে। সে আমাকে তার পুরো ঠিকানা লিখে দেয় এবং বোম্বাই আসলে তার বাড়িতে থাকার অনুরোধ জানায়।  আমি আপ্লুত হই তার নেমন্তন্ন পেয়ে। আমিও তাকে বাংলাদেশে এসে আমাকে ধন্যযোগ করার প্রস্তাব পেশ করি। আশা করি সে বাংলাদেশে আসবে একদিন।


ছেলেটার নাম রোহিত এবং বোম্বাই এয়ারপোর্টের কাগজি নাম ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আমার রেস্ট নেয়ার  সুন্দর ব্যবস্থার আয়োজনকারী ম্যানেজমেন্টের নাম  AVserve Circle। এটি crossword বুকস্টলের সাথে। AVserve Circle এ থাকার জন্যে যেটিকে আমি তাবু বলছি তারা সেটিকে বলে স্লিপিং পট।


রোহিত আমার সাথে খুবই সুন্দর একটি আচরণ করেছে। স্লিপিং পটে আমার থাকার সময় চারঘন্টা। অথচ সে আমাকে বলেছে— স্যার, আপনার ফ্লাইটের আগ পর্যন্ত আপনি রেস্ট নেন এখানে, আমি ম্যানেজ করে নিচ্ছি, আপনার ফ্লাইটের সময় আমি আপনাকে ডেকে দিবো।  আমার ফ্লাইট ছয়টায়।  ঠিকই সে পাচটা ত্রিশ মিনিটে আমাকে ডেকে দেয়। কর্পোরেট জগৎ এমন সুন্দর আচরণ করে না— করে অর্থের বিনিময়ে কিন্তু রোহিত অর্থের বাইরে এসে আমার সাথে মানবিক আচরণ করে যেটা তার মর্যাদা আমার কাছে অনেকগুন বৃদ্ধি করে যা অর্থের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না।  


✈️ বন্দরনায়েকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—Bandaranaike International Airport (BIA)— যার অবস্থান 📍কাটুনায়েকে, কলম্বোর কাছে— সেখান থেকে আমাদের উড়োজাহাজ ফ্লাই করে চারটার সময়। আমরা বোম্বাই এয়ারপোর্টে পৌছি ছয়টা কুড়ি মিনিটে। বোর্ডিং  পাসে অনেক সময় লাগে।  আমাদের সাথে বোর্ডিং পাস করে ইন্দোনেশিয়ার বিরাট এক কাফেলা।  তারা মক্কায় যাবে— মানে তারা হাজী হওয়ার নিয়তে বাড়ি থেকে বের হয়েছে।


ইনশাআল্লাহ হাজী  হালিমা নামে একজন ইন্দোনেশিয়ান মেয়ে আমার দেশ জানতে চায়— আমার দেশ বাংলাদেশ শুনে জানতে চায় আমি মুসলমান কিনা— আমি তাকে বলি— I  grew up in a Muslim family; still, I am learning what it means to be a Muslim. হালিমা আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি বিনিয়োগ করে। আমি হালিমার মুগ্ধ দৃষ্টির মাঝে হজ্জের আনন্দ দেখতে পাই এবং দৃষ্টিবৃষ্টি চলাকালীন সময়ে তাকে বলি— Convey my heartfelt, soul-deep salam to the Compassionate One of Madinah. হালিমা মাথা নাড়ে— ঠিক তখনই ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে নড়তে বলে। আমিও নড়েচড়ে আমার ব্যাগপত্র মেশিনে রাখি। মেশিন চেকিং কমপ্লিট হওয়ার পর প্রায় দুইঘন্টার অপেক্ষাক্লান্তি যেনো নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো বোম্বাই এয়ারপোর্টের অবয়ব দেখে— এককথায় দারুণ এবং অসাধারণ। দিল্লি এয়ারপোর্টের মতো এই এয়ারপোর্টটি এতো ব্যস্ত না— টিপটপ গোছানো— জায়গায় জায়গায় গার্ডেন— প্রকৃতির ছোয়া। দোকান আছে। তবে দোকানের কারনে বস্তিময় হয়ে যায়নি— পর্যাপ্ত ফাকা জায়গা— ফ্লোরে আলো পড়ে চিকচিক করছে— মাথার উপরে যে রোফ তাতে ফুলময় ❀ কারুকাজ। হঠাৎ চোখে আসে একটি নান্দনিক স্টল— সদ গুরুর গুরুত্বপূর্ণ কথামালা নিয়ে ব্যানারকর্ম— ছবিকর্ম বলা যায় অর্থাৎ তিনার বিভিন্ন মোশনের ছবি— ছবির নিচে তিনার দার্শনিক কথাবার্তা।  দাড়িয়ে দাড়িয়ে সবগুলো কথা পড়ি— ভালো লাগলো বেশ—

Diversity is a strength.

It has arisen in this culture out of richness, not out of divide.


Grace is subtle.

Unless you are alert you will miss it.


বেশভূষার বাহাদুরি নাই ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কিন্তু বেশভূষার অলঙ্কার আছে— সেই অলঙ্কারের আবার শিল্পমান আছে বোল্ড করে বলার মতো। বলার মতো একটি রাত যাপিত হলো ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু কেমনে বলমু যা লেগে আছে চোখের মন্দিরে মনের অন্দরে— তাকে তো প্রার্থনায় কেবল পাওয়া যায়— পাওয়া যায় না তারে নির্মিত ভাষায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন