শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬

জুলাই তুমি

 জুলাই তুমি জলের মতো নিচের দিকে নামো 

   লোভবাজার খুব সহজে ঘোলা জলে আনো

     সত্য তখন তলিয়ে থাকে কাদার স্তরে স্তরে

        স্বচ্ছ নদী খোঁজে মানুষ অন্ধকারের পরে

সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

আ ফা লের মা মাছ 🐠

মাননীয় বিচারক— পৃথিবীকে আপনি জামিনে নয়— বেখেসুর খালাস ঘোষণা করুন! কোনো আইনি ধারায় আপনার কাছে আমরা বিচার চাইতে আসি নাই— আমরা আপনার দয়ার দরিয়ায় সিজদারত হে বিচারক!


০২


একটা মানুষ যদি দৌড়াইয়া কোনো কিছু ধরতে চায় তাহলে সে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে— একটা মানুষ যখন নিজের ভেতরে দৌড়ায় তখনই সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে❤️🕊️


০৩


ভয় আসবে মনে— ভয় মনে আসা স্বাভাবিক— তবে ভয়কে বয়ফ্রেন্ড বানানো যাবে না হে  সওদাগর।


টেনশন, ভয়, লোভলালসা পরিকল্পনা একসঙ্গে স্নায়ুর খনিতে বসবাস করে— তাদের থেকে পরিকল্পনা বা আইডিয়াকে আলাদা করে নিতে হবে— আলাদা করে নিতে হবে সৎ সাহসকে।


ধানক্ষেত থেকে ধান পাওয়া যায়— কিন্তু চাল পেতে হলে কাটা, মাড়াই, শুকানো লাগে। স্বর্ণের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই— সুচিন্তার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই। 


স্বর্ণ সাধারণত পাথর বা মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। খুব কম ক্ষেত্রেই ছোট দানার মতো (placer gold) নদীর বালিতে পাওয়া যায়, সেটাও পরিশোধন ছাড়া ব্যবহারযোগ্য নয়।


স্বাস্থ্যকর চিন্তা বা উপকারী আইডিয়া অনেক ক্ষতিকর রিপুর সাথে মিশে থাকে— সেখান থেকে তাদেরকে আলাদা করে নিতে হয়— প্রজ্ঞার ফিল্টার দিয়ে স্বাস্থ্যকর চিন্তাকে আলাদা করে নিতে হয়।


ভয় কিংবা টেনশন আসা স্বাভাবিক— অস্বাভাবিক হলো তাদের সাথে বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডসুলভ আচরণ করা।


০৪


শিয়ালের সামনে মুরগি রেখে প্রমাণ করার কিছু নাই শিয়াল মুরগি খায় না— শিয়াল মুরগি খায় প্রমাণিত।


০৫


যেখানে পাওয়ার আশা থাকে না, যেখানে হারানোর ভয়ও থাকে না— ঠিক সেখানেই যখন জন্ম নেয় শ্রদ্ধা, সেই শ্রদ্ধার নাম তাকওয়া। তাকওয়ায় পরিপূর্ণ হৃদয়ে প্রভু অবস্থান করেন, যেমন করে ঘন অন্ধকারে অবস্থান করে পূর্ণিমার চাঁদ।


০৬


যতটুকু পারেন ততটুকু দুর্নীতি বন্ধ করলে হবে না—


যতটুকু দরকার, ততটুকু দুর্নীতি বন্ধ করতেই হবে।


দুর্নীতি কমানো কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব। যেখানে যতটা কঠোরতা দরকার, সেখানে ঠিক ততটাই কঠোর হতে না পারলে ন্যায় শুধু কথায় থেকে যায়, কাজে নয়।


০৭


কথা দিয়ে যে কথা রাখে না সে শত্রু হওয়ারও যোগ্যতা রাখে না— কথা দিয়ে যে কথা রাখে সে শত্রু হলেও স্বর্ণের মতো দামি।


০৮


প্রেম কবরের নীরব অন্ধকারে চলে গেলে— যেও না তার কাছে মুনকার–নাকির হয়ে সওয়াল–জবাব করতে— যেও না, হে প্রেমিক, কবরের সেই প্রেমের কাছে— বরং নিঃশব্দে, গভীর মমতায় কবরের উপর একটি ফুলগাছ রোপণ করে এসো যেন কোনো এক ভোরের কোমল আলোয় কবরে প্রস্ফুটিত ফুলের দিকে তাকিয়ে তুমি বলতে পারো— হে ফুল, তুমি অপরূপ সুন্দর— কিন্তু তোমার চেয়েও গভীর, তোমার চেয়েও অনন্ত সুন্দর আমার প্রেম।


০৯


প্রভু, তোমার কথা যখনই মনে আসে, আমি হাসি— এক উপায়হীন হাসি। কারণ তুমি ভাজা মাছকে ক্ষমতা দিয়েছ প্রাজ্ঞ খিজির (আলাইহিস সালাম)-কে চেনার, অথচ আমাকে দাওনি একটি ভাজা মাছের ক্ষমতাকেও জানার।


১০


নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি মানুষের কিংবা রাষ্ট্রের দুর্দশার লক্ষণ— আর সোনা বা মেটালের মূল্য বৃদ্ধি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার লক্ষণ।


১১


শুধু থালা-বাসনে খানা খেলেই মানুষ হওয়া যায় না— মানুষ হতে গেলে সারা পৃথিবীর কল্যানের চিন্তায় অ্যাকশন থাকতে হয়— কুকুরের মতো হাড্ডি দখলের প্ল্যান এন্ড অ্যাকশন  নিলে হয় না কেবল— মগজের কাজ বাড়াতে হবে— ভোগের কাজ কমাতে হবে।


১২


আপনার জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিন আছে। এক— যেদিন আপনি পৃথিবীতে জন্ম নিলেন। দুই— যেদিন আপনি জেনে গেলেন এই পৃথিবীতে আপনার জন্মের কারণ।


মজার কথা হলো, যেদিন আপনি জানবেন কেন আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন, ঠিক সেই দিনই আপনার জন্ম হলো।


১৩


Sometimes words are too poor to inspire you again; sometimes inspiration itself is too poor to get something again. I myself realize the words “be easy,” and then it happens to be easy.


১৪


মানুষের জীবনে দুই ধরনের ব্যথা আছে— এক ধরনের ব্যথা মানুষকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে— ফলে ব্যথাবহনকারী ব্যক্তি হয়ে ওঠে একান্ত ব্যক্তিগত। আরেক ধরনের ব্যথা ব্যক্তিকে পরিবর্তন করে— ব্যক্তি হয়ে ওঠে সামষ্টিক এবং সামষ্টিক কল্যাণে নিয়োজিত আত্মা। অর্থাৎ একটি ব্যথা মানুষকে নিজের মধ্যে আটকে রাখে; অন্যটি মানুষকে পৃথিবীর সাথে সংযুক্ত করে। 


১৫


Intention or intentionally are very popular words among many people, though they are not always famous in the true sense. By using these words, many people try to make others understand that they did not mean what they uttered. They often say, “I didn’t say it intentionally.”


But the reality is that both the conscious mind and the unconscious mind have intentions. Some people may be honest when they say this, but many are not.


For example, when you know that the demand for milk will increase in the market today, your mind tells you that you should sell milk at a higher price than usual. You wait for customers who are willing to pay more— This is the intention of the conscious mind.


On the other hand, when you know that the demand for milk in the market is normal, you prepare to sell milk at the regular price and go back home. Yet somewhere in your mind there remains a silent wish that you might still be able to sell it at a higher price— This is the intention of the unconscious mind.


The intention of the conscious mind often tries to deceive others, while the intention of the unconscious mind sometimes tries to deceive the conscious mind itself.


So, my struggling brothers and sisters, remember this: no cell in the body works without intention. Through the activity of cells, hormonal factors are produced. And through these hormonal factors, the entire system of information and communication within the body is completed—through which I and you exist as human beings, just as animals exist as living beings.


Thank you— both to myself and to all of you.


১৬


কুয়াশা কখনো করে না— কখনোই করবে না সূর্যের প্রশংসা। 


১৭


এই জাতির এক অদ্ভুত আচরণগত বৈশিষ্ট্য আছে— তারা নিজের অক্ষমতা দেখে কাঁদে না, কিন্তু অন্যের অক্ষমতা দেখে হাসে। যেন অন্যের ব্যর্থতাই তাদের আনন্দের উৎস। সত্য কথা হলো— এই জাতি হাসতে জানে, কিন্তু হাসাতে জানে না; কাঁদতে জানে এবং কাঁদাতেও জানে। 


১৮


Failure is a teacher— an excellent but expensive one, demanding a high price as the fee for your learning. Sometimes, however, it asks only a small price, because the lesson it offers is also small. 


১৯


রাজা একজন মানুষ— সিংহাসন কেবল তার মাথার টুপি, তার মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু যখন রাজা নিজেকেই রাজত্ব ভেবে বসে, তখনই পদদলিত হয় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা। ঠিক সেই মুহূর্তেই জনগণ জেগে ওঠে— তারা খুঁজতে থাকে নতুন এক মাথা, যার উপর অর্পণ করা যায় সেই মর্যাদার মুকুট। এভাবেই একদিন রাজত্ব বদলায়— রাজা নয়, টিকে থাকে কেবল ক্ষমতার অনন্ত চক্র।


২০


অধিকাংশ মানুষ মনে করে পুরুষ শুধু সুন্দরী বা সফল নারী চায়। কিন্তু সত্যটা আরও গভীর— সে চায় এমন একজন মানুষ, যার ভেতরে শান্তি আছে। সৌন্দর্য কিংবা সফলতা তখনই মূল্য পায়, যখন তা ঘর ও জীবনে প্রশান্তি বয়ে আনে। কারন সম্পর্ক টিকে থাকে সৌন্দর্যে নয়— স্বস্তিতে। সফলতায় নয়—সমঝোতায়।


ঝগড়া নয়, প্রয়োজন সংলাপ— আধিপত্য নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা। তাই ইতিহাসও বলে— ঝগড়াটে রাজার চেয়ে


শান্তিপ্রিয় ভিক্ষুকই অনেক সময় বেশি কল্যাণ বয়ে আনে।


২১


মেয়েদের এখনো অল্প বয়সে বিয়ে হয়, মা হয়ে যায় প্রস্তুতি ছাড়াই, স্বপ্নগুলো শুকিয়ে যায় সংসারের চাপে। আমরা তখন ধর্মকে দোষ দেই। কিন্তু সত্যিটা অস্বস্তিকর— ধর্ম না, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই মেয়েদের আটকে রাখে। ধর্ম মানুষকে গরীব করে না— গরীব করে মানসিক সংকীর্ণতা, গরীব করে সুযোগের অভাব, গরীব করে চিন্তার দরিদ্রতা।


ধর্মের জন্ম হয়েছিল মুক্তির জন্য, শান্তির জন্য, মানুষকে মানুষ করার জন্য। কিন্তু আমরা? আমরা ভাতা দিয়ে বিবেক ঢাকি, সংখ্যা দিয়ে বাস্তবতা লুকাই, আর উন্নয়নের নামে এক ধরনের নীরব প্রতারণা চালাই। নারীকে এগিয়ে নিতে চাইলে— টাকা নয়, চিন্তার বিপ্লব দরকার। কারন একটা ভাতা একজন মানুষকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু একটা দৃষ্টিভঙ্গি একটা প্রজন্মকে বদলে দিতে পারে। 


আর শুনুন— নারী পিছিয়ে নেই, নারীকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। আপনার উন্নয়নের ক্যামেরায় তাকে না দেখা গেলেও, জীবনের গভীর সত্যটা বদলায় না— রক্তের শক্তি, সৃষ্টির উৎস, টিকে থাকার সাহস— সবকিছুর শিকড়েই আছে নারী।


নারীকে এগিয়ে নেওয়ার বড় বড় কথা বলার আগে, তাকে নিচে নামিয়ে রাখার অভ্যাসটা বন্ধ করুন। কারণ নারীকে টেনে তুলতে হয় না— তাকে শুধু আটকে রাখা হাতগুলো সরিয়ে দিলেই সে নিজেই উঠে দাঁড়ায়।


২২


বড় হতে হতে যে বড়ো হয়ে যায়— এমন কারো কাছ থেকে দূরে থাকা চায়— বড় হতে হতে যে মহৎ হয়ে উঠে তার সঙ্গ নিয়ে নিজেরে রঙিন বানাই। 


২৩


অজ্ঞতা থেকে ভয়। ভয় থেকে ক্ষয়।  অর্থাৎ যে বিষয়ে তুমি ভয় পাচ্ছো সেই বিষয়ে তোমার জ্ঞান কম। আর ভয়ের এমন এক দারুণ ক্ষমতা আছে যে সে তোমাকে মানসিকভাবে একেবারে পঙ্গু করে দিতে পারে। ফলে তোমার ক্ষয় অনিবার্য। ক্ষয়ের শেষ প্রান্তে আবারও জয়— অনিবার্য জয়। কারন তুমি এমন এক শক্তি যার রূপান্তর আছে কিন্তু বিনাশ নাই।


২৪


ভালো হতে পয়সা লাগে— পয়সা লাগে না খারাপ হতে। 


২৫


যার হাতেই আপনি ক্ষমতা দিবেন সেই আপনার ক্ষমতা কেড়ে নিবে— কারন ভিক্ষুক কখনো ভিক্ষা দেয় না!


২৬


দুধ দীর্ঘজীবন লাভ করলে সেই আর দুধ থাকে না। সে হয়ে যায় দই, দুধ আরও দীর্ঘজীবন লাভ করলে সে হয়ে যায় ঘি, দুধ আরও দীর্ঘজীবন লাভ করলে সে হয়ে যায় পনির, দুধ আরও দীর্ঘজীবন লাভ করলে সে হয়ে যায় ঔষধ।


সো, দীর্ঘজীবনকে প্রক্রিয়া করে নিতে পারলে আপনি হবেন প্রাকৃতিক মানুষ, আর প্রক্রিয়া করতে ব্যর্থ হলে আপনি হবেন প্রক্রিয়াজাত মানুষ।


দুধ যেমন যত্ন আর সঠিক প্রক্রিয়ায় রূপ বদলায়, তেমনি মানুষও সময়ের ভেতর দিয়ে বদলায়। পার্থক্য শুধু— কে নিজেকে গড়ে, আর কে কেবল বদলে যায়। বদলানোর মধ্যেও এক ধরনের সৌন্দর্য আছে। আর সেই সৌন্দর্য দ্বিধায় থাকে না— সে গ্রহণ করে বা বর্জন করে। সৌন্দর্য কখনো ঝুলে থাকে না; সে স্পষ্ট— হয় ‘হ্যাঁ’, নয় ‘না’।


২৭


এই সমাজে যাদের আমরা ক্ষমতাধর ও ধনী বলে দেখি তারা নিজের শক্তিতে নয়— জনগণের শ্রম, আস্থা আর সুযোগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।


সময় আসছে, যখন মানুষ বুঝবে তার ঘামের মূল্য কে নিচ্ছে— সেই বোঝাপড়া থেকেই জন্ম নেবে জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার আর সমতার দাবি।


পরিবর্তন আসবে— লুটপাট দিয়ে নয়, সচেতনতা আর অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।


২৮


লোভ থেকে যে লাভ আসে আর লাভ থেকে যে লোভ আসে দুই-ই বিনিয়োগ মানসিকতাকে ফাদে ফেলে। শয়তানের ফাদ থেকে মুক্ত থাকতে হলে লোভের লাভ এবং লাভের লোভ বাদ দিতে হবে।


তাহলে লোভ কী?


লোভ হলো প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে আরও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এটা শুধু “চাওয়া” না— এটা হলো চাওয়ার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারানো।


তাহলে লাভ কী? 


লাভ হলো বিনিয়োগ বা কাজের মাধ্যমে পাওয়া বাস্তব, হিসাবযোগ্য অর্জন। লাভ = শৃঙ্খলিত ফলাফল। লোভ + লাভ = লাভকে ধ্বংস করার সম্ভাবনা অথবা অস্থিতিশীল সাফল্য।


২৯


The intention of making no one happy is often the first step toward making everyone happy. 


৩০


যে সেবায় ত্যাগ থাকে, সেই সেবাই পূজা— সেই প্রার্থনা। শরীরের শ্রম আর মনের আন্তরিকতার মিশ্রণে তপস্যা জন্ম নেয় ত্যাগের ঘরে। যে অভ্যাস প্রয়োজনেও ত্যাগ করা যায় না, তাকে ভালো অভ্যাস বলা যায় না মিয়া ভাই— ওটা তখন দাসত্ব।


তাই খারাপ অভ্যাস ছাড়তে হয়, আর ভালো অভ্যাসকেও কখনো কখনো বিসর্জন দিতে জানতে হয়; কারণ স্বাধীন আত্মা কোনো কিছুরই বন্দিফল নয়।


৩১


হয় চুপ থাকেন অথবা চুপ রাখেন— ইজ দ্যা বেস্ট মেথড অব কমিনিউকেশন। 


৩২


ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি— 'যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ।' যদি কথাটা সত্যি হয়, তাহলে লঙ্কা আসলে রাবণ তৈরির কারখানা। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই কারখানা এখনো টিকিয়ে রেখেছি কেন? তাহলে কি আমরা চেতনে বা অবচেতনে রাবণ হওয়ার সম্ভাবনাকে লালন করি? নাকি সত্যটা অন্য কোথাও— রাবণ তৈরি হয় না লঙ্কায়, রাবণ লুকিয়ে থাকে মানুষের ভেতরে; লঙ্কা কেবল তাকে প্রকাশ হওয়ার সুযোগ দেয়। ক্ষমতার কাঠামো তাই ধ্বংস করলেই রাবণ বিলুপ্ত হয় না, বরং প্রয়োজন সেই চেতনার পরিবর্তন, যা ক্ষমতাকে সেবায় রূপান্তরিত করে— শাসনে নয়।


৩৩


আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে মহাকালীন করে তুলেছেন— আমাদের কাজী নজরুল ইসলাম মহাকালীন যন্ত্রণাকে ব্যক্তিগত করে তুলেছেন। 


অথবা


রবীন্দ্রনাথ নিজের কান্নাকে সবার কান্না করেছেন— নজরুল সবার কান্নাকে নিজের কান্না করেছেন।


৩৪


প্রেম আর আগুনকে জাগ্রত রেখে তুমি ঘুমাতে পারবে না— ঘুমাতে পারবে— ঘুমে যদি পুড়ে যাওয়ার ভয় না থাকে। 


৩৫


দেশের জন্য যত অবদানই রাখা হোক— একজন নেতা কখনো সবার প্রশংসা পান না। সমালোচনা, বিরোধিতা এবং ভুল বোঝাবুঝি নেতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবুও প্রকৃত নেতৃত্ব হলো প্রতিকূলতার মাঝেও ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা ধরে রেখে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করে যাওয়া।


নেতৃত্বের পথ প্রায়ই একাকী হয়— নেতৃত্বের ত্যাগ অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়— এর ভারও সবাই অনুভব করতে পারে না— কিন্তু সময় শেষ পর্যন্ত তাদেরই মূল্যায়ন করে, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে যায়। 


একটি প্রবাদ শুনে শুনে বড় হয়েছি— “সত্যের নাও সাতবার ডুবে, সাতবার ভাসে; মিথ্যার নাও একবার ডুবলে আর ভাসে না।”


সময় কখনো কখনো সত্যকে আড়াল করে রাখতে পারে— কিন্তু পরাজিত করতে পারে না। মিথ্যা হয়তো কিছুদিনের জন্য জয়ী বলে মনে হয়— কিন্তু তার স্থায়িত্ব নেই। শেষ পর্যন্ত সত্যই মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, আর মিথ্যা নিজের ভারেই ডুবে যায়।


তাই সময়কে সময় দিতে হয়— কারণ সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার অপেক্ষা করার ক্ষমতা।


৩৬


আপনার মন্দ বললে যদি আমার কোনো উপকারই না হয়, তাহলে আমি কেন আপনার মন্দ বলব? অন্যের মন্দ বলতে বলতে মানুষ আসলে নিজেরই ক্ষতি করে।


জমিতে তামাক চাষ করলে যেমন ধীরে ধীরে জমির উর্বরতা কমে যায়— তেমনি মানুষের চিন্তার জমি— এই ছোট্ট ব্রেইন, যার আয়তন মাত্র ১,২০০–১,৪০০ ঘন সেন্টিমিটার সেখানেও আমরা চিন্তার বীজ বপন করি যেখানে আমাদেরকে সহযোগিতা করে  প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন (স্নায়ুকোষ)। 


সেখানে চাইলে ইতিবাচক চিন্তা চাষ করা যায়— আবার নেতিবাচক চিন্তাও। কিন্তু বারবার নেতিবাচক চিন্তা চাষ করলে মনের উর্বরতা কমে যায়— দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, শান্তি নষ্ট হয়।


মনে রাখবেন, জমি কিন্তু একটাই। সেই জমিতে কী ফলাবেন, সেই সিদ্ধান্তও আপনার।


আর একটি কথা— নেগেটিভকে পজিটিভ বলে চালিয়ে দেওয়াও এক ধরনের নেগেটিভতা। সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহসই ইতিবাচকতার প্রথম শর্ত।


৩৭


ক্ষমতা চরিত্রের জন্য ঠিক ততটাই যতটা খাদ্য শরীরের জন্য। হজমশক্তি না থাকলে খাদ্য যেমন বিষ হয়ে ওঠে তেমনি আত্মসংযম না থাকলে ক্ষমতাও ধ্বংসের কারন হয়ে দাঁড়ায়।


যারা নিজের ক্ষমতা দেখানোর ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না— তারা আসলে ক্ষমতার যোগ্যতার কাছেই পরাজিত। ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে ক্ষমতা হজম করার সামর্থ্য অনেক বড়। ক্ষমতা প্রদর্শন করার আকাঙ্ক্ষা যত প্রবল চরিত্রের পরিপক্বতা তত প্রশ্নবিদ্ধ। সত্যিকারের শক্তিশালী মানুষ নিজের শক্তি প্রদর্শনে নয়, নিজের শক্তিকে সংযত রাখায় বিশ্বাসী।


ক্ষমতা মানুষের মর্যাদা বাড়ায় না— মানুষ কতটা ক্ষমতা হজম করতে পারে সেটাই তার প্রকৃত উচ্চতা নির্ধারণ করে। যে মানুষ নিজের অহংকার, আবেগ ও প্রদর্শনের লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না— সে যত বড় ক্ষমতার অধিকারীই হোক না কেন শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতার ভারেই নত হয়ে যায় সে। কারন ক্ষমতা কখনো চরিত্র সৃষ্টি করে না— চরিত্রই ক্ষমতাকে মর্যাদা দেয়।


৩৮


ফুটবল খেলা আমি অবশ্যই দেখি। হাতের কাজ শেষ করে যখন কিছু অবসর পাই, তখন খেলা দেখি। কিন্তু আমি খেলা দেখি— খেলার ফলাফল নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। কারন  যেকোনো ফলাফল-চিন্তা এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি করে— স্বাভাবিক আমিকে অস্বাভাবিক আমিতে রূপান্তরিত করে।


তাই কোথাও ভ্রমণে গেলেও আমি কোনো নির্দিষ্ট স্পটের প্রেমিক হয়ে উঠি না। আমার কাছে প্রতিটি মুহূর্তই ভ্রমণ— গন্তব্য নয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পথটাই আসল ভ্রমণ।


গোটা পৃথিবী যেন এখন ফলাফলবাদী হয়ে উঠেছে। একসময় পড়তাম— “জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো।” আর এখন যেন বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে— “কর্ম হোক যথাতথা, ফলাফল হোক ভালো।”


এই ফলাফলবাদী পৃথিবী মানুষকে আরও বিভক্ত করবে, আরও ভোগবাদী করে তুলবে। কারন যখন ফলই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে তখন পথের সৌন্দর্য, শ্রমের আনন্দ এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা— সবই ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে।


আমার কাজ কর্ম করে যাওয়া— ফলাফল এনে দেওয়া কর্মের কাজ। কর্ম না করে যদি ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি তবে তা ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার মতোই অবাস্তব চেষ্টা।


আবার কর্ম করার সময়ও যদি ফলাফল নিয়েই ভাবতে থাকি তবে আমার মনোযোগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়— এক ভাগ কর্মে, অন্য ভাগ ফলাফলে। মনোযোগ যখন বিভক্ত হয় তখন কোনো কাজ থেকেই শতভাগ ফল বেরিয়ে আসে না।


গ্রামবাংলার একটি প্রবাদ আছে— "দুই নৌকায় পা দিলে, পা থাকে না।" কর্মের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। যে মন পুরোপুরি কাজে নিবিষ্ট, সেই মনই সর্বোচ্চ সামর্থ্য প্রকাশ করতে পারে। ফলাফল তখন তার নিজের সময়ে, নিজের নিয়মেই এসে ধরা দেয়।


কর্ম আমার হাতে— ফলাফল কর্মের হাতে। তাই ফলের নয়, কর্মের প্রতি বিশ্বস্ত থাকাই প্রজ্ঞার লক্ষণ।


৩৯


যেখানে আপনার ক্ষমতা কাজ করে না সেখানে বলেন "আল্লাহ ভরসা।" আর যেখানে ক্ষমতা কাজ করে সেখানে বলেন "দেখে নেব।" অর্থাৎ আপনি নিজেই নিশ্চিত নন, আপনার প্রকৃত ভরসা কোথায়। আগে নিজেকে নিশ্চিত করুন। তখন ভরসা খুঁজতে হবে না; আপনি নিজেই ভরসার প্রতীক হয়ে উঠবেন।


প্রভু কখনো শুধু মাছ হাতে তুলে দেন না; তিনি ছিপ ধরিয়ে দেন যাতে আপনি সারাজীবন নিজের চেষ্টায় মাছ ধরে খেতে পারেন।


৪০


ভেড়ার পালের সামনে যে থাকে সেও ভেড়াই— সামনে থাকা ভেড়া এবং পালের একেবারে শেষের ভেড়ার মধ্যে গুনগত কোনো পার্থক্য নাই— সিংহ পালে চলে না— পলে পলে চলে— প্রতিটি সিংহের গুনগত পার্থক্য আলাদা— তারা আলাদা হয়েও বনের রাজা। সিংহ যে বনের রাজা এই কথা সিংহ বলে না— বলে ভেড়ার পাল।


৪১ 


উপার্জন, যশ, সুনাম কিংবা খ্যাতি যদি আপনাকে নিজের সত্যের পথে অটল থাকার কারনে আপনজনদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়— তবে বুঝবেন আপনি সুবিধার চেয়ে বিবেককে বেশি মূল্য দিয়েছেন। সত্যের পথের এই একাকীত্ব অনেক সময় কেয়ামতের ময়দানের একাকীত্বের মতোই গভীর।


কিন্তু উপার্জন, যশ ও খ্যাতি যদি আপনাকে সত্য বিসর্জন দিয়ে কেবল আপনজনদের সন্তুষ্ট রাখার উপায়ে পরিণত করে— তবে সতর্ক হোন। তখন আপনি প্রজ্ঞার নয়, আপসের পথে হাঁটছেন। এই আপস একদিন আপনাকে ভেতর থেকে নিঃস্ব করে দেবে— এমন নিঃস্ব, যার সবকিছু আছে, অথচ নিজের বলে কোনো অর্জন নেই।


৪২


যার অভাব আছে, তার অভাব দূর করতে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করুন। দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক অভাব মানুষের মনে অনিরাপত্তা, হতাশা ও মানসিক দারিদ্র্যের জন্ম দিতে পারে। সেই কারণে অভাবগ্রস্ত মানুষকে করুণা নয়— সম্মান ও সহায়তা দিন।


অভাবের চাপ কখনো কখনো মানুষের মধ্যে হীনমন্যতা ও হিংসার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। আর এই অনুভূতিগুলো দীর্ঘদিন লালিত হলে তা কৃপণতার মতো মানসিক প্রবণতায় রূপ নিতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়— অনেক মানুষ অভাবের মধ্যেও উদার, আত্মমর্যাদাবান ও মহান থাকেন।


মিতব্যয়িতা ও কৃপণতা এক নয়। মিতব্যয়ী ব্যক্তি জানেন কোথায়, কখন এবং কতটুকু ব্যয় করা উচিত— তিনি অপচয় করেন না— আবার প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও কার্পণ্য করেন না। অন্যদিকে কৃপণ ব্যক্তি সঞ্চয়ের আনন্দে প্রয়োজনীয় ব্যয়ও এড়িয়ে যান। ফলে অর্থ জমলেও সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


তাই অভাবকে অবহেলা নয়— সহমর্মিতার সঙ্গে মোকাবিলা করুন— আর অর্থ ব্যবহারে কৃপণতা নয়— প্রজ্ঞাপূর্ণ মিতব্যয়িতাকে বেছে নিন।


সহায়তা মানে ভিক্ষা দেওয়া নয়— সহায়তা মানে এমন একটি সুযোগের ব্যবস্থা করে দেওয়া যাতে মানুষকে আর কখনো ভিক্ষা করতে না হয়। সাময়িক দান ক্ষুধা মেটাতে পারে কিন্তু সক্ষমতা সৃষ্টি মানুষকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে শেখায়। প্রকৃত সহায়তা মানুষের হাতে ভিক্ষার পাত্র তুলে দেয় না— বরং তার হাতে তুলে দেয় কাজের উপকরণ, দক্ষতা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি।


৪৩


কর্তব্যকে দূরে ঠেলে, যারা সুবিধাকে বুকে টেনে নেয়, তারা যখন সেই সুবিধা থেকে নিজেদের প্রত্যাশিত সুবিধা পায় না, তখন আক্ষেপ করে বলে— "সারাটা জীবন দুধকলা দিয়ে সাপ পুষেছি।"


কিন্তু সত্যটা ভিন্ন। তারা সাপ নয়, সুবিধাকেই লালন করেছে। আর দুধকলার সাপও অন্য কেউ নয়— তারা নিজেরাই।


৪৪


তার সাথে যদি আপনি সংসার করেন তার মন্দ কোথাও বলিয়েন না— তার মন্দ যদি বলতেই হয় সংসারটা আর করিয়েন না— নিজেদের সমস্যা নিয়ে নিজের মধ্যে আলোচনা পর্যালোচনা হতে পারে— নিজেদের সমস্যার কথা, গর্তের কথা  বাজারে তুলতে হয় না— মনে রাখবেন, ঘরে গর্ত আছে জানলে, সাপ ইন্দুর আসবে— সংসার আসবে না।


৪৫


মানুষটা যাতে মারা যায় তার সমস্ত আয়োজন আমরা করি— মানুষটা মরে যাওয়ার পর শোকের আয়োজন আমরা করি— শোকের আয়োজনে তার সাথে আমাদের কি দারুণ দারুণ সম্পর্ক ছিলো তার বর্ণনা করি— আয়োজনটা আমরা ভালো পারি— নিজের প্রয়োজনের আয়োজন। 


আমরা নিজের প্রয়োজনে সাহায্যের হাত রাখি, নিজের প্রয়োজনে সাহায্যের হাত তুলে ফেলি— এই কথা যেদিন অকপটে বলতে পারবো সেইদিন রাষ্ট্রের কিংবা সমাজের একটা যৌথ সিস্টেম দাঁড়াবে— অন্যথায় প্রচলিত সিস্টেমকে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।


৪৬


প্রেমিক হতে হলে দরকার তৃষ্ণা— জানার নয়, পাওয়ারও নয়; অনুভবের তৃষ্ণা। জ্ঞানী হতে হলে দরকার আগ্রহ। আগ্রহ থেকে জন্ম নেয় অনুসন্ধান, অনুসন্ধান থেকে জন্ম নেয় জ্ঞান। আর যখন সেই জ্ঞান বিনয়, অভিজ্ঞতা ও মানবিকতায় পরিপক্ব হয়, তখন জন্ম নেয় প্রজ্ঞা।


একটি জ্ঞানের শহর আরেকটি জ্ঞানের শহরকে প্রশ্ন করে, তর্ক করে, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়— সেখান থেকেই কখনও কখনও গড়ে ওঠে মতের দেয়াল, দ্বন্দ্বের পৃথিবী।


কিন্তু প্রেমের পৃথিবী ভিন্ন। সেখানে জয়-পরাজয়ের হিসাব নেই— আছে আত্মসমর্পণ, সহমর্মিতা ও সংযোগ। তাই প্রেমের পৃথিবী প্রজ্ঞার পৃথিবী, প্রশান্তির পৃথিবী, তৃষ্ণার পৃথিবী— যেখানে প্রশ্নের চেয়ে উপলব্ধি বড়, আর যুক্তির চেয়ে মানবিকতা গভীর।


৪৭


ঘড়ির মধ্যে সময় খুজতে যেওনা রেজা— যেখানে ঘড়ি নাই সেখানেও সময় থাকে!


৪৮


সবাই বলে— শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ অর্জুন— শ্রেষ্ঠ গদাধর ভীম— শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক নকুল— বিপদের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া সুন্দর পুরুষ সহদেব— আর সত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ যুধিষ্ঠির।


কিন্তু এই পাঁচ শ্রেষ্ঠ পুরুষের সঙ্গে জীবন কাটানো দ্রৌপদীর কথা কেউ বলে না। কারণ, সে নারী।


নারীর শ্রেষ্ঠত্বের শস্যগোলা আয়োজনের কথা ইতিহাস খুব কমই লিখে রাখে। একজন নারীকে পাঁচজন মানুষকে ভালোবাসা, সম্মান, দায়িত্ব ও সম্পর্কের ভারসাম্যে ধারণ করতে কী পরিমাণ মানসিক শক্তি, ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং সামর্থ্যের প্রয়োজন— সে হিসাব কেউ রাখে না।


ভাবুন তো, পাঁচজন শ্রেষ্ঠ মানুষকে মেইনটেইন করার জন্য দ্রৌপদীকে কতখানি শ্রেষ্ঠ হতে হয়েছিল!


তবে ভাববেন কেন? ভাবতেও তো শক্তি লাগে। আর সেই ধৈর্য ও শক্তি আপনাদের থাকার কথা নয়— আপনারা তো এমনিতেই শক্তিশালী!


৪৯


মাটির সঙ্গে স্বর্ণের নিয়মিত দেখা হলে— নিয়মিত আড্ডা হলে মাটি স্বর্ণ হয়ে যায় না। স্বর্ণ, স্বর্ণের সঙ্গে আড্ডা না দিয়েও স্বর্ণই থাকে। মজার ব্যাপার হলো— স্বর্ণ স্বর্ণের সঙ্গেই থাকে, মাটিও মাটির সঙ্গেই থাকে।


ডিমে তাপ দিলে প্রাণের জন্ম হয়— খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে বাচ্চা— মুরগিকে তাপ দিলে প্রস্তুত হয় খাবার। তাপ একই, ফল ভিন্ন।


এই পৃথিবীতে সান্নিধ্য আর তাপ— দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সান্নিধ্য সবাইকে স্বর্ণ বানায় না— আর তাপও সবাইকে জীবন্ত করে তোলে না। মাটি স্বর্ণের পাশে থেকেও মাটিই থেকে যায়— আবার একটি ডিম সঠিক তাপে জীবনের জন্ম দেয়—আর একটি মুরগি সেই একই তাপে খাদ্যে পরিণত হয়।


তাই কোথায়, কাকে, কতটুকু এবং কী উদ্দেশ্যে তুমি তোমার সময়, শ্রম, ভালোবাসা ও তাপ দিচ্ছ তা আগে জেনে নাও হে কারিগর। কারন সবকিছুকে একইভাবে স্পর্শ করা যায় না। কেউ সান্নিধ্যে বদলায়, কেউ বদলায় না— কেউ তাপে জন্ম দেয় জীবন— কেউ তাপেই হয়ে ওঠে ভোজনের উপকরণ।


৫০


আমাদের নির্মাতারা দর্শককে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে সিনেমা বানাচ্ছে না— দর্শক বানাচ্ছে— দর্শক সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখছে না— মজা দেখছে— লাল নীল হলুদ মজা— কটকডি মজা।


৫১

পক্ষে গেলে দুলা ভাই— বিপক্ষে গেলে চুলার ছাই

তা তৈ তা তৈ

কষ্ট আসে মনে

বৃষ্টি যেমন আসে

বৃষ্টি পেলে মাটির মন আনন্দে নাচে হাসে 

বুঝলে বুঝপাতা 

কষ্ট মনের বোনাস ভাতা 

শুকিয়ে যাওয়া স্বপ্নজুড়ে

জোছনামাখা ঢেউ 

কাবিল চিন্তা কষ্ট বাজায় তা তৈ, তা তৈ

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

স্রোত

উড়তে থাকা পাখি যখন ছায়ার মায়ায় পড়ে 

ডানায় তখন রোদ ক্লান্তি ভীষণ ভর করে 

ছায়াহীন পাখি আমি রোদের তাপে চলি

মেঘ আমার দীক্ষাঘর বাতাসের কথা বলি

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ব্রিটিশ থেকে আজ

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের “সেভেন সিস্টার্স” নামে পরিচিত সাত রাজ্যের মধ্যে Arunachal Pradesh, Meghalaya এবং Nagaland বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী। ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কারণে এই তিন রাজ্য ভারতের মূল ভূখণ্ডের অনেক অঞ্চলের চেয়ে ভিন্ন এক পরিচয় বহন করে।


অরুণাচল প্রদেশে শতাধিক উপজাতীয় ভাষা ও উপভাষার অস্তিত্ব রয়েছে। পাহাড়, অরণ্য ও নদীবেষ্টিত এই রাজ্যে এক জনগোষ্ঠীর ভাষা অন্য জনগোষ্ঠীর কাছে প্রায়ই অপরিচিত। ফলে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি একটি নিরপেক্ষ সেতুভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশাসন, শিক্ষা ও সরকারি কর্মকাণ্ডে ইংরেজির উপস্থিতি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


মেঘালয়ের চিত্রও কম বৈচিত্র্যময় নয়। খাসি, গারো ও জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। তবে শিক্ষা, প্রশাসন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যাপক ব্যবহার এই রাজ্যকে ভারতের অন্যতম ইংরেজি-নির্ভর অঞ্চলে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে নাগাল্যান্ডে রয়েছে বহু নাগা ভাষা। ভাষাগত বৈচিত্র্য এতটাই বিস্তৃত যে ইংরেজিই এখানে সরকারি ভাষা এবং প্রশাসন ও শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। পাশাপাশি নাগামিজ নামের একটি যোগাযোগভাষাও সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়।


ধর্মীয় দিক থেকেও এই তিন রাজ্যের পরিচয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অরুণাচল প্রদেশে ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় বিশ্বাস, হিন্দুধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম— তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে হিন্দুধর্ম অনুসারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও খ্রিস্টধর্মের প্রভাবও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।


মেঘালয়ে খ্রিস্টধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম। খাসি, গারো ও জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ খ্রিস্টান, ফলে চার্চ ও খ্রিস্টীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


নাগাল্যান্ডে খ্রিস্টধর্মের প্রভাব আরও গভীর। ভারতের সবচেয়ে খ্রিস্টান-প্রধান রাজ্যগুলোর অন্যতম এই অঞ্চলে জনসংখ্যার বিপুল অংশ খ্রিস্টধর্ম অনুসরণ করে— বিশেষ করে ব্যাপ্টিস্ট সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ভারতের মানচিত্রে এই তিন রাজ্য শুধু ভৌগোলিক সীমানার অংশ নয়; তারা বহুভাষিক সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ। শত শত ভাষার ভিড়ে ইংরেজি এখানে যোগাযোগের সেতু, আর পাহাড়ি জনপদজুড়ে খ্রিস্টধর্মের উপস্থিতি এই অঞ্চলকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র সামাজিক পরিচয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই তিন রাজ্য তাই বৈচিত্র্যের মধ্যেও সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।


Mother Teresa এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করেছে, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই অঞ্চলকে তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র বানাননি।


মাদার তেরেসার কাজের কেন্দ্র ছিল Kolkata। সেখান থেকেই তাঁর সংগঠন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও সমাজচ্যুত মানুষের সেবায় কাজ বিস্তৃত করে।


উত্তর-পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে Meghalaya, Nagaland, Assam এবং Arunachal Pradesh-এ মিশনারিজ অব চ্যারিটির সিস্টাররা অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম, স্বাস্থ্যসেবা ও দরিদ্র মানুষের সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

তবে নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ে খ্রিস্টধর্মের বিস্তারের প্রধান কারণ মাদার তেরেসা নন। সেখানে উনবিংশ ও বিংশ শতকে ইউরোপীয় ও আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট এবং অন্যান্য খ্রিস্টান মিশনারিরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে বড় ভূমিকা পালন করেন। মাদার তেরেসার অবদান ছিল মূলত মানবসেবা ও দাতব্য কার্যক্রমে, ধর্মান্তরকরণে নয়।


১৯৪৬ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত “call within a call” বা বিশেষ ধর্মীয় আহ্বানের কথা উল্লেখ করেন।


“Call within a call” (ডাকের ভেতর আরেক ডাক) কথাটি Mother Teresa নিজেই ব্যবহার করেছিলেন। তখন তিনি কলকাতার একটি ক্যাথলিক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন এবং সন্ন্যাসিনী হিসেবে জীবনযাপন করছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দার্জিলিং যাওয়ার পথে ট্রেনে তিনি গভীর এক ধর্মীয় অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, তিনি যিশু খ্রিস্টের কাছ থেকে একটি বিশেষ আহ্বান পেয়েছেন—কনভেন্টের নিরাপদ জীবন ছেড়ে সবচেয়ে দরিদ্র, অসহায় ও অবহেলিত মানুষের মাঝে গিয়ে কাজ করার জন্য।


এই কারণেই তিনি একে “call within a call” বলেছিলেন। অর্থাৎ: প্রথম “call” ছিল সন্ন্যাসিনী হওয়ার আহ্বান।

দ্বিতীয় “call” ছিল সন্ন্যাসিনীর জীবন বজায় রেখেও দরিদ্রদের মধ্যে সরাসরি সেবা করার আহ্বান। এই অভিজ্ঞতার পর তিনি কয়েক বছরের মধ্যে কনভেন্ট ছেড়ে কলকাতার বস্তিতে কাজ শুরু করেন এবং পরে Missionaries of Charity প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর তিনি Missionaries of Charity প্রতিষ্ঠা করেন। 


ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। একজন বিশ্বাসী খ্রিস্টান এটিকে ঈশ্বরের আহ্বান হিসেবে দেখবেন, আর একজন ইতিহাসবিদ এটিকে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা গভীর ধর্মীয় প্রেরণা হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন।


নোবেল কমিটি তাঁকে এই পুরস্কার দেয় দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষের সেবায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। তিনি কলকাতাকে কেন্দ্র করে মানবসেবামূলক কাজ পরিচালনা করতেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity বিশ্বের বহু দেশে সেবামূলক কার্যক্রম চালায়।


একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি ঐতিহ্যগত নোবেল ভোজ (banquet) বাতিল করার অনুরোধ করেছিলেন। সেই অর্থ দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হয়।


নোবেল ভোজ (Nobel Banquet) হলো নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের পর আয়োজিত একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নৈশভোজ। প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর, Alfred Nobel-এর মৃত্যুবার্ষিকীতে Stockholm-এ নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। এরপর সুইডেনের রাজপরিবার, নোবেল বিজয়ী, বিজ্ঞানী, কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ ও আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে এক বিশাল আনুষ্ঠানিক ভোজের আয়োজন করা হয়। এটিই নোবেল ভোজ বা Nobel Banquet।


১৯৭৯ সালে Mother Teresa নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর অনুরোধ করেন, এই ভোজের জন্য যে অর্থ ব্যয় হতো তা যেন দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়। তাঁর এই অনুরোধ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং তাঁর মানবসেবামূলক দর্শনের একটি প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করা হয় এবং ভোজের ব্যয় দাতব্য কাজে দেওয়া হয়।


১৯৮০ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান Bharat Ratna লাভ করেন। কিন্তু ২০১৬ সালে “Saint Teresa of Calcutta” হিসেবে স্বীকৃতি (Canonization) তিনি মৃত্যুর প্রায় ১৯ বছর পরে পান। ক্যাথলিক চার্চে কাউকে “Saint” বা সাধু হিসেবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়া সাধারণত মৃত্যুর পরই সম্পন্ন হয়। চার্চ ওই ব্যক্তির জীবন, কর্ম ও ধর্মীয় প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে পর্যালোচনা করে। এরপর Pope Francis ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে “Saint Teresa of Calcutta” ঘোষণা করেন। 


১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং সেই বছরই Mother Teresa-কে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান Bharat Ratna প্রদান করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি চার দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন:


১৯৬৬–১৯৭৭

১৯৮০–১৯৮৪


১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এরপর তাঁর পুত্র Rajiv Gandhi প্রধানমন্ত্রী হন— রাজনীতিতে আসার আগে তিনি পেশাগতভাবে একজন বিমানচালক (পাইলট) ছিলেন। তিনি ভারতের জাতীয় বিমান সংস্থা Air India-তে পাইলট হিসেবে কাজ করতেন— রাজীব গান্ধী প্রথমে রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর ছোট ভাই Sanjay Gandhi-এর মৃত্যুর পর পরিবারের ও দলের চাপে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪০ বছর, যা তাঁকে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী করে তোলে।


একটি ঐতিহাসিক কৌতূহলের বিষয় হলো, ইন্দিরা গান্ধী নিজে ১৯৮০ সালে মাদার তেরেসাকে ভারতরত্ন প্রদান করেন, অথচ তিনি নিজেও তার আগেই (১৯৭১ সালে) ভারতরত্ন লাভ করেছিলেন। 


১৯৩৪ সালে ইন্দিরা নেহেরু (পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধী) শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীর পাঠভবনে ভর্তি হন। তাঁর বাবা জওহরলাল নেহেরুর ইচ্ছায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে মা কমলা নেহেরুর অসুস্থতার কারণে তাঁর সেই শিক্ষাজীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে মায়ের চিকিৎসার জন্য তাঁকে ইউরোপে যেতে হয়।


জওহরলাল নেহেরুর নিজের শিক্ষাজীবন ছিল ইংল্যান্ডকেন্দ্রিক। বাড়িতে ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত Harrow School-এ পড়েন। এরপর Cambridge-এর Trinity College-এ Natural Sciences অধ্যয়ন করেন এবং পরে লন্ডনের Inner Temple থেকে আইনশাস্ত্রে শিক্ষালাভ করে ব্যারিস্টার হন।


অন্যদিকে তাঁর বাবা মতিলাল নেহেরু ভারতে শিক্ষালাভ করেই একজন সফল আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তাঁর অর্জিত সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানই জওহরলাল নেহেরুর আন্তর্জাতিক শিক্ষার পথ সুগম করে।


ঠাকুর পরিবারের উত্থান আরও আগে। অষ্টাদশ শতকে নীলমণি ঠাকুরদের সময় থেকে পরিবারটি কলকাতায় ব্যবসা ও সম্পদের ভিত্তি গড়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী ও জমিদার। ব্যাংক, জাহাজ, কয়লাখনি, নীলচাষসহ বিভিন্ন খাতে তাঁর বিনিয়োগ ছিল। ১৭৯৩ সালের Permanent Settlement-এর পর তিনি বিভিন্ন জমিদারি অধিগ্রহণ করেন। পরে সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ নিজে জমিদারির তদারকি করলেও নতুন কোনো জমিদারি অর্জন করেননি।


রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার সাহিত্যিক ভিক্টোরিয়া ওকামপোর সঙ্গে। ১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনায় অবস্থানকালে ওকামপোর আতিথ্য ও সান্নিধ্য কবিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই সময়ে রচিত বহু কবিতা পরে ‘পুরবী’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয় এবং ১৯২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি তিনি ওকামপোকে উৎসর্গ করেন। কবি তাঁকে ‘বিজয়া’ নামে সম্বোধন করতেন।


ওকামপো ১৯৩১ সালে ‘Sur’ নামে একটি সাহিত্যপত্র প্রতিষ্ঠা করেন। স্প্যানিশ ভাষায় ‘Sur’ অর্থ ‘দক্ষিণ’। নামটির মাধ্যমে তিনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। জন্মসূত্রে তিনি রোমান ক্যাথলিক হলেও তাঁর মানসিক বিকাশে ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ছিল।


ইউনেসকো প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি সক্রিয় অবদান রেখেছেন। আর্জেন্টিনার পেরন সরকারের সময় জেলজুলুমের অভিজ্ঞতাও নিতে হয়েছে তিনার— গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কারাগারে ছিলেন ২৬ দিন।  সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা তার প্রভাবশালী বন্ধুরা এগিয়ে আসেন সেই সময়। একসময় সে ছাড়া পায়— জনাব  জওহরলাল নেহেরুর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কারামুক্তির আয়োজনে। রক্ত কথা বলে— আরও কথা বলে রাজনৈতিক স্রোতধারা— ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৮ সালে   আর্জেন্টিনায় যান— ওকাম্পোর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরাকে বিশেষ স্নেহ করতেন ওকাম্পো৷ ইন্দিরা গান্ধীর আগমন উপলক্ষে লিখেছেন বিশেষ নিবন্ধ 'কমলা-চিত্রা ইন্দিরা'। 


সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো শ্রমিকবিরোধী ছিলেন না— আবার পেরনও সংস্কৃতিবিরোধী ছিলেন না। কিন্তু একজন মনে করতেন স্বাধীনতা ছাড়া সামাজিক ন্যায় সম্ভব নয়— অন্যজন মনে করতেন সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও সক্রিয় হতে হবে। আর্জেন্টিনার বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ আসলে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের ইতিহাস।


ওকাম্পো প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য সাময়িকী Sur ছিল আর্জেন্টিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম। পেরোনিস্টদের একটি অংশ এটিকে অভিজাত শ্রেণির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে দেখত। পেরনের রাজনীতি ছিল শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা— আর ওকাম্পোর সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী জগতের সঙ্গে সংযুক্ত।


আর্জেন্টিনার ইতিহাসে এমন একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন— যিনি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি— একটি রাজনৈতিক দর্শনেরও জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর নাম হুয়ান ডোমিঙ্গো পেরন।

পেরন বলেছিলেন— একটি রাষ্ট্র শুধু ধনীদের জন্য নয়— শুধু শ্রমিকদের জন্যও নয়— রাষ্ট্র হবে সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সবার জন্য। তাঁর শাসনামলে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা বিস্তৃত হয়েছে, নারীরা ভোটাধিকার পেয়েছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা বেড়েছে।


তিনি পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের মাঝখানে একটি তৃতীয় পথের কথা বলেছিলেন, যার নাম পেরোনিজম। আজও আর্জেন্টিনার রাজনীতিকে বোঝার জন্য একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ— আপনি কি পেরোনিস্ট, নাকি অ্যান্টি-পেরোনিস্ট?


তবে পেরনের গল্প শুধু প্রশংসার নয়। সমালোচকেরা বলেন, তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করেছিলেন, রাষ্ট্রকে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত করেছিলেন এবং তাঁর রাজনীতিতে ব্যক্তিপূজা ও জনতুষ্টিবাদের প্রবণতা ছিল।


তবুও একটি সত্য অস্বীকার করা কঠিন— একজন নেতা মৃত্যুর বহু দশক পরেও যদি একটি দেশের রাজনৈতিক ভাষা নির্ধারণ করে দেন তাহলে তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন— তিনি ইতিহাসের একটি অধ্যায়।


ঐতিহাসিকভাবে ঠাকুর পরিবার ও নেহেরু পরিবার উভয়ই ব্রিটিশ শাসনামলে উচ্চশিক্ষা, সম্পদ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিল। তবে তাঁদের ভূমিকা ছিল ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে। ঠাকুর পরিবার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক চিন্তায় নেতৃত্ব দিয়েছে; নেহেরু পরিবার আইন, রাজনীতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আধুনিক ভারতের রাষ্ট্রগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।


১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেহত্যাগ করলেন। তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর পরই ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটল ভারতীয় উপমহাদেশে। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে দুটি ঘটনা আলাদা হলেও, প্রতীকী অর্থে মনে হয়— এক মহান প্রতিভার বিদায়ের পরই যেন এক বৃহৎ সাম্রাজ্যেরও বিদায়ের সূচনা হলো।


একটি বিষয় আমাকে প্রায়ই ভাবায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেন গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হলো, তারপরই কেন তিনি নোবেল পুরস্কার পেলেন? আবার সেই নোবেল পুরস্কারই বা কেন শান্তিনিকেতন থেকে চুরি হয়ে গেল?

এই দুটি ঘটনার মধ্যে কি কেবলই কাকতালীয় সম্পর্ক, নাকি ইতিহাসের গভীরে লুকিয়ে আছে আরও কোনো অনুচ্চারিত প্রশ্ন?


আরও একটি প্রশ্ন আমাকে নাড়া দেয়— শান্তিনিকেতন থেকে ২০০৪ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক ও কয়েকটি মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়— যে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক চুরি করেছে, সে কি শুধুই একজন চোর? নাকি রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার সেই বঞ্চিত মানুষের মতো, যে নিজের প্রাপ্য হিস্যা বুঝে নেওয়ার এক প্রতীকী দাবি জানিয়েছে?


এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ইতিহাসের কাছে নেই। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়— যেখানে স্বীকৃতি, সম্পদ, ক্ষমতা ও মালিকানার ইতিহাস জড়িয়ে থাকে, সেখানে একটি চুরি কি শুধু চুরি— নাকি কখনো কখনো তা ইতিহাসের আরেকটি নীরব ভাষ্যও হয়ে ওঠে?

শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

রব রাবে

ভবে কেবল ডুবে থাকো ভাবে 

সঙ্গ পেলে রঙ্গ করো নির্মোহ রব রাবে

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

আদর ছলছলো

বৃষ্টি এলে কেমন করে ঘুমিয়ে থাকি বলো

টিনের চালের শব্দ যেন আদর ছলছলো 

বৃষ্টি হলে কেমন করে তুমি ঘুম হলে 

তোমায় আমি জাগিয়ে তুলি হঠাৎ চুমুর ছলে 

তোমার দেহে যখন আমি বৃষ্টি ঝরঝর 

টিনের চালের মতো তুমি কাঁপো থরথর

ধীরে ধীরে হয়ে ওঠো শ্রাবণ মাসের নদী 

তোমার জলে ভাসে স্বপ্ন ভালোবাসা অধীর

জীবনজল সাগরমুখী চলছে নিরন্তর

প্রকৃতির রঙে রাঙাই আমরা মনের অন্দর

সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

আষাঢ় মাস

আষাঢ় মাস— মেঘ আসি আসি করে 

মেঘলা সময়— বৃষ্টির শরীর হৃদয়ে ধরে

রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬

সুরসঙ্গে

 সন্ধ্যাবেলা হাঁটতে বের হয়েছিলাম। ফেরার পথে হঠাৎ একটি ছোট্ট অগোছালো ঘর থেকে ভেসে এলো মৃদু অথচ অপূর্ব গোছানো সুর। কৌতূহল আমাকে টেনে নিয়ে গেল সেই ঘরের সামনে। তারপর ঘরের ভেতর। 


ভেতরে ঢুকে যেন অন্য এক জগতে পৌঁছে গেলাম। ছোট্ট ঘর, সামান্য আয়োজন— কিন্তু সুরের কোনো অভাব নেই। কয়েকজন মানুষ অন্ধকারে মিটমিট আলোর মতো বসে গান করছে, সুরের সাধনা করছে। সেখানে নেই কোনো জাঁকজমক, নেই কোনো মঞ্চ; আছে শুধু গান, ভালোবাসা আর একাগ্রতা।


এই ছোট্ট ঘরেই এক 'পাগল' মানুষ তাঁর মাকে নিয়ে বসবাস করেন— দিনের পর দিন সুরের সাধনা করে চলেছেন— এবং লিখে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।  তিনি নিজেই গান লেখেন, নিজেই সুর করেন, নিজেই গান গেয়ে শোনান। আশপাশের অনেক আধুনিক, গ্রামীণ শিল্পী ও সুরপাগল মানুষও এখানে আসেন। এই নিভৃত ঘরটি যেন তাদের ছোট্ট একটি সুরের বিদ্যালয়।


আজ যে গানটি সবচেয়ে বেশি হৃদয় ছুঁয়ে গেল, তার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি—


"হৃদয় কেন বুঝে না,


তারে মন দিও না।

যে জন প্রেম বুঝে না,

তারে ভালোবাসো না..."


এই গানটি শুধু প্রেমের গান নয়— মানুষের হৃদয়কে চিনে নেওয়ার একটি গভীর শিক্ষা। ভালোবাসা কখনো একতরফা আবেগের নাম নয়— এটি বোঝাপড়া, সম্মান, দায়িত্ব আর অনুভূতির সমন্বয়। যে মানুষ ভালোবাসার মূল্য বোঝে না, তার কাছে নিজের মন সমর্পণ করা মানে নিজের কষ্টকে নিজের হাতেই ডেকে আনা। লোকজ ভাষার সরল কথাগুলোর ভেতরে তাই জীবনের বড় এক সত্য লুকিয়ে আছে—ভালোবাসা পাওয়ার আগে মানুষটিকে চিনতে শিখতে হয়। কারন সত্যিকারের প্রেম হৃদয়কে ভাঙে না— বরং তাকে আশ্রয় দেয়। লাইলী মজনুর কথা এখানে এসেছে প্রেমে শতভাগ নিমজ্জিত থাকা প্রসঙ্গে।


"আশি তোলায় সের হলে,

চল্লিশ সেরে বুঝায় মণ।

এক রতি কম হইলে,

পাইবে না প্রেমিকের মন।

মন দিয়ে যে পেতে হয় মন,

জানে প্রেমিক কয়জনা।"


লোকজ ভাষার এই কয়েকটি পঙ্‌ক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভালোবাসার গভীর দর্শন। সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো অর্ধেক আন্তরিকতায় পূর্ণতা পায় না। যেমন ওজনে সামান্য ঘাটতি থাকলে পূর্ণ ওজন হয় না, তেমনি ভালোবাসায় সামান্য কৃত্রিমতা, স্বার্থ কিংবা অবহেলাও সম্পর্ককে অসম্পূর্ণ করে দেয়। মানুষের মন জয় করতে হলে আগে নিজের মন খুলে দিতে হয়। কারণ মনের বিনিময় মনেই হয়— অভিনয়ে নয়, আন্তরিকতায়। এই সত্য সবাই বোঝে না; কেবল সত্যিকারের প্রেমিকরাই বোঝে যে ভালোবাসা পাওয়ার একমাত্র পথ হলো নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে শেখা।


বড় বড় স্টুডিও, দামী যন্ত্র কিংবা আলোঝলমলে মঞ্চই যে শিল্পের জন্ম দেয়— তা নয়। কখনো কখনো একটি ছোট্ট অগোছালো ঘরেই জন্ম নেয় সবচেয়ে নির্মল সুর, সবচেয়ে সত্যিকারের শিল্প।


এমন মানুষদের জন্য আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁদের সাধনা একদিন আরও অনেক দূর পৌঁছাক।


৩ জুলাই ২০২৬

শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬

মায়াস্নান

পেতে চায়লে চান্দের দেখা

দলহীন তুমি হও একা

দল তো স্রোতে মায়ার দালাল

মায়া সিনানে হও হালাল


শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

কে বলেছে মিথ্যা বলি না

কে বলেছে আমি মিথ্যা বলি না?

তুমি এসো। এসো একবার। 

এসে আমার চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করো,
"কেমন আছ?"

আমি হাসতে হাসতে বলে দেব,
"ভালো আছি।"

সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

ইসাবেলা প্রেম

হারিয়ে যেও না— আলো থেকে অন্ধকারে 

যেও না পালিয়ে— অন্ধকার থেকে আলোতে 

বসে থাকো— লেবুগাছের ছায়ার মতো 

দাড়িয়ে থাকো শাড়ি আর নদীর ভেতর

তোমার স্পর্শে শাড়ী হয়ে উঠে যুবতী নদী

নদীস্পর্শ মানুষকে করে তুলে ভুজশির রক্তপদী 


কালো চুল অদেখা মুখ তোমার 

নৌকার হালকা আদর 

দৃষ্টিদরে কাছে ডেকে নাও আমায় 

আমার শরীরে এখনো হয়নি রোপণ ইসাবেলা প্রেম

প্রেমের  দৃষ্টিরোপচারা

হয়নি রোপণ দৃষ্টিরোপকামচারা


তাকালে জেগে উঠি যদি আবার 

কখন যেনো জেগে উঠেছিলাম দৃষ্টিতে মনে নেই 

জেগে উঠলে দারুণ কিছু ঘটে যেতে পারে 

জন্ম হতে পারে প্রাকৃতিক আমাজন 

তাকাও মোহিনী শাড়িধারী— আচলে আচলে অতন্দ্রিত প্রহর 

তাকালে খুন হয়ে গেলে আমি 

তোমার হৃদয়ে কবর দিও দেহ মোবারক 

তোমার অধরা শরীরে জন্ম নিবে জিয়ারত মাজার 

আড়াল তুমি

তবু জাগে তোমার নিতম্বভূমি 

রক্তে আমার জেগে উঠে কামনার ভোর 

জোয়ার জাগে মেরুদণ্ডনদী বেয়ে আদিম দেহগোষ্টী 

সাদা শাড়ি সোয়া পাখি মাথার ভেতরে জাগে মিলনষষ্ঠী 

তাকাও তবে একবার 

তাকিয়ে আছি  তোমার দিকে প্রিয়তমা নদীর পাড়

তুমি কেবল ইশারা

তুমি কেনো আসো বারবার— চুল আর চোখ নিয়ে 

তুমি কেনো আসো বারবার— ঠোঁট আর নীরবতা নিয়ে

হয়ে গেলে তোমার 

হয়ে গেলে আমার 

গোপনে গোপনে মনের কারবার

বদলে যাবে নদীপথ 

বদলে যাবে কক্ষপথ তারার 

না বলি তোমাকে 

না বলো তুমি আমায়

তোমার আমার দেখা হবে

বসা হবে মনকথায় 

দেহের সাথে দেহের ওয়াজ হবে

ওয়াজ হবে সারাক্ষণ সো কল্ড সমাজের জানাযায়

শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬

পেশাদার উদাস

পাতার গ্রাম— সবুজ আর সবুজ। ডালপালা রোদের মতো জোছনার মতো নীরব শব্দের মতো মেলে ধরেছে নিজের বাহু— সেখানে আমার বাড়ি— একা একা থাকি। ঐ যে মানুষের গ্রাম সেখানে ভালো লাগে না আমার— ব্রেইনের ভেতর গরম লাগে— মানুষ তারা কারা যারা গরম আনে ঘাম আনে চিন্তায় আচরণে।


বিষাক্ত দৃষ্টি বিষধর কথা বাষ্পের মতো ধুলো হয়ে কিংবা আরও আরও মাইক্রো পার্টিকেল হয়ে মিশে গেছে সমাজের ফুসফুসের ভেতর থেকে ভেতরে। দমবন্ধ লাগে।


মহামানবরোগ মহানরোগ ভালো লাগে না আমার। আমার ভেতর আরও আরও ডুব দিতে চাই— গাছ বৃক্ষ লতা পাতা নদী জল পাহাড় আকাশ মেঘের ভেতর। কালো রঙের পাখনা থেকে খসে পড়া পালকের গল্পে শীতনিদ্রা রাত হয়ে ডাক হয়ে শব্দ হয়ে বাতাসের সাথে পাড়ি দিতে চাই নির্জনতার অরবিট। 


গান হয়ে থাকতে চাই অনেক অনেক দিন— নৃত্য হয়ে ভাসতে চাই অনেক অনেক বছর— প্রেমিকার তীব্র আলিঙ্গন হয়ে বাচতে চাই অনেক অনেক যুগ— প্রিয় শব্দাবলির সাগরে সাতারে সাতারে থাকতে চাই অনেক অনেক শতাব্দী। শতাব্দীর ভেতর ট্যাবলেট হয়ে ঢুকে যেতে চাই মহাকালের মহিমায়— মহান নয়— মহৎ কোনো এক আলোর চোখে স্পেক্ট্রামলিঙ্গন আলিঙ্গনে— পেশাদার উদাস সুরে।

মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

আব্বা

বালুর মধ্যে যতই জল পড়ুক 

কোথায় যেনো যায় তারা 

যেনো শরীর লুকানো শামুক 

শামুক আবার ফিরে আসে চোখে 

এখন যখন তখন 

বালুজল তো আসে না আর ফিরে 

আমার বাবার মতোন

রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

সবাই ভোগী তিনিই কেবল যোগী

 — আম্মু, চলো আমরা বাইরে যাই। 

— না, মা। আমরা বাইরে যাবো না। 

— কেনো আম্মু? 

— বাইরে আমরা নিরাপদ না, মা! 

— আম্মু কেনো নিরাপদ না? 

— বাইরে ভয়ঙ্কর স্বার্থপর লোক বাস করে? 

— আম্মু, কাল দুপুরে আব্বু তোমাকে স্বার্থপর বলেছিল না? 

— অই চুপ কর, তর বাপ একটা বিজলা স্বার্থপর।  

— আম্মু বিজলা কি? 

— বিজলা অইলো তর মাথা— বুঝা লাগবো না, ঘুমা।

শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

একটু পরে ট্রেন

 — সারারাত জার্নি আজ। 

— কই যাবেন?

—ফেনী ফিরবো। একটু পর ট্রেন।


— আজকের চাঁদ সুন্দর। সুন্দর চাঁদ আর ট্রেন— চমৎকার। খুবই ভালো জার্নি হবে।


— চমৎকার হবার কারণ নাই।  শোভন টিকেট তার উপর একা।


— আপনি একা নন। আপনার সাথে আমাদের আশীর্বাদ আছে ত। যার সাথে আশীর্বাদ থাকে মাটিকে সে স্বর্গলোক  করে তুলে।


— বাংলা সাহিত্যে পড়েছেন না?


— হুম। Blessing is a strong ever bullet proof bin.


এসব সাহিত্য টাহিত্য নিয়ে যত কম ঘাটাঘাটি করবেন তত ভাল থাকবেন বিলিভ মি। এই সাহিত্যে পড়ে আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। স্থূল চিন্তার মানুষের ভিড় দমবন্ধ লাগে।


—সত্য বলেছেন। সঠিক বলেছেন। When life is thought, thought is dangerous. We look for before and after and pine for what is not.


— দুনিয়াদারি ভাল লাগে না! অসহ্য! 


— জানেন আমার কাছে পৃথিবীর কোনো মিনিং নেই তারপর মিনিং খুজঁতে থাকি।


— মিনিং খুঁজে লাভ নেই। 


— একটি শিশির কনা হয়তো মিনিং হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে যাবে।

— শুভকামনা।


আরেকটি কথা, সাহিত্যের কারনেই মানুষ কেবল আমার কাছে মানুষ নয় ভিন্ন কিছুর ছায়া, সাহিত্যের কারনেই মানুষকে ভালোবাসতে পারি, শ্রদ্ধা করতে পারি।


— আমিও একসময় তাই ভাবতাম। তবে শিশির কণা না এসে রীতিমতো জলোচ্ছ্বাস এসেছে আর ভেঙেচুড়ে দিয়ে গেছে সব মাঠঘাট প্রান্তর।


— Things fall apart—  অনেক ভাঙনের পর এক সৃষ্টি।


— Yes things fall apart and centre will not hold anymore. 


— Every center hold for certainly center and center is almost margin. আনন্দের সীমান্তে গেলে মানুষের জ্ঞান থাকে না, কষ্টের সীমান্তে গেলে মানুষের জ্ঞান থাকে না, মানুষ মধ্যবর্তী ফলবতী ফলভোগী গাছ।


—কোন সীমান্তই নেই আমার ধারেকাছে। অদ্ভূত আঁধার এক। 


— জানেন অন্ধকারই একমাত্র চরিত্রবান। 

— কি জানি! 


— ফেনী পৌঁছে যাবেন চারটায়?


— ট্রেন তো আসলো না এখনো। লেইট। 


— ট্রেনের নাম কী?

— উদয়ন। 

— কী সুন্দর নাম!

— হু। বাংলাদেশের সব ট্রেনের নামই কম বেশি সুন্দর শুধু কালনী ছাড়া। 

— হা হা হা। 


— 😐। কেমন একটা কালনাগিনী ভাব আছে। 

— কেন মা কালী ভাব নেই?


— ট্রেন আসছে।  ট্রেনে উঠে কথা বলছি। 


— ঠিক আছে। 


— অতঃপর ট্রেন আসিলো।  আর আমি চাপিয়া বসিলাম। 


— সাথের মহিলা কী ফেনীই যাবেন? 


—সাথে মহিলা কি করে নিশ্চিত হলেন?


— যেহেতু চাপিয়া বসিলেন। 

— 😃। 

— অ। 

— তাহলে সাথে কে?


— সাথে  একজন মহিলাই। অপরিচিতা। 


—অপরিচিতা কারো কাছ থেকে কিছু খাবেন না কিন্তু। 

— হু। 

— আপনার বাড়ি কোথায়?

— ব্রাক্ষণবাড়িয়া এবং পৃথিবী, পৃথিবী আমার বাড়ি।

শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

পাবজিখা ভ্যালি

শুনেন একটি কথা বলি। আপনি আমার কথা শুনতে বাধ্য নন। আমি বলে যাবো আমার কথা। পাবজি ভ্যালি কিংবা পাবজিখা ভ্যালি ইজ মোর দ্যান সুইজারল্যান্ড। আপনি বলতেই পারেন কোথায় বান্দরবান আর কোথায় বৃন্দাবন।  আপনার কথা আপনার কাছেই জমা থাকুক। আমি বলে যাবো আমার কথা।  ভুটানের পাবজি ভ্যালিতে যে পরিমাণ সান আছে, যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে, যে পরিমাণ স্বচ্ছ জল আছে, যে পরিমাণ প্রাকৃতিক বৈচিত্র আছে সেই পরিমাণ সামগ্রিক কিছু সুইজারল্যান্ডে নাই মিয়া ভাই। আপনি বিশ্বাস করার দরকার নাই, সুযোগ থাকলে প্রমাণ করে দেখাবেন আশা করি। 


পাবজিখা ভ্যালিতে শীতে অতিথি পাখি আসে। এবং এই অতিথি পাখির জন্যে ভুটান সরকার সারাবছর এই ভ্যালিতে চাষাবাদ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।  রাতে যাতে বন্যপ্রাণী অতিথি পাখির কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করেছে। ব্লাক নেক ক্রেইন নামে দারুণ দুটি পাখি দেখেছি সেখানকার জাদুঘরে। পাখি দুটি অসুস্থ হয়ে যায়। অসুস্থ দুটি পাখিকে সুস্থ করে ভুটান সরকার। এই উপমহাদেশের আথিতেয়তা পেয়ে পাখি দুটি ভুলে যায় নিজ দেশে ফেরত যেতে। একজনের নাম  রেখেছে প্রেমা, আরেকজনের নাম রেখেছে কর্মা। কে রেখেছে নাম?  ভুটান কর্তৃপক্ষ। 


অতিথি পাখি নিয়ে দারুণ একটি জাদুঘর দেখতে পাই পাজজি ভ্যালিতে।  পাখির জন্যে এমন সুন্দর আদর ভুটানের সুন্দর মানসিকতার পরিচয় বহন করে। অবশ্যই বহন করে।


ভুটানে এখন বসন্ত। এবং আজকে মে মাসের এগারো তারিখ। দুই হাজার ছাব্বিশ সাল।  তাপমাত্রা এগারো ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাবজি ভ্যালিতে হাটছি। হাতে ক্যামেরা। দুই পাশে পাহাড়। মাঝখানে তৃনভূমি। ঘাস খাচ্ছে ঘোড়া।  তৃনভূমির মাঝদিয়ে বয়ে গ্যাছে বাঘের চোখের মতো তৎক্ষনাৎ সজাগ সর্পিল রাস্তা।  সেই রাস্তা দিয়ে হাটছি।  রাস্তার দুই পাশে ঘাস খাচ্ছে গরু। এই গরুগুলো বাংলাদেশের গরুর মতো নয়। শরীরের লোম বটগাছের নিচেবসা ধ্যানরত সাধুর চুলের মতো। এই রাস্তাটি যখন পাহাড়ের পাদভূমিতে যায় ঠিক তখনই ঘন জঙ্গলের পাশ দিয়ে যেতে হয় পাবজি ভ্যালির মূল  শহরে।  


ভাবছি মূল শহরে যাবো। একা একা। হেটে হেটে।  হাতে ক্যামেরা। দেখছি দূরের সেই পাহাড়ের পাদদেশের রাস্তা দিয়ে কারা যেনো আসছে।  কাছে আসতেই দেখি বিউটিফুল এক মানবী।  বিউটিফুল মানে বিউটিফুল। রোমানিয়া তার বাড়ি। নারীর হাতে ক্যামেরা। এবং আমার হাতে ক্যামেরা।  বিউটিফুল মানবীর সাথে দুইজন গাইড। 


মানবীকে জিজ্ঞেস করলাম— Is that any tiger through that jungle?  


মানবী সিরিয়াস মোডে উত্তর দিলো— There is no tiger but beautiful deer. You should careful about that beautiful deer. 


আমি সিরিয়াস মোডে ভয় পাওয়ার চেষ্টা করলাম।  আমার অভিনয়কে সে বাস্তব মনে করে আমাকে স্বাভাবিক করার জন্যে সে হেসে হেসে বললো— Just kidding.  


ঠিক তখন আমি তাকে বললাম— I am in proof that you are that beautiful deer and I am always very much careful about you. 


আমার কথা শুনে তারপর সে এমন এক হাসি দিলো যেনো  পাবজি ভ্যালির সৌন্দর্যে অতিথি পাখি এসে নামলো। 

তারপর আর কথা বাড়লো না আমাদের। বাড়লো না ঠিক নয়— কথা বাড়ালাম না। কিছু সৌন্দর্য দূরত্বেই ভালো লাগে।


হাটছি— সেই পাহাড় পাদদেশের রাস্তার দিকে। পাহাড় পাদদেশের রাস্তায় গিয়ে মনে হলো আর নাই যাই।  এই রাস্তায় মায়াময়ী টান আছে। ফিরতে পারবো না শেষে। রাত হয়ে যাবে।  


ভ্যালির তৃনভূমির কাছে ফিরে আসি। ফিরে আসি ঘোড়া আর গরুর কাছে।  একটা গান লেখার চেষ্টা করছি। লিখেও ফেলছি। কাউকে শুনাতে পারলে ভালো লাগতো।


হঠাৎ দেখি এই নীরব রাস্তা দিয়ে এক নারী হেটে আসছে— লেইফ রাইট লেইফ রাইট ভঙ্গিতে।  বললাম— আমি কী তোমার সাথে হাটতে পারি। সে বললো— অবশ্যই।  নারীর সাহস দেখে ভালো লাগলো।  অবশ্যই আমার কাছে যা সাহস মনে হচ্ছে ভুটানের জীবনে তা স্বাভাবিক।


হাটতে হাটতে তার সাথে গল্পে জমে গেলাম। জানলাম তার নাম কর্মা। নাম শুনে অতিথি পাখির কথা মনে পড়লো। তার স্বামী এখানকার নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। সে পরিপূর্ণ হাউজওয়াইফ।  হাটতে হাটতে আমার সদ্য লেখা গানটি শুনালাম। সে গানটির অর্থ জানতে চায়লো। আমি তাকে অর্থ শুনালাম।  সে বললো— খুবই সুন্দর কথা এবং মিষ্টি সুর।  এবং সে জানতে চায়লো— আমি গায়ক কিনা।  গান গাওয়ার চেষ্টা করি— বললাম তাকে।  তারপর আমরা আরও হাটলাম। অন্ধকার নেমে আসবে প্রায়। সে চললো তার বাড়ির দিকে, আমি চল্লাম my home resort এর দিকে।  আমি তাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ এক্সারসাইজ শেখালাম। কর্মা আমাকে শেখালো কেমন করে অতিথিদের দাওয়াত দিতে হয়।  সন্ধ্যা নেমে এলো। আমি নামলাম আমার অভিসুন্দর রুমে যেখান থেকে পাজভি ভ্যালির সেই বিখ্যাত পাহাড়টি দেখা যায় যেখানে মেঘ আর পাইন গাছ একসঙ্গে অভিসারে যায়।

সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

সোনার বাংলা

নৌকা যেমন জলে বাঁচে

ধান বাঁচে শিষে 

নদী বাঁচলে কৃষক বাঁচে

সোনার বাংলাদেশে

রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

নোবডি এন্ড সামবডি

নোবডি হওয়ার চর্চা আসলে হারিয়ে যাওয়া নয়— বরং নিজেকে সীমাবদ্ধ ‘আমি’ থেকে মুক্ত করা। যখন মানুষ নিজের অহংকে ধীরে ধীরে সরিয়ে রাখে তখন সে আর আলাদা কোনো সত্তা হয়ে থাকে না— সে প্রবাহ হয়ে যায়, অনুভব হয়ে যায়, এক ধরনের অদৃশ্য শক্তির মতো কাজ করতে থাকে— যেন উচ্চ কম্পাঙ্কে চলা এক নীরব অস্তিত্ব— যার উপস্থিতি আছে কিন্তু কোনো দাবি নেই।


এই চর্চা গভীরভাবে ব্যক্তিগত। এখানে ভাষা অনেক সময় ব্যর্থ হয়, আর ব্যাখ্যা অনেক সময় বিভ্রান্ত করে। তাই নোবডি হওয়ার পথটা একান্তই নিজের— নিঃশব্দ, সংযত, আর সচেতন।


যোগাযোগের মুহূর্তে তাই প্রয়োজন সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা— কারণ সব অনুভব প্রকাশের জন্য নয়, কিছু অনুভব কেবল উপলব্ধির জন্য।


নোবডি মানে নিজের ইগো বা ‘আমি’ ভেঙে ফেলা। তখন ব্যক্তি নিজেকে আলাদা সত্তা হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর কোনো প্রবাহের অংশ হিসেবে অনুভব করে। 


Somebody হওয়া মানে শুধু কেউ একজন হওয়া নয়— এটা নিজেকে একটি আলাদা সত্তা হিসেবে দেখায়, নিজের অস্তিত্বকে কেন্দ্র করে দাঁড়ানো, নিজের পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা। আর Nobody হওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়— বরং নিজেকে অতিক্রম করা। ‘আমি’র সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে ব্যক্তি আর আলাদা থাকে না— সে হয়ে যায় অনুভব, প্রবাহ, নীরব এক উপস্থিতি।


তাই Somebody আমাদের গড়ে তোলে— আর Nobody আমাদের মুক্ত করে।


সুফিরা একে বলে নফসের তাসাউফ বা নফস ও আমির শুদ্ধিকরণ। অর্থাৎ ভেতরের ‘আমি’কে পরিশুদ্ধ করার নীরব সাধনা। নফসের তাসাউফ মানে নিজের ভেতরের আমিকে চিনে ফেলা— তার লোভ, অহং, কামনা আর অস্থিরতাকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা। Somebody হতে চায় নফস— নিজেকে বড় করতে, আলাদা করে তুলতে। আর Nobody হতে শেখায় তাসাউফ— নিজেকে অতিক্রম করতে, নীরবে পরিশুদ্ধ হতে।


নফস যখন আম্মারা থেকে লাওয়ামা— আর লাওয়ামা থেকে মুতমাইন্না হয়ে ওঠে— তখন মানুষ আর শুধু মানুষ থাকে না— সে হয়ে ওঠে এক প্রশান্ত সত্তা। এই পথ উচ্চারণের নয়— অনুভবের, প্রদর্শনের নয়— নীরব সাধনার। 


এই পথ কোনো থিউরি নয়— এটা সম্পূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল সাধনা। শুধু ধারণা বা আলোচনা দিয়ে এখানে পৌঁছানো যায় না। এটি অভিজ্ঞতার আগুনে তেলে ভেজে নেওয়ার মতো এক রূপান্তর। যে জ্ঞান বাস্তব অনুশীলনে পরিণত হয় না, তা কেবল কথা হয়ে থাকে— পরিবেশনযোগ্য হয় না।


তাই নফসের এই পথকে সত্যিকার অর্থে অর্জনযোগ্য করতে হলে প্রয়োজন একজন যোগ্য পথপ্রদর্শক— একজন গাইড, একজন উস্তাদ। কারণ এই পথচলা মানে শুধু জানা নয়—নিজেকে বদলে ফেলা। আর নিজেকে বদলাতে হলে দরকার এমন একজন, যিনি আগে নিজে পথটা হেঁটে দেখেছেন।


যেটাকে কুরানের ভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম বলা হয়। সিরাতুল মুস্তাকিম শুধু একটি পথের নাম নয়— এটা জীবনের ভারসাম্য, সত্য ও আলোর দিকে চলার নির্দেশনা। এই পথে চলার বাস্তব চিহ্ন হলো— “সিরাতাল্লাজিনা আন‘আমতা আলাইহিম”— যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, যারা সেই পথে হেঁটে সফল হয়েছেন। অর্থাৎ পথ একটাই, কিন্তু সেই পথে সফল মানুষের জীবনই আমাদের জন্য দিকনির্দেশনা।


পথকে বুঝতে হলে পথিকদের চিহ্ন পড়তে হয়। সিরাতুল মুস্তাকিম হলো দিক— আর আন‘আমতা আলাইহিম হলো সেই দিকের জীবন্ত প্রমাণ।

চা গরম

ডাক্তার আইরিনের প্রথম দেখা পাই ট্রেনে। চা গরম সিনেমার ট্রেনে। পুরো সিনেমাতে ট্রেনের ভেতর শট একটিই। এই শটের সাইকোলজি হলো ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে মানসিক দূরত্বের কারন আবিষ্কারের একটি কচ্ছপ চেষ্টা। এই চেষ্টায় সফল হতে গেলে আরও গভীরে যেতে হবে। সেই গভীরতার নাম মানুষের ইকোনমি লাইফ এবং শিক্ষা লাইফ। চা গরম সিনেমাটিতে অবহেলিত চাশ্রমিকশ্রেনির করুনদৃশ্য দেখানো হয়েছে, অবহেলিত হওয়ার কারনদৃশ্য দেখানো হয়নি। 


সিনেমা শুরু হয় ড্রোন শটের মধ্য দিয়ে যেখানে চাবাগান দেখা যায়, তার পরপরই পূজাভোগদৃশ্য যেখানে একধরনের চাবাগানস্থ বিশ্বাস প্রকট হয়ে উঠে। প্রকৃতি এবং লোকজ বিশ্বাস দিয়ে সিনেমা শুরু হয়, নন্দিনির পরিশ্রমের ফলজয় দিয়ে সিনেমা শেষ হয়— যা লোকজ জীবনবোধ থেকে বৈজ্ঞানিক জীবনাচারে পর্দাপন প্রক্রিয়ার সিনেমিক ট্রিটমেন্ট। 


চা গরম— পরিচালনায় শঙ্খ দাশগুপ্ত— শুধু একটি ওয়েবফিল্ম নয় বরং আমাদের সমাজের এক অবহেলিত বাস্তবতার নির্মম অথচ সংবেদনশীল প্রতিচ্ছবি।


চরকি, Oxfam in Bangladesh এবং European Union-এর সহায়তায় নির্মিত এই কাজটি শুরু থেকেই আলাদা মনোযোগ দাবি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে তা হলো— এর গল্প বলার ভঙ্গি এবং চরিত্রগুলোর জীবন্ত উপস্থিতি। 


শুনুন— বাংলায় একটি প্রবাদ আছে— সাগরে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কিসের ভয়। চাশ্রমিক, যাদের সাগরসম কষ্ট বেদনা  যাতনা, তাদেরকে ধারণ করবে এমন নির্মিত গল্প আমরা এখনো পাইনি, আর সেই গল্পে প্রাণ দিবে এমন অভিনয়প্রাণ পাওয়ার কাজটা এতটাও সহজ নয়— তবে চা গরম কঠিন কাজটাকে সহজ করার পথে সহায়তা করেছে— বিভাত আসবেই এমন ডকুফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে, বিভাত আসবেই অভিনয় জগতে এমন ওয়েবফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে।


এমন মানে কেমন?  


তাহলে বলছি। যেখানে  মানবিক মূল্যবোধ থেকে গল্পবোধ জন্মে এবং গল্পবোধ থেকে লাইট ক্যামেরা এ্যাকশন হাটতে চলতে এবং দৌড়াতে শুরু করে। 


সিনেমায় আইরিন চরিত্রে সাফা কবির নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে হাজির করেছেন। তার পারফরম্যান্সে যে পরিমিতিবোধ, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কমেডি, আবেগ, দ্বিধা— সবকিছুতেই সে  অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক পরিমিতিবোধ সমান। আমার কাছে এটি তার এখন পর্যন্ত সেরা কাজ বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। মিঠু চরিত্রে পার্থ শেখ বরাবরের মতোই নির্ভরযোগ্য। তবে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠেছেন রবিন দা চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ। তার অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক যে, চরিত্র আর অভিনেতার সীমারেখা যেন মুছে যায়। কোথাও কোথাও তাকে দেখে রাজেশ শর্মা-র কথা মনে পড়েছে।


কি বলেন তো— চা গরম সিনেমাটিকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করে দেখতে চাই— শহরের চরিত্র, চা-বাগানের শ্রমিক চরিত্র, আর বাবু/ম্যানেজার চরিত্র। শহরের মানুষগুলো স্পষ্টতই প্রিভিলেজড— তাদের ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি সমস্যা দেখার ভঙ্গিও আলাদা। অন্যদিকে, চা-বাগানের শ্রমিকরা চরম আনপ্রিভিলেজড— তাদের জীবন শুধু কষ্টের নয়, একধরনের নীরব বন্দিত্ব। আর মাঝখানে যে বাবু বা ম্যানেজার চরিত্র— সে আপোষকামী। ম্যানেজার বা বাবু চরিত্রটিকে অনেকেই হয়তো “No Man’s Land” ভাবতে পারেন— কিন্তু সে আসলে ঠিক তা নয়। সে কোনো শূন্য ভূখণ্ড না বরং এক জীবন্ত বাফার জোন— উপরের ক্ষমতা আর নিচের বঞ্চনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক আপোষকামী সত্তা। তার সহানুভূতি আছে, কিন্তু তা প্রতিরোধে রূপ নেয় না; তার অবস্থান আছে, কিন্তু তা অবস্থানহীনতার মতোই অনিশ্চিত। সে যেন দুই দিকের টানাপোড়েনে আটকে থাকা এক মানুষ— যে না পুরোপুরি মালিকপক্ষের, না পুরোপুরি শ্রমিকের। এই মাঝামাঝি অবস্থানই তাকে সবচেয়ে বেশি মানবিক এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি অসহায় করে তোলে— আর ঠিক এখানে এ কে আজাদ সেতুর সেতুময় অভিনয় একেবারে চায়ের মধ্যে যেনো চিনি— ভালো কিন্তু সমালোচনা আছে। সমালোচনা কোথায় তাহলে? সমালোচনাটা হলো তিনার গাম্ভীর্য তেমন করে প্রকাশ পায়নি, গাম্ভীর্য অহংকারের রূপ নিয়েছে। 


নন্দিনীর বাবার মদ্যপান কিংবা মৃত্যুঞ্জয়ের বারবার “মরে গিয়েও বেঁচে থাকা”— এসব কেবল প্রতীক নয়, এগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষা। প্রশ্নটা এখানে— চা-বাগানে মদ এত সহজলভ্য কেন? এটা কি নিছক অভ্যাস, নাকি পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণের অংশ? এই জায়গাতেই সিনেমা কিছুটা থেমে যায়। মৃত্যুঞ্জয় আসলে বেঁচে আছে— কিন্তু কীভাবে, কেন— এই অস্তিত্বের প্রশ্নটাকে পরিষ্কার করে না। যেন বাস্তব আর প্রতীকের মাঝখানে ঝুলে থাকে চরিত্রটি।


আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে— ভর্তি কোচিংকে এখানে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। শিক্ষা এখানে মুক্তির পথ নয়  বরং আরেক ধরনের চাপের যন্ত্র। তবে অভিনয়ের জায়গায়—

শহরের চরিত্ররা শহরের মতোই হয়েছে, স্বাভাবিক। কিন্তু চা-শ্রমিক চরিত্রগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এমনকি বলা যায়— ওরাই পুরো সিনেমাটাকে টেনে সামনে নিয়ে গেছে।


নমস্কার দিদি— আমি রবিন চাঁদ মুর্মু— এই কথার মধ্য দিয়ে আমার চোখ অভিনেতা হিসাবে তাকে প্রথম আবিষ্কার করে। সাফা কবিরকে আলো দিয়েছে রবিন চাঁদ মুর্মু। সাফা কবিরের অভিনয় ভালো হয়েছে, তবে তার ভালোকে সামনের দিকে প্রাগ্রসর করেছে রবিন চাঁদ মুর্মু যার ভাষা থ্রোয়িং এবং অভিনয়ের মধ্যে ফারাক খুবই কম যা তাকে অনন্য অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জন্মের পর থেকে চা বাগানের রবিন দা গোফ রেখেছে। আর কাঠালগাছটা সেই উচু টিলায় রয়ে গেছে। তাই গোফে তেল দিয়েও লাভ হচ্ছে না— রবিনদা রবিনদা-ই থেকে গেলো— গরীবের কাছে স্বপ্ন হলো চিড়িয়াখানার বাঘের মতো, যেটা বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর লাগে, কিন্তু ভেতরে যাবার আর সাহস হয় না। 


নন্দিনী চরিত্রে সারাহ জেবীন অদিতি ছিলেন পুরো গল্পের প্রাণ। তার অভিনয়ে এতটা স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল যে মনে হয়েছে সে অভিনয় করছেন না বরং বেঁচে আছে সেই চরিত্রের ভেতর। এর আগে তাকে বোহেমিয়ান ঘোড়া-তে দেখা গেলেও  “চা গরম”-এ সে যেন নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।


গল্প ও চিত্রনাট্যে সাইফুল্লাহ রিয়াদ অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সংলাপগুলো যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি কমিক রিলিফগুলোও এসেছে খুব স্বাভাবিকভাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা— শেষটা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে একটি আলাদা স্বাদ দিয়েছে।


চা বাগানের শ্রমিকদের জীবন যেখানে দিনের পর দিন পরিশ্রমের পরও মজুরি থাকে মাত্র ১৮০-১৮৫ টাকা— এই নির্মম বাস্তবতাকে চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে। আমরা যারা চা বাগানে ঘুরতে যাই, ছবি তুলি, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি— তাদের জীবনের এই দিকটি প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। “চা গরম” সেই অদেখা জীবনকেই সামনে নিয়ে আসে।


লোকেশন, লাইট, ক্যামেরা, কালার গ্রেডিং— সবকিছু মিলিয়ে ভিজ্যুয়াল দিক থেকেও চা গরম সিনেমাটি চোখের জন্য এক ধরনের শান্তি। সিলেটের সবুজকে যেভাবে ফ্রেমবন্দী করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। স্কিনে কালারটোন  কোনো কোনো জায়গায় মার খেয়েছে— তাড়াহুড়ো করার কারনে এমনটা হয়ে থাকে তবে নন্দিনির কালারটোন একেবারে পারফেক্ট— চাকন্যা নন্দিনি। কস্টিউম ঠিক আছে তার। 


আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা বলি— চা-বাগানের শীতের সকাল এক ধরনের জাগরণ। কুয়াশার শাড়ি ধীরে ধীরে খুলে নেয় সূর্য, আর সেই মুহূর্তে চোখে একধরনের ঝাঁকুনি লাগে— যেন হাজার বছরের ঝিমুনি এক নিমিষে কেটে যায়— মন হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে অদ্ভুত চাঙা, ফুরফুরে। কিন্তু চা গরম-এ সেই স্পর্শটা পাইনি। চা-বাগানের বৃষ্টিও আলাদা এক ভাষা— সে বৃষ্টি থামতে চায় না, মনে হয় যেন চা-শ্রমিকের কান্না, ঘাম আর রক্তেরই আরেক নাম অথবা এক অনিবার্য সর্বনাশের প্রতিধ্বনি। এই বৃষ্টির সৌন্দর্য, এই বেদনার গভীরতা— সিনেমার প্রবাহে সেভাবে উঠে আসেনি।


পঞ্চগড়ে গিয়ে কোনো এক শীতে দেখেছিলাম একটি চাগাছ— চাগাছটি আম গাছের মতো বড়। চা গরম সিনেমা দেখে জানতে পারি, চাগাছ বটগাছের মতো বড় হতে পারে কিন্তু তাকে বড় হতে দেয়া হয় না। চাগাছকে খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার স্বপ্ন। চাগাছের মতোই চাবাগানের শ্রমিক— তাদের শ্রম খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার পেট। শ্রমিকদের ঘাম আর রক্তে টিকে থাকে, বেচে থাকে সভ্যতা অথচ তারা থাকে অন্ধকারের ভেতর আরও এক অন্ধকারে। রবিনদা শ্রমিকদের লিডার টাইপের তবে লিডার নয় ঠিক। চা গরমে তার হাটার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত। দুর্দান্ত অভিনয়। তার কথা বলার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত।  দুর্দান্ত অভিনয়।  নন্দিনি একেবারে মাটির মানুষ এবং পুরো স্কিনে তাকে মাটিঘেষা স্বপ্নপুরির মতো লাগছে। নন্দিনীর বাড়িটিও কিন্তু মাটির। দুদিন পরে মেয়েটার বিয়ে। তারপরও তার মন যেনো স্বপ্নবাড়ি। তার স্বপ্নবাড়ি যখন বাস্তবতার মুখ দেখে ঠিক তখনই সিনেমায় ড্রামাটিক প্রবাহ আসে যা দর্শকের মনে করুন রসের প্রবাহ আনে যা বীররসের আরেক নাম। 


অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও চা গরম কেবল একটি গল্প নয়— এটি একটি জীবন ধারার গল্প। এখানে নায়ক-নায়িকা নয় বরং মানুষের বেঁচে থাকা, স্বপ্ন দেখা আর সংগ্রামমুখর ইমেজই চরিত্র হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

কালের শাম

মেঘ আমি আশা ছিলো পাখি হয়ে উড়বো 

রঙিন আকাশ সবুজ পাহাড় স্বপ্নমতো ধরবো

গরম বাতাস হঠাৎ করে লাগলো আমার ডালে 

বৃষ্টি হলাম জন্ম আমার পানসে নদীর খালে 

খাল থেকে নদীতে যাবো যাবো সাগর বাড়ি 

নদী থেকে গরম বাতাস নিলো আমায় ধরি 

বাষ্প হয়ে আকাশ মাঠে মেঘ হলো আমার নাম 

মৃত্যুঘরে জন্ম হবো গল্প হবো হবো কালের শাম

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

আশরাফুল মাখলুকাত

 — আসুন আমরা ধর্ম নিয়ে কথা বলি।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে টেবিল গরম থাকবে। টেবিলে খাবার সার্ভ না করলেও চলবে।


— আসুন অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র এই বিষয়ে কথা বলি।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে মানুষ ভাইরে নিয়া পইরা থাকবো— বাইরে কি দরকার, কি দরকার না— তা নিয়ে কোনো কথা হবে না।


— বাহ! আপনার মাথায় তো ব্যাপক বুদ্ধি!


— এইভাবে প্রসংশা করবেন। তাহলে প্রসংশা নির্ভর সোসাইটি নির্মাণ হবে এবং সোসাইটি একসময় নিন্দা বা সমালোচনা সহ্য করতে পারবে না।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে সমালোচনা করলেই গুম হবে, এ্যারেস্ট হবে, মারামারি হবে, রাষ্ট্র অস্থির হবে, জল ঘোলা হবে, ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করবে কতিপয় সুবিধারা।


— সুবিধারা ঘোলা জলে মাছ শিকার করলে কি হবে?


তাহলে যারা সুবিধা দেন তারা দিনে দিনে সুবিধাদের হাতে মারা পরবেন এবং একসময় সুবিধা প্রদানকারী যখন থাকবে না তখন সুবিধা গ্রহণকারী এবং গ্রহণকারী মারামারি করে শেষ হয়ে যাবে!


— তারপর? 

— তারপর মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত!?

১৪৩৩ বাংলা

মুন্নী আপার সঙ্গে আমার প্রথম আড্ডা— মাটি ক্যাফেতে। আজ। আজ শুক্রবার ১৪৩৩। আপা অসাধারণ লেখেন। অনেকের কাছে তিনি একজন প্রখর সাংবাদিক, কিন্তু আমার কাছে তিনি মূলত একজন লেখক। গল্প লিখেন, কবিতা লিখেন— আর তাঁর লেখায় ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ তেমন গুরুত্ব পায় না; বরং জীবন আর ভাষার যাপনই সেখানে প্রধান হয়ে ওঠে।


শাহনাজ মুন্নী আপার কবিতায় আছে দৃশ্যায়নের ঝলক, সম্পর্কের এক সহজ, স্বচ্ছ প্রবাহ।


আমিন ভাইও আলাদা করে বলার মতো মানুষ— তিনি সুন্দরভাবে জীবনকে চর্চা করেন। তাঁর ভ্রমণসঙ্গ আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমিন ভাই আর মুন্নী আপা ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছেন— এই যাত্রার সঙ্গেও যেন এক ধরনের গল্প জড়িয়ে আছে।

একবার এক দূতাবাসে মুন্নী আপা কবিতা পড়ছিলেন। আমি আর আমিন ভাই গিয়েছিলাম শ্রোতা হয়ে। কবিতা পাঠ বা আবৃত্তি  শেষ হওয়ার পর এক বিদেশি কবি বললেন, “একটা প্রেমের কবিতা পড়বেন?” মুন্নী আপা হেসে বললেন, “এতক্ষণ তো প্রেমের কবিতাই পড়লাম!”


তখন বুঝলাম— তাদের কাছে প্রেমের কবিতা মানে আরও খোলামেলা, আরও প্রকাশ্য কিছু। আমরা মজা পেয়েছিলাম— সেই মুহূর্তটা এখনো মনে আছে।


মেঘনা নদীর পাড়ে ছোট্ট একটা কফির দোকান—‘মাটি ক্যাফে’। উজ্জ্বল ভাই লন্ডন থেকে ফিরে এসে এটি গড়ে তুলেছেন। নরসিংদীতে যাত্রাবিরতির দিনে সেখানে জড়ো হলাম আমরা— মুন্নী আপা, সরকার আমিন ভাই, প্রথম আলোর নরসিংদী প্রতিনিধি প্রণব দা, আর আমি।


নীরব, নির্মল বাতাস আমাদের চুপ করে থাকতে দেয়নি— আমরা কথা বলেছি। সব আড্ডা মুখর হয় না— কিন্তু আজকের আড্ডাটা হয়েছিল।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

ফুলবাহার

ফুল যখন ফুটতে চায়

ফুটতে দিও তাকে

রঙের ভেতর স্বপ্ন থাকে

গন্ধ লুকিয়ে ডাকে

কাঁটা হয়ে থেকো না আর মৃত্যুধরা হাতে

প্রতি শ্বাসে বেচে থাকো ঘাত-প্রতিঘাতে

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

জীবনের খালবিল

এক বছর আগের কথা। আমার চুল তখন বড়— ঝুটি বেঁধে রাখি। ভ্রমণে বের হয়েছি। কোনো এক গ্রাম এলাকায় ভ্রমণ করছি। রিকসাওয়ালা মামা খুবই মজার মানুষ। মামার সব কথা বেশ মজা লাগছিলো। রিকসা থেকে নেমে যাবো এমন সময় হঠাৎ করে তিনি মাটিতে শুয়ে গেলেন এবং আমার পায়ে চুম্বন করতে লাগলেন। আমি না সড়াতে পারছি পা, না সড়াতে পারছি রিকসাওয়ালা মামাকে। মানুষ জমে গ্যাছে। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন! সে কি কান্না!  


অবশেষে উনাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যাই। খাবার খেতে খেতে কাহিনি কী জানতে চাই।


— যখন আপনার কাছ থেকে ভাড়া নিতে যামু তখন আমার পীরের চেহারা ভাইসসা উঠছে আপনার মধ্যে। তারপর আমি কি করছি কিচ্ছু কইবাম পারুম না। 


মামা কইবাম না পারলেও, আমি ঠিকই কইবাম পারছি। পরের দিন সেলুনে গিয়ে সব চুলকে আল্লার রহমতে ইন্নালিল্লাহি করে দিছি।


আজকের ঘটনা। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকের ঘটনা। বাজারে যাচ্ছি। খাসির মাংস খেতে ইচ্ছে করছে— ঝালঝাল করে।  মাথায় টুপি।  হঠাৎ এক লোক— চিনি না জানি না— আমাকে দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয়। ওরে দয়াল— একি অবস্থা। যাক, যেকোনো উপায়ে উনাকে নিয়ে চায়ের দোকানে যাই। চা খেতে খেতে কাহিনি কী জানতে চাই। 


— ভাই, গতকাল রাতে এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখি। গভীর এক গর্ত। গর্তে আগুন আর আগুন। আগুনে পড়ে যাচ্ছি। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করছি। কিন্তু কোনোক্রমেই রক্ষা পাচ্ছি না— আগুনের দিকে যাচ্ছি তো যাচ্ছি। হঠাৎ একটি হাত আসে। এবং সেই হাত আমাকে রক্ষা করে। যে লোকটা আমাকে রক্ষা করে চেহারাটা হুবহু আপনার মতো। তাই আফনাকে দেখে আমার মাথা ঠিক রাখতে পারি নাই। আফনে মনে কিছু নিয়েন না ভাই। 


বাসায় আসি। বহুদিন নিজেরে আয়নায় দেখি নাই। আজকে দেখলাম। দেখি, চুল আবার বড় হয়ে গ্যাছে। টুপির নিচে বড় চুলে বেশ ভালো মানুষ  ভালো মানুষ একটা লুক আসছে।


গ্রাম এলাকায় একটা প্রবাদ আছে— আগে দর্শনধারী, পরে গুনবিচারী। আজকে থেকে প্রবাদ ঘুরে গেলো— আগে গুনবিচারী, পরে দর্শনধারী।

সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

আরবি থেকে বাংলা— ভাব থেকে ভাষা

আরবিতে একটি শব্দ আছে  غريب (উচ্চারণ: ঘোরীব)। এই ঘোরীব থেকে বাংলা গরীব শব্দের আমদানি। আরবিতে غريب (উচ্চারণ: ঘোরীব) শব্দের বাংলা হলো অদ্ভুত, অস্বাভাবিক, অচেনা যার ইংরেজি হলো “Weird”।  কিন্তু বাংলা ভাষায় গরীব শব্দটা অর্থহীন, সহায়সম্পত্তির কমতি বা ঘাটতিকে ইঙ্গিত করে। পুরো বাংলাদেশে একটি কথা প্রায় প্রবাদবাক্যের মতো হয়ে গ্যাছে— "গরীব গজবের সৃষ্টি"— এখন অবশ্যই এই কথার শক্তিগত জায়গা পরিবর্তন হয়েছে। তবে একটি প্রশ্ন কিন্তু থেকে যায়— অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়, নাকি নষ্ট স্বভাবে অভাব আসে? 


বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল বা ঈসা খাঁর অঞ্চলের মানুষ গরীব শব্দের উচ্চারণ করে গুরিব— হে একটা গুরিব মানু, হের লগে বারাবারি করিছ না। 


ঈসা খাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ ইছাহা বলে— এই অঞ্চলের প্রচুর মানুষের নাম আছে ইছা মিয়া। রাজা না হতে পারলেও রাজার নাম রেখে রাজা রাজা একটা ফিল নেয়ার চেষ্টা আর কি। ঈসা খাঁর শাসনামল বাংলার অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী প্রবাহচিহ্নের নাম— ঈসা খাঁ ছিলেন বাংলার ইতিহাসের এক অসাধারণ নেতা, যিনি বারো ভুঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছিলেন। তাঁর শাসনকেন্দ্র ছিল ভাটি বাংলা—এক বিস্তৃত জলাভূমি, খাল-বিল ও নদীবেষ্টিত অঞ্চল। এই ভাটিতে মেঘনা, তিতাস ও বাঁশাই নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ছিল, যা তাঁর সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে আরও মজবুত করত।


ঈসা খাঁর প্রভাব বর্তমান ঢাকার আশপাশের এলাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নরসিংদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাঁর প্রধান দুর্গ ও রাজধানী ছিল জঙ্গলবাড়ি, যা কিশোরগঞ্জে অবস্থিত— সোনারগাঁও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক ঘাঁটি হিসেবে সমাদৃত—

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুরো অঞ্চল তাঁর অধীনে ছিল না, তবে নদীভিত্তিক দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশ অবশ্যই তাঁর প্রভাবাধীন ছিল। নদীভিত্তিক যুদ্ধকৌশল এবং নৌবাহিনী ব্যবহার করে তিনি মোঘল শক্তির বিস্তারকে বারবার প্রতিহত করেন।


ঈসা খাঁ কেবল ভূখণ্ডের শাসক ছিলেন না, তিনি ভাটি বাংলার সাহস, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের এক প্রতীক— তাঁর শাসনাধীন অঞ্চল আজও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে বিবেচিত।


বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে অন্যতম কেদার রায়। কেদার রায়ের বিধবা কন্যা স্বর্ণময়ীকে অপহরণ করে ঈসা খান— তাতে রেগে গিয়ে কেদার রায় ঈসা খানের রাজধানী আক্রমণ করেন । কেদার রায়ের আক্রমণে ঈসা খান প্রাণভয়ে মেদিনীপুর পালিয়ে যায়। কেদার রায় ঈসা খানের প্রায় সম্পূর্ণ জমিদারির দখল নিয়ে নেন। ঈসা খান অজ্ঞাত রোগে তার স্ত্রী ফাতেমা খানের বাড়ি ফুলহরি (ফুলদি) জমিদার বাড়িতে ১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মারা যায়।


বারো ভূঁইয়াদের আলোচনা করতে করতে একটি শব্দ মাথায় চলে আসছে। আর শব্দটা হলো 'হিরিক'। বারো ভূঁইয়াদের অঞ্চলের মানুষ হিরিক শব্দটা ব্যবহার করে ঘন জমায়েত বুঝাতে— আম অহনে হস্তা, আম কিনার হিরিক লাগঝে চহে। হিরিক শব্দটা মূলত ইংরেজি শব্দ Hayrick (হেরিক) থেকে আগদ। মূলত খোলা মাঠে খড় বা শস্য শুকিয়ে রাখার জন্য যে বড় স্তূপ তৈরি করা হতো, তাকেই 'Rick' বলা হতো। পরবর্তীতে এর সাথে 'Hay' যুক্ত হয়ে 'Hayrick' শব্দটি সুনির্দিষ্টভাবে খড়ের গাদাকে বোঝাতে শুরু করে। ব্রিটিশ ইংরেজিতে শরীরের কোনো অংশ (বিশেষ করে ঘাড় বা পিঠ) হঠাৎ মোচড় লেগে ব্যথা পাওয়া বা মচকানোকে 'rick' বলা হয়। বাংলা বা সংস্কৃত শব্দ 'ঋক' (Ṛc) এর অর্থ হলো প্রশংসা, স্তোত্র বা পবিত্র মন্ত্র, যা হিন্দুধর্মের প্রাচীন গ্রন্থ 'ঋগ্বেদ'-এর মূল ভিত্তি।


তাহলে হিরিক লাগছে মানে খেড় যেমন গোল করে এক জায়গায় একত্রিত করা হয় তেমনি বিভিন্ন জায়গার মানুষ যখন এক জায়গায় একত্রিত হয় কোনো উদ্দেশ্যে তখন তাকে হিরিক বলে। খেড় এক জায়গায় একত্রিত করে গোল করে রাখার পর কম্বোজের মতো যে অবস্থা দৃশ্যমান হয় তাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ বনগোলা বলে। খেড়কে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ 'বন' বলে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে রোদে শুকানো ধান গাছকে 'বন' বলে। বনগোলা/বনগুলা মানে রোদে শুকানো ধান গাছের সজ্জিত স্তুপ।


মচকানোকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলের মানুষ 'মছকা', 'মইচকা' বলে। আর শরীরের কোনো অংশ মচকানোর ফলে যে ব্যথা হয় তাকে মইচকাবেতা বলে। এই ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে গ্রামীণ যে চিকিৎসা পদ্ধতি চালু আছে তাকে মইচকাজারা বলে। মইচকাজারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে যেমন বিখ্যাত তেমনি নরসিংদীর চরাঞ্চলেও তার দারুণ সুখ্যাতি রয়েছে। তেল আর লবন দিয়ে ব্যথার স্থানে আস্তে আস্তে মালিশ করে এবং মালিশকারী ব্যক্তি মনে মনে এক মন্ত্র পরে— এই প্রক্রিয়াই মূলত মইচকাজারা। আমি অনেক কষ্টে আমার এলাকাতো দাদির কাছ থেকে এই মন্ত্র শিখে নিয়েছিলাম। তিনি আমাকে মন্ত্রটা কাউকে জানাতে নিষেধ করেছেন। তাই জানালাম না।


হিরিকের মতো আরেকটি শব্দ আছে। শব্দটা হলো নিরিখ। বৈষ্ণব পদাবলি বা লোকজ গানে 'নিরিখ' বলতে অনেক সময় একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকা বা লক্ষ্য করাকেও বোঝানো হয় (সংস্কৃত 'নিরীক্ষণ' থেকে প্রভাবিত)। কোনো জিনিসের বর্তমান দাম বা নির্ধারিত হারকে নিরিখ বলা হয় (যেমন: "বাজারের নিরিখ বুঝে সওদা করো)। কালু শাহ ফকিরের লেখা একটি গানে নিরিখ শব্দের উচ্চারণ দেখা যায়— 


নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে, ভুইলনা মন তাহারে....

ঐ নাম ভুল করিলে, যাবিরে মারা 

পরবিরে বিষম ফেরে

ভুইলনা মন তাহারে....।।


কালু শাহ ফকির রচিত ‘নিরিখ বান্ধরে দুই নয়নে’ একটি গভীর আধ্যাত্মিক বাউল গান। এ গানের দৃশ্যমান অর্থ হলো—মনের চঞ্চলতা দূর করতে গুরুর ধ্যানে থাকা বা স্মরণে থাকা— আপন মুর্শিদের ধ্যানে চোখ ও মন নিবদ্ধ রাখা। গুরুর দিক থেকে দৃষ্টি ফেরালে বা নাম ভুলে গেলে আধ্যাত্মিক মৃত্যু ঘটে এবং বিষম ফেরে (সংসার ফাদে) পড়তে হয়। এখানে নিরিখ মানে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা অথবা মানসিক সম্পর্ক স্থাপন করা— সুফিভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলে ফানা ফি শায়েখ (فناء في الشيخ)— নিজের অহং, ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত মতকে আধ্যাত্মিক গুরুর নির্দেশনার কাছে বিলীন করে দেওয়া।


“ফানা” মানে বিলীন হয়ে যাওয়া, “ফি” মানে মধ্যে, আর “শায়েখ” মানে আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। অর্থাৎ মুরিদ (শিষ্য) যখন তার শায়েখের নির্দেশনা ও আদর্শকে সম্পূর্ণভাবে অনুসরণ করতে শুরু করে, তখন ধীরে ধীরে তার নিজের অহং ভেঙে যায়— এটাকেই বলা হয় ফানা ফি শায়েখ। অবশ্যই আরও টেকনিক্যাল বিষয় আছে যা কহতব্য নয়, চর্চার বিষয়। সুফিসাধনার পথে এটিকে অনেক সময় একটি ধাপ হিসেবে ধরা হয়। সাধারণত বলা হয়—

প্রথমে ফানা ফি শায়েখ,

তারপর ফানা ফি রাসূল,

আর শেষ পর্যন্ত ফানা ফিল্লাহ— অর্থাৎ আল্লাহর প্রেম ও ইচ্ছার মধ্যে নিজের সত্তাকে সমর্পণ করা।


বাউল এবং সুফিপথের ডেসটিনি প্রায় এক হলেও পথপ্রক্রিয়া আলাদা। আলাদাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নরসিংদী কিশোরগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের মানুষ উচ্চারণ করে "আলগা"— বর্ষাকালে আলগা বাইত যাইতাম নাও দিয়া।


ইদানিং বাউলকে মহাজনি গান বলেন অনেকে। তারা বলে, বাংলা লোকসংগীতে বাউল গানের আরেকটি পরিচিত নাম হলো মহাজনি গান। এখানে “মহাজন” বলতে সাধারণ অর্থে ধনী ব্যবসায়ী বোঝানো হয় না; বরং বোঝানো হয় মহান আধ্যাত্মিক সাধক বা গুরুদের— যারা জীবন, প্রেম, আত্মা ও মানবতার গভীর সত্য নিয়ে গান ও বাণী রেখে গেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চলে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে—


বাওলা গান হাওলায় চলে না। 


আসলেই বাউলা গান হাওলায় চলে না। হাওলা শব্দটি এসেছে আরবি “হাওয়ালা (Hawala)” থেকে। মূল অর্থ ছিল দায়িত্ব বা অর্থ অন্যের কাছে স্থানান্তর করা। দক্ষিণ এশিয়ায় এটি পরে ধার দেওয়া/নেওয়া অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাওয়ালা (Hawala) শব্দটা উচ্চারিত হয় "হাওলাত" হয়ে— টেহা হাওলাত নিলে ঠিক সময়ে ফেরত দিতে অই।

শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

রেজা এমরানুর

 — রেজা, তোমার জন্ম কোথায়?

— আমার জন্ম তো সেখানে, যেখানে আমার মৃত্যু নেই! 

মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

জ্ঞান ও প্রজ্ঞার কথোপকথন

 — সবচেয়ে গরিব মানুষ কে, বলতে পারো?


— সবচেয়ে গরিব তো সে, যার সঙ্গে মানুষ সম্পর্ক করে কোনো এক প্রয়োজনের আশায়।


— না, সবচেয়ে গরিব তো সেই মানুষ, যে নিজেই প্রয়োজনকে সামনে রেখে সম্পর্ক নির্মাণ করে।


— তাহলে কি কোনো সম্পর্ক আছে, যা প্রয়োজন ছাড়া?


— আছে। তবে আগে একটি দৃশ্য কল্পনা করো। ধরো, নদীর ওপারে তোমার মা দাঁড়িয়ে আছেন, আর এপারে তুমি— তোমার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তোমাকে নদী পার হতে হবে। এখন তোমার একটি নৌকা লাগতে পারে, অথবা একটি সেতু। এই যে নৌকা বা সেতু— এগুলো কিন্তু তোমার প্রয়োজন নয়, এগুলো তোমার আয়োজন। তোমার প্রকৃত প্রয়োজন হলো—মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ। যারা আয়োজনকে প্রয়োজন বানায়— যারা অভিনয় করে, মিথ্যা কথা বলে আয়োজনকে প্রয়োজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তারাই ব্যক্তিগত জীবনবোধে সবচেয়ে গরিব


— আর কোনো গরীব আছে আপনার দৃষ্টিতে?


— আছে।


— সে কে?


— সে হলো সেই মানুষ, যে কারো উপকার করে, তারপর তার আশেপাশে ঘুরতে থাকে, বারবার মনে করিয়ে দেয়— “আমি তোমার উপকার করেছি।”


— তাহলে তার কী করা উচিত?


— যদি ক্ষমতা থাকে, তবে কারো উপকার করো তাকে না জানিয়ে। যদি ক্ষমতা থাকে, তবে উপকার করে তার কাছ থেকে অনেক দূরে চলে যাও। উপকার করে কাউকে কৃতজ্ঞতার দাস বানিয়ে ফেলো না।


— বুঝলাম।


অর্থাৎ, যে উপকার করে বিনিময় চায়, আর যে নারী বা পুরুষ সান্নিধ্যের বিনিময়ে অর্থমূল্য দাবি করে— তারা একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে— দুজনেই বিনিময় চায়; দুজনেই সম্পর্ককে রূপান্তর করেছে লেনদেনে।


— তাহলে প্রকৃত ধনী কে?


যে ভালোবাসে বিনিময়হীনভাবে। যে দেয়, কিন্তু মনে রাখে না। যে পাশে থাকে, কিন্তু মালিকানা দাবি করে না। সেই মানুষই প্রকৃত অর্থে ধনী।

শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

শ্রীলঙ্কার সিনেমা হলে


PVR Cinemas— One Galle Face Mall–এর ষষ্ঠ তলায় অবস্থিত বিশাল এক মাল্টিপ্লেক্স। সাগরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মলের ভেতরে ঢুকলেই আলোর ভিন্ন এক জগৎ।

আমি যেখানে যাই, চেষ্টা করি সেখানকার অন্তত একটি  সিনেমা হলেও দেখতে। ভাষা না বুঝলেও সমস্যা নেই— সেই দেশের ভাষায় অন্তত একটি চলচ্চিত্র দেখি। আমার কাছে এটা ভ্রমণেরই অংশ, সংস্কৃতির ভেতরে ঢুকে পড়ার এক নীরব উপায়।


সেদিনও আগেভাগেই অন্য একটি ছবির টিকিট কেটে রেখেছিলাম। হলে গিয়ে দেখি ভিন্ন এক আবহ— নায়ক-নায়িকার উপস্থিতিতে যেন ছোট্ট এক উৎসব বসেছে। নতুন সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, তাই চারদিকে উচ্ছ্বাস—আলোকচ্ছটা, ক্যামেরা, শুভেচ্ছা আর কৌতূহলী দর্শকের ভিড়।


নায়ক-নায়িকার সঙ্গে দু-একটি কথা হলো। আন্তরিক আমন্ত্রণও পেলাম— তাঁদের সঙ্গে বসে সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবিটি দেখার জন্য। ইচ্ছে ছিল, কিন্তু হাতে সময় ছিল না। আগের টিকিট, আগের পরিকল্পনা— আমাকে অন্য হলে টেনে নিল।


তবু মন ভরে গেল তাদের সিনেমা মুক্তির সংস্কৃতি দেখে। রীতিমতো পূজা দিয়ে তারা ছবির সূচনা করে— শিল্পকে শুধু বিনোদন নয়, একধরনের পবিত্র আয়োজনে পরিণত করে। সেই দৃশ্য মনে রয়ে গেছে।

রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বোম্বাই এয়ারপোর্ট

সাদা গোলাপের ওপর বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা পড়লে মনে হয় পৃথিবী আজ খুব আস্তে কথা বলছে 🌧️🤍— নিষ্পাপ পাপড়ির গায়ে জল জমে থাকে, মুক্তোর মতো নয়— যেন নীরব প্রার্থনার অশ্রু। সে বৃষ্টি শুধু ফুলকে ভেজায় না, ভিজিয়ে দেয় তাকিয়ে থাকা মনটাকেও— কিছু না–বলা স্মৃতি, কিছু অদৃশ্য ভালোবাসা। কিছু সৌন্দর্য ব্যাখ্যা চায় না, শুধু নীরবে ছুঁয়ে যায়। 🌹


বাচ্চাটির বয়স ছয় কি সাত হবে। বই পড়ছে। বইটিকে মনে হচ্ছে সাদা গোলাপ এবং বাচ্চাটিকে মনে হচ্ছে সেই সাদা গোলাপের উপর অর্পিত প্রথম বৃষ্টির জল। বোম্বাই এয়ারপোর্টে এমন সুন্দর মনমাতানো দৃশ্য দেখে জার্নির ক্লান্তি যেনো বাগানবাড়িতে বিশ্রাম নিতে গ্যাছে। এয়ারপোর্ট দেখছি আর শক্তিশালী হচ্ছি। সে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। এখনকার সময়ের বাচ্চাদের এতো মনোযোগ দিয়ে বই পড়তে দেখা যায় না— দেখা যায় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত সারাক্ষণ।


বোম্বাই এয়ারপোর্ট খুবই সুন্দর গোছানো। এই পর্যন্ত যত এয়ারপোর্ট আমি দেখেছি কোনো এয়ারপোর্টে এমন উন্মুক্ত বইবিক্রি সেন্টার দেখিনি। সেই বইবিক্রির সেন্টার থেকে ডলার দিয়ে দুটি বই কিনেছি।


একটি বইয়ের নাম Butter, জাপানি লেখক Asako Yuzuki-র একটি বিখ্যাত উপন্যাস, যা ২০১৭ সালে জাপানে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল এবং ২০২৪ সালে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। ইংরেজি অনুবাদটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং Waterstones Book of the Year 2024 নির্বাচিত হয়েছে একটি উল্লেখযোগ্য পুরস্কার হিসেবে।


“Butter” বইটি বাস্তব জীবনের “কনকাতসু কিলার” মামলার দ্বারা অনুপ্রাণিত, যিনি তার তিনজন প্রেমিককে বিষাক্ত খাবারের মাধ্যমে হত্যা করেছিলেন। গল্পে দেখা যায়, এক সাংবাদিক ক্রমে এই দোষী সাব্যস্ত হত্যাকাণ্ডকারীর প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠে, যিনি তার ঘরে বানানো খাবারের মাধ্যমে ভিকটিমদের আকর্ষণ করতেন। Laura Wilson (দ্য গার্ডিয়ান) লিখেছেন—

“এটি বন্ধুত্ব, সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ আনন্দ এবং সমাজের নারীদের প্রতি অতি দ্বন্দ্বপূর্ণ প্রত্যাশা নিয়ে ভাবান্বিত এবং আশ্চর্যজনকভাবে মনোমুগ্ধকর এক দৃষ্টিভঙ্গি।”


বই দুটি রেস্ট হাউজে রেখে আবার এয়ারপোর্টে হাটতে থাকি। মোবারক ভাই নিজের মতো হেটে হেটে দেখছে এয়ারপোর্ট— তিনি ডলার খরচ করতে নারাজ— তাই তিনি কোনো রেস্টহাউজ ভাড়া নেননি— আমি নিয়েছি— তাতে আমার ত্রিশ ডলার খরচ করতে হয়েছে— তারপরও শান্তি। কারণ হেটে হেটে ক্লান্ত হলে সেখানে গিয়ে চা খাই কফি খাই বিছানায় একটু গতর লাগাই, আবার হাটি আর দেখি— চোখ যেনো সরতে চায় না। 


বোম্বাই এয়ারপোর্টে প্রতিদিন প্রায় একহাজার ফ্লাইট উঠানামা করে, প্রায় দেড় লাখ যাত্রী আসা যাওয়া করে।  ভোরে আমাদের ফ্লাইট— এয়ার ইন্ডিয়া। বাংলাদেশ যাবো। বোম্বাই ট্রানজিট। শ্রীলঙ্কা যাওয়ার সময় ট্রানজিট পড়ে দিল্লিতে। সারারাত দিল্লিতে বসা ছিলাম— আমি আর হাবিব।  আমরা বসে বসে মানুষের আসাযাওয়া দেখি— কত রকমের মানুষ অথচ প্রায় একই রকমের পোশাক। পুজিবাজার মানুষকে এক সংস্কৃতিতে নিয়ে আসার চেষ্টায় ব্যস্ত— তাতে ব্যবসা করতে সুবিধা। বোম্বাই এয়ারপোর্টে কিন্তু মানুষের দিকে আমার দৃষ্টিযোগ কম— অধিক দৃষ্টিযোগ বোম্বাই এয়ারপোর্টের সাজসজ্জার দিকে— এখানে বহুমাত্রিক খাবার দোকানের সক্রিয় অবস্থান। কোনো খাবারের দিকে আমার ক্ষুধাদৃষ্টি যাচ্ছে না কিন্তু চোখের দৃষ্টি তো আরোপিত থাকছেই।  ত্রিশ ডলারের ভেতরে পর্যাপ্ত খাবার সেবা দিয়েছে আমাকে রেস্টহাউজ। রেস্টহাউজ বলতে তাবুর ⛺ মতো ছোটো ছোটো ঘর— একজন থাকতে পারে একটি তাবুতে।  আমার তাবুর পাশেই জঙ্গল— তাবুর জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যায় সেই জঙ্গল— মানুষের বানানো জঙ্গল— ইট সিমেন্টের পেটের ভেতর এক প্রাকৃতিক জঙ্গল— তালা হিসাব করলে আমার তাবুটি তিন তালায় হবে— তালারে আধুনিক সময়ের মানুষ  আবার ফ্লোর বলে। 


ফোর্থ ফ্লোরে গিয়েছিলাম স্পা নিতে। কিন্তু স্পা সেন্টার বন্ধ। কারন কয়েকদিন আগে স্পা সেন্টারে একজন মানুষের মৃত শরীর পড়ে থাকে। সেই থেকে স্পা সেন্টারটি বন্ধ ❎! বোম্বাই এয়ারপোর্টে সারারাত সব দোকান ওপেন থাকে— থাকার হোটেলে রাত বারোটার পর সাধারণত কোনো সিট কিংবা রুম পাওয়া যায় না— হোটেলে প্রতি রুমের জন্য গুনতে হয় একশো থেকে একশো ত্রিশ ডলার— তবে তাবুতে ⛺ সারারাত সারাদিন সিট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।


আজকে তাবুর দায়িত্বে যে ছেলেটা রয়েছে সে খুবই ভালো মানুষ। অল্প সময়ের মধ্যে সে আমার ঘরের মানুষ হয়ে যায়। কারন সে একজন কবি। তার অনেকগুলো কবিতা শুনি— উর্দুতে হিন্দিতে। মির্জা গালিবের প্রভাব তার কবিতায় স্পষ্ট। এতো ব্যস্ততার মাঝেও যে কবিমন আছে তার সেইজন্য তাকে সাধুবাদ জানাই এবং আফালের মাছ বইটি উপহার হিসাবে দেই তাকে। সে আমাকে তার পুরো ঠিকানা লিখে দেয় এবং বোম্বাই আসলে তার বাড়িতে থাকার অনুরোধ জানায়।  আমি আপ্লুত হই তার নেমন্তন্ন পেয়ে। আমিও তাকে বাংলাদেশে এসে আমাকে ধন্যযোগ করার প্রস্তাব পেশ করি। আশা করি সে বাংলাদেশে আসবে একদিন।


ছেলেটার নাম রোহিত এবং বোম্বাই এয়ারপোর্টের কাগজি নাম ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং আমার রেস্ট নেয়ার  সুন্দর ব্যবস্থার আয়োজনকারী ম্যানেজমেন্টের নাম  AVserve Circle। এটি crossword বুকস্টলের সাথে। AVserve Circle এ থাকার জন্যে যেটিকে আমি তাবু বলছি তারা সেটিকে বলে স্লিপিং পট।


রোহিত আমার সাথে খুবই সুন্দর একটি আচরণ করেছে। স্লিপিং পটে আমার থাকার সময় চারঘন্টা। অথচ সে আমাকে বলেছে— স্যার, আপনার ফ্লাইটের আগ পর্যন্ত আপনি রেস্ট নেন এখানে, আমি ম্যানেজ করে নিচ্ছি, আপনার ফ্লাইটের সময় আমি আপনাকে ডেকে দিবো।  আমার ফ্লাইট ছয়টায়।  ঠিকই সে পাচটা ত্রিশ মিনিটে আমাকে ডেকে দেয়। কর্পোরেট জগৎ এমন সুন্দর আচরণ করে না— করে অর্থের বিনিময়ে কিন্তু রোহিত অর্থের বাইরে এসে আমার সাথে মানবিক আচরণ করে যেটা তার মর্যাদা আমার কাছে অনেকগুন বৃদ্ধি করে যা অর্থের মাধ্যমে অর্জন করা যায় না।  


✈️ বন্দরনায়েকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর—Bandaranaike International Airport (BIA)— যার অবস্থান 📍কাটুনায়েকে, কলম্বোর কাছে— সেখান থেকে আমাদের উড়োজাহাজ ফ্লাই করে চারটার সময়। আমরা বোম্বাই এয়ারপোর্টে পৌছি ছয়টা কুড়ি মিনিটে। বোর্ডিং  পাসে অনেক সময় লাগে।  আমাদের সাথে বোর্ডিং পাস করে ইন্দোনেশিয়ার বিরাট এক কাফেলা।  তারা মক্কায় যাবে— মানে তারা হাজী হওয়ার নিয়তে বাড়ি থেকে বের হয়েছে।


ইনশাআল্লাহ হাজী  হালিমা নামে একজন ইন্দোনেশিয়ান মেয়ে আমার দেশ জানতে চায়— আমার দেশ বাংলাদেশ শুনে জানতে চায় আমি মুসলমান কিনা— আমি তাকে বলি— I  grew up in a Muslim family; still, I am learning what it means to be a Muslim. হালিমা আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি বিনিয়োগ করে। আমি হালিমার মুগ্ধ দৃষ্টির মাঝে হজ্জের আনন্দ দেখতে পাই এবং দৃষ্টিবৃষ্টি চলাকালীন সময়ে তাকে বলি— Convey my heartfelt, soul-deep salam to the Compassionate One of Madinah. হালিমা মাথা নাড়ে— ঠিক তখনই ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাকে নড়তে বলে। আমিও নড়েচড়ে আমার ব্যাগপত্র মেশিনে রাখি। মেশিন চেকিং কমপ্লিট হওয়ার পর প্রায় দুইঘন্টার অপেক্ষাক্লান্তি যেনো নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো বোম্বাই এয়ারপোর্টের অবয়ব দেখে— এককথায় দারুণ এবং অসাধারণ। দিল্লি এয়ারপোর্টের মতো এই এয়ারপোর্টটি এতো ব্যস্ত না— টিপটপ গোছানো— জায়গায় জায়গায় গার্ডেন— প্রকৃতির ছোয়া। দোকান আছে। তবে দোকানের কারনে বস্তিময় হয়ে যায়নি— পর্যাপ্ত ফাকা জায়গা— ফ্লোরে আলো পড়ে চিকচিক করছে— মাথার উপরে যে রোফ তাতে ফুলময় ❀ কারুকাজ। হঠাৎ চোখে আসে একটি নান্দনিক স্টল— সদ গুরুর গুরুত্বপূর্ণ কথামালা নিয়ে ব্যানারকর্ম— ছবিকর্ম বলা যায় অর্থাৎ তিনার বিভিন্ন মোশনের ছবি— ছবির নিচে তিনার দার্শনিক কথাবার্তা।  দাড়িয়ে দাড়িয়ে সবগুলো কথা পড়ি— ভালো লাগলো বেশ—

Diversity is a strength.

It has arisen in this culture out of richness, not out of divide.


Grace is subtle.

Unless you are alert you will miss it.


বেশভূষার বাহাদুরি নাই ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কিন্তু বেশভূষার অলঙ্কার আছে— সেই অলঙ্কারের আবার শিল্পমান আছে বোল্ড করে বলার মতো। বলার মতো একটি রাত যাপিত হলো ছত্রপতি শিবাজি মহারাজা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু কেমনে বলমু যা লেগে আছে চোখের মন্দিরে মনের অন্দরে— তাকে তো প্রার্থনায় কেবল পাওয়া যায়— পাওয়া যায় না তারে নির্মিত ভাষায়।

জলজয়



ফুলের সাথে আছি প্রিয়

ভুলের সাথে নয়

যতই করো জল ঘোলা 

জলের হবে জয় ✌

মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

সখীচার


হলে তুমি সখীচার

লালা আমার মরবেই

থাকে না তার

থাকে না তার উপায় তবে একমুঠোও বাচার

নীলাপ্রিয় নীল শাড়ি চোখে উঠে রোদ

মনজলে কেপে কেপে উঠে বোদ বোদ

আলাবোলা কামবনে ঝড় আসে ঝড় আসে

আসে আসে তুফান

বড় হওয়া সোনা ফসল— পাকা ধানে মই

স্বপ্ন তো ছিলোই

স্বপ্ন তো থাকেই মজা করে খাওয়ার কাঁঠালি ধানের খই 

  কামজোয়ার পথ চিনে না— কানার কানা 

    জোয়ারে জোয়ারে ডুবায় ফসল শুনে না মানা 

      কামজ্বর কামজ্বর অতুল সাগর 

        চাবুক মেরে বলি তারে থামো থামো 

         কামডর কামডর কামড় মারে 

          থামানো যায় না— যায় না তারে 

            শুনো ওরে মন আমার ওহে মন মিয়া 

              ধরো তারে আদরে ধরো মায়া দিয়া

                বান্দো দেহ সোহাগে সোহাগ নিয়া 

                  সন্ধি করে সময়ে বসাও সময়বিয়া 

                    লাগাও হিয়া তবে হিয়ার সাথে হিয়া

সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২৬

বিপদফুলের কলি



লালের সাথে তুমি আছো

আছো নীলের সাথে 

সাদার সাথেও সুড়সুড়িটা চলে মাঝরাতে 

কালোর সাথে দেখা হলে মুচকি মুচকি হাসো

বলো দেখি আসলে তুমি কারে ভালোবাসো

বলবে তুমি 'বিপদে আছি'— ম্যানেজ করে চলি 

তুমি আসলে 'বিপদে রাখো' বিপদফুলের কলি

শনিবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৬

সন্ধ্যাচোখ



এইমাত্র দেখা গেলো দূরে 

আবার চলে গেলো আরও আরও দূরে 

চোখ থেকে চোখে 

চোখের সীমানা পেরিয়ে 

অপেক্ষায় বসে আছি আমি বেকুয়ার বিলে

হে অতিথি— ওহে অতিথি পাখি 

এখানে আছেনি—আছে নাকি কোনো 

তোমার শামুকমদে পরিযায়ী সাকি? 

তোমার পাখা মানে না কোনো পাসপোর্ট ভিসা

তোমার মন জানে পৃথিবীর পরতে পরতে তুমি 

পৃথিবীর পরতে পরতে আছে তোমার অধিকার হিস্যা

দেশ শব্দটি— এক বাকুয়াস কথা 

সংবিধান অভিধান— বানোয়াট সুবিধা 

তোমার কাছে পৃথিবী মানে মুসাফিরঘর 

সফরে সফরে আওয়াজ করো

বর্ডারভাঙার গান করো বর্ডারবাজ মগজের ভেতর 

হে অতিথি— ওহে অতিথি পাখি 

আমার সাথে দেখা দিবে নাকি

আমিও তোমার মতো মুসাফির

উড়ে উড়ে নড়ে চড়ে ভ্রমণ আকি

এই পৃথিবী আমার 

আমি এই পৃথিবীর 

বর্ডার টডার মিথ্যা ফেলাসি ফেইক শিয়াল ফাকি

তোমার পা সত্য গতি চন মন 

তোমার ঠোঁট জানে প্রয়োজন 

তোমার ঠোঁটের কথা অনিবার্য হবে 

এবং অনিবার্য হলো 

কুয়াশার টেবিলে রোদের আদরে বসি চলো 

বসি চলো পৃথিবীর বুকে 

ধান গাছের ফাকে শামুকের সাথে 

জলের গতরে ভেসে থাকা শ্যাওলা মাছের হাতে

চলো বসি— হে অতিথি পাখি 

চোখের ভেতর একটা লাল নীল হলুদ সন্ধ্যাচোখ রাখি

রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

আ ফা লে র মা ছ

 ০১

ধর্মের মর্মকথা যার মনে ধর্মের তর্ককথা তার মুখে আসে না।


০২

যাকে নিয়ে উপহাস করবেন আজ— কাল তার সামনে এমন নতজানু হয়ে দাড়াতে হবে আপনি হাসতে পারবেন না— আপনাকে তখন মনে হবে ডাঙায় ভাসা পাতিহাঁস।


০৩

Mutual respect যেখানে থাকে না সেখানে self respect থাকাটা অনিবার্য— আগুন জ্বালাতে গেলে প্রথমে একটি দিয়াশলাই কাঠিকে জ্বলতে হয়— self respect যখন তার মাত্রা অতিক্রম করে তখন mutual respect আগুন হয়ে জ্বলতে থাকে।


০৪

বিপদের সময় যে আশ্রয় খুজে তার মানসিকতা আশ্রয় নির্ভর হয়ে যায়— বিপদ ফেইস করতে হয় যেমন করে ফেইস করতে হয় আনন্দ— যিনি ফেইস করতে শিখেন তিনিই হয়ে উঠেন আশ্রয়দাতা। 


০৫

সুবিধার হাতে অসুবিধা থাপ্পড় খেলে বুঝতে হবে প্রতিশোধ প্রতিহিংসার বাজার গরম।


০৬

ঢেউ আসলে নদী ভাঙে কিন্তু জল পালায় না। 


০৭

যতবার আপনি নিজের সুবিধার কথা চিন্তা করে রাজনীতি করবেন ততবারই আপনি রাজনৈতিকভাবে অসুবিধায় পড়বেন— রাজনীতিকে যারা খেলা মনে করে তারাই জনগনকে নিয়ে জুয়াখেলা শুরু করে— রাজনীতি খেলা নয়— সাধনা— জনগণ কেবল ভোটের একটি সংখ্যা নয়— উপাসনা!


০৮

ইদুর দৌড়াচ্ছে— বিড়াল দৌড়াচ্ছে তার পিছুপিছু— খেলা জমেছে বেশ— ইদুর দৌড়াচ্ছে তার প্রান বাচানোর জন্যে— বলেন তো কার জয় ✌ হবে!?  জ্বি — আপনি ঠিক ধরেছেন— জয় হবে আপনার— আপনি মানে জনগণ।


০৯

একই কোরান পরে কেউ হয় পথপ্রাপ্ত আবার কেউ হয় পথচ্যুত— আপনি নিশ্চয়ই এমন সংবিধান বানাতে যাচ্ছেন না যা সবাইকে পথে নিয়ে আসবে— আগে তোরা মানুষ হ! আলোতে বালু পড়লে আলো বালু হয়ে যায় না— আলো ইজ আলো, বালু ইজ বালু।


১০

আপনি সত্যকে খুজছেন? দুনিয়ার সমগ্র বইপত্র তন্নতন্ন করে খুজছেন সত্যকে? পাচ্ছেন না? একজন মজলুমের পক্ষে কথা বলেন— দেখবেন সত্য আপনাকে খুজছে। 


সত্যের দেখা পেয়ে গেলে পাচতলা লাগবে না— গাছতলা হবে আপনার জন্যে অনিবার্য শান্তির আস্তানা।


১১

অনেক সরকারি কর্মচারী আজকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোকে মুহ্যমান হয়ে ফেইসবুকে কোনো পোস্ট দিবে না— পাছে তাদের চাকরিটা চলে যায়! হয়তো চাকরি বাচানোর জন্যে প্রতি বছর পনেরো আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিজের পিতা মনে করে ফেইসবুকে শোকময়ী পোস্ট দিতেন— আসলে তাদের পিতার নাম চাকরি অর্ফে পার্সোনাল সুবিধা। যারা নিজের চাকরি বাচানোর জন্যে মিথ্যার সাথে আপোষ করতে পারে, তারা অধিক সুবিধা পেলে নিজের পতাকা বিক্রি করতে এক সেকেন্ডও ভাববে না। 


ভয় পাচ্ছেন!  মনে রাখবেন, আপনার ভয়ও ব্যক্তিগত— আপনার টেবিল, আপনার চেয়ার, আপনার চুলের মতোই ব্যক্তিগত।


১২

আমরা আসলে নেতার রাজনীতি করি— জনগণের রাজনীতি নেতা করেন না!!


১৩

মোটা বুদ্ধির দল কেবল একতার বলে ক্ষমতা হাতে পেলেও মোটাদাগে ক্ষমতা তাদেরকে নিয়ে বান্দরবাদাম খেলা খেলে।


১৪

আপনি টাকা জমাচ্ছেন? এই দিক দিয়ে আপনার জমানো সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে! আপনার জন্যে টাকা— টাকার জন্যে আপনি না— এবার সিদ্ধান্ত নেন, ইন্দুর রাখবেন, না মারবেন।


১৫

টিভিতে আপনারা যাদেরকে দেখেন বড় বড় ভালো ভালো কথা বলে তারা কিন্তু বড় মাপের না— তারা একেবারেই টিভি মাপের ☺। 


১৬

এখন মানুষ মিশে থাকে— মিলে থাকে না— এখনকার মানুষের পক্ষে মিলেমিশে থাকা তো আরও সম্ভব না— কারন মানুষ শুভাকাঙ্ক্ষী আর সহ্য করছে না— মানুষ এখন সমর্থনকাঙ্ক্ষী— ফলে অন্ধকার ভেদ করে আলোর নামে অন্ধকার বিক্রি করছে সো কল্ড আলোর সন্তানেরা। 


১৭

ভালোবাসা একটি ক্ষমতার নাম— এই সহজ কথাটি যাদের মগজে ঢুকে না— তাদের মগজ পড়ে আছে অন্য কোথাও অন্য কোনো জালে ☁। 


১৮

Begad, truth always shines in the end. Hello, my dear, please keep in mind that a blunt truth is better than a polished lie. So I let you know: do not befoul your character with dishonesty—keep it pure. And do not belaud people blindly; appreciate with reason. Why do you bewitch others with lies? please try to  inspire them with truth— the bit may control a horse, but self-control guides a man. 


১৯

লবনের সাগরে ভেসে থাকলেও বেচে থাকতে হবে মিষ্টি পানি পান করেই। 


২০

তিনি এমন কিছু কাউকে দেন না যার ভার সে বহন করতে পারে না। তিনি এমন কষ্ট কাউকে দেন না যা সে সহ্য করতে পারে না। খেলোয়াড় আর দর্শক হওয়া ব্যতীত আমরা কেবল আবশ্যিক ছায়া!


২১

সামষ্টিক প্রশ্নে সৎ লোক নেই— আছে কেবল ভীরু আর ব্যক্তিগত লোক। যারা সততার ভান ধরে আছে তারা বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকথা কথায় কথায় বলে নিজেদের সুবিধামতো— তারা হযরত মোহাম্মদ ﷺ মহানুভবতার কথা বলে খন্ডিত আকারে অথচ তাদের জীবন তাদেরই ঘরকে কেন্দ্র করে নির্মিত বাহির— আর সেই সব নুরময় আত্মাদের জীবন ছিলো বাহিরকে কেন্দ্র করে নির্মিত মহাকাব্য মহাকাল। তারা চেগুয়েভারার কথা বলে— আসলে তারা গুয়েভারার জনপ্রিয়তা ধরে টানে— গুয়েভারার সংগ্রামকে নয়। 


গাছকে কেন্দ্র করে যেমন পরগাছা বাচে— তেমনি সংগ্রামী মহান আত্মাদের উপর ভর করে বেচে আছে অসম্ভব অযথা পরগাছা মানুষ— আর গাছেরা পরগাছার ডামাডোলে ঢেকে আছে সময়ের আশ্রয়ে।


২২

জনগণকে যারাই বোকা ভেবেছে তারাই ভোগে চলে গ্যাছে! 


২৩

তারা কেবল মরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখায় অথচ মরেই আছি! 


২৪

শকুন সারা জীবন গরুর মৃত্যু কামনা করেছে— গরুর বিনাশ হয়নি কিন্তু শকুনের বিনাশ হয়ে গ্যাছে— আর গরু পেয়েছে আগের চেয়েও উন্নত জীবন। 


২৫

এখানে শ্রদ্ধা মানে দাসত্ব— আর স্নেহ মানে ভবিষ্যতের আলাতুল প্রয়োজন। এখানে প্রেম মানে বিরহ। এখানে বিপ্লব মানে ব্যক্তিগত বিরোধ— ধর্ম মানে সুবিধা পাওয়ার ন্যাক্কারজনক সুযোগ। আর মানুষ? মানুষ এখানে পন্যের মতো উঠানামা করা দরদাম। এই গ্রহে রাজনীতি পার্লারের ভেতরঘরে সাজানো সাজনীতি। এখানে কালচারাল রেভুলোশনের সম্ভাবনাকে পাশ কাটিয়ে আলসারাল রেভুলোশন ঘটে গ্যাছে।


চলো প্রিয় এক কাপ পরচর্চা খাই— আর নিজেদের দশ কাপ আবর্জনা ঢেকে রাখি ঠান্ডা হওয়ার আশায়।


২৬

একমাত্র সরল পথে আছে মুক্তি— কায়দায় আছে যুক্তি— যুক্তিতে মুক্তি নাই জনাব। 


২৭

ব্যথা থাকলে মাথা তো লাগবেই। 


২৮

তিনি যে গোপনে গোপনে আমার ফেইসবুকে আইসা আমার কর্মকাণ্ড দেইখা চলে যেতেন তা আমি টের পাই— ইদানিং ইনি আর আসছেন না। কারণ তিনি জেনে গ্যাছেন ফেইসবুক আমারে ডলার দেয়— ইনি একবার আমার ফেইসবুকে আসলে এক সেন্ট হলেও আমার একাউন্টে জমা হয়ে যাবে— তা তিনার সহ্য হচ্ছে না। 


হে আমার প্রিয় গোপন পরশ্রীকাতর বন্ধু— পাখি আকাশে উড়ে  নিজের ডানায়— আপনিও ডানা লাগান, আপনিও আকাশে উড়তে পারবেন। পরশ্রীকাতরতা কিংবা হিংসা উড়ার ডানাকে দুর্বল করে দেয়।


২৯

গৃধ্রকূট পর্বতে বুদ্ধের ওপর দেবদত্ত পাথর গড়িয়ে দেন। পাথর সরাসরি আঘাত না করলেও তার ভাঙা টুকরো বুদ্ধের পায়ে আঘাত করে,  রক্ত বের হয়।


দেবদত্তের কারনে বুদ্ধের শান্ত অবিচল চিত্ত অস্থির হয়নি— বরং তিনি শান্ত অবিচল চিত্তময় থাকার নতুন এক উপায় আবিষ্কার করেন নিশ্চয়ই। 


পথের কাটা পথিকের হাটা থামাতে পারে না— পথিককে জুতা আবিষ্কারে উৎসাহিত করে মাত্র।


৩০

এমন কী কখনো হয়েছে যে ফ্যান ঘুরছে কিন্তু শরীর ঠান্ডা হচ্ছে না? অবশ্যই হয়েছে। কারন প্রকৃতিতে এতো গরম যে ফ্যান সেই গরম ভেদ করে শীতল বাতাস আনতে পারছে না। দুনিয়া নামক ঘরে রহমত ঘুরবে কিন্তু কর্মে রহমত না আনতে পারলে হৃদয়ে শান্তি পাবেন না— দুনিয়া নামক ঘরে বিপদ ঘুরবে কিন্তু কর্মে রহমত প্রতিষ্ঠা করতে পারলে মনে অশান্তি আসতে পারবে না।


রহমত কী?


নিজের জন্যে যা ভালো মনে করেন অপরের জন্যে তা নিশ্চিত করতে সংগ্রাম করার সক্রিয় মানসিকতা।


৩১

আমি তাকে শিশুর মতো ভালোবাসি। আর সে আমাকে জ্ঞানীর মতো বিবেচনা করে। ভালো বাসতে বাসতে আমি আরো শিশু হয়ে যাই। আর সে হয়ে যায় কিতাবুল মুফতি। হযরত মুফতি আমাকে ফতুয়া দেয় আমি নাকি কাফের। 

কসম খোদার এই কাফেরের হৃদয়ে প্রেমের যে খুশবু তা বালাকাত-মান্দে তন্নতন্ন করেও খুঁজে পাাওয়া যাবে না। 


সেও জয় হল, আমিও জয়ী


সে জেনেছে সূর্য একটি আলোকপিণ্ড, আর আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি সূর্য এক ছায়ার অপভ্রংশ।


৩২

নেতার চরন ধরে বসে থাকলে হবে না— নেতার আচরণ থেকে শিক্ষা নিতে হবে রেজা ভাই— নেতার মৌখিক ভক্তের অভাব না হবে জানি— নেতার আদর্শের কর্মী দরকার।


আমার পাশে বসে তিনজন ইয়াং ওল্ডম্যান "মুজিব: একটি জাতির রূপকার" সিনেমাটা দেখেন। তিনারা প্রায় ত্রিশ বছর পর সিনেমা হলে সিনেমা দেখতে আসেন। মাহাবুব ভাই সর্বশেষ 'পদ্মানদীর মাঝি' সিনেমার হলে দেখেছিলেন। 'ভাই' বললাম কারন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ছাত্র।


মাহাবুব ভাই মুজিব বাহিনির সদস্য ছিলেন। সিনেমার একপর্যায়ে অঝোরে কেদেছেন— যে কান্নার সামনে কোনো ক্যামেরা বা ম্যাকাপ নাই। তিনারা দেশের জন্যে রক্ত দিলেন! আর এখন দিচ্ছেন চোখের জল!!

আর কী চাও প্রিয় দেশ আমার!?


৩৩


দৃষ্টি বলের দিকেই রাখতে চাই, গ্যালারির দিকে নয়। কেউ কালে থাকতে পারে না যদি না কাল ব্যক্তিকে গ্রহন করে। আমার কাছে আমি একটি গুরুত্বপূর্ন শব্দ। এই আমির ভেতর আমরা শব্দটি নিহিত। তাই আমি যত বেশি আমি হয়ে ওঠবো ততই আমরার দেখা পাবো। 


আমার সমাজ, আমার খাবার এক আমি'র জন্ম দিয়েছে, সেই আমি'র মধ্যে কল্যানকর কিছু নেই। নির্মিত আমি'র গুরুত্ব পৃথিবীর জন্য জরুরী। বনজ পাতা থেকে যেমনভাবে প্রক্রিয়াকরন  করে ঔষধ আবিষ্কার  করতে হয় তেমনি আমিকে ফিল্টারিং করে নিজের খোঁজ পেতে হয়। নিজস্বতা আবিষ্কার ব্যক্তির অহংকার, পৃথিবীর সোনার ফসল। 


যে খেলোয়াড় বলের চেয়ে দর্শকদের প্রতি অধিক মনোযোগী তার আউট হবার সম্ভাবনা অধিক হবে তাই স্বাভাবিক। কাল এক গভীর ব্যাপার। গভীর হলেই কালের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন সম্ভব। কালের বন্ধু হলেই রথ দেখা সম্ভব আর সাথে কলা বিক্রির বিষয়টি তো আছেই।


৩৪

অন্ধকার রাতের জননী 

Dark is the mother only for the night 


৩৫


স্টার সিনেপ্লেক্সে ওয়ান ব্যাটল আফটার অ্যানাদার" (One Battle After Another) সিনেমাটি দেখছি। সিনেমা শুরু হওয়ার আগে পর্দায় বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উড়তে দেখে পতাকার সম্মানে আমরা উঠে দাড়ালাম। পতাকার সাথে বাজছে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত— আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালোবাসি।


পতাকা পর্দা থেকে চলে যাওয়া মাত্র একজন দর্শক বলে উঠে— জয় বাংলা ✌!


আরেকজন দর্শক বলে উঠে— কে রে?


দর্শক সারি থেকে আরেকজন বলে উঠে— জিয়ার সৈনিক!


তারপর আর কোনো শব্দ নাই— তারপর সুন্দর গোছানো হলরুমে সুন্দর গোছানো নীরবতা নেমে আসে। 


সিনেমা শেষ হলে আমি ভাবতে থাকি পল টমাস অ্যান্ডারসনের পরিচালনায় এবং লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, টেয়ানা টেলর, রেজিনা হল, শেন পেন ও বেনিও ডেল টোরোর মতো তারকাদের অভিনীত এই  সিনেমায় বিপ্লব কত মিহি আলোর মতো হিহিহি করে হাসতে থাকে সময়ের আয়নায়— আর আমাদের সময় কার ঘরে যেনো গভীর রাতে ঘুমাতে যাই শরীর বেচার ধান্দায়!!


৩৬


নদীতে পানি শুকাতে আরম্ভ করলে সব মাছ পালাতে আরম্ভ করে কিন্তু মাছ জানে না তখন তাদের পালানোর আর সুযোগ নাই। 


৩৭


মানুষ সুন্দর করে বাচার জন্যে অসুন্দর আচরণ করে— অসুন্দর আচরণের জন্যে মানুষ সুন্দর করে বাচতে পারে না!


৩৮


আপনি কর্নেল তাহেরের পথে হাটলেন না, ভালো কথা— যে কর্নেল তাহের আপনার বন্দীদশা দূর করে হাটতে সহযোগিতা করলেন তাকে কেনো হত্যা করলেন!? 


বিপ্লব মানে কৃতজ্ঞতা— মাটির প্রতি: বাতাসের প্রতি: প্রকৃতির প্রতি: আপনাকে যে সহযোগিতা করবে তার প্রতি।


সংহতি মানে একতার শক্তি

সংহতি মানে মিত্রের সংহার নয়— কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতি।


৩৯


সম্পর্কে মিথ্যাকথা বিষের মতো কাজ করে— ধীরে ধীরে না— একেবারে সম্পর্কের মৃত্যু রচনা করে!


৪০


সোজা আঙুল 

ঘিআঙুল 

পাছায় আঙুল 

অথচ আমরা শুনেছি ইসলামের দ্যা প্রোফেট সোজা আঙুল দিয়ে চাদকে দিখন্ডিত করেছেন এবং কোরানের আল্লা বলেছেন সোজা পথে চলার কথা— ঘি তুলতে যারা আঙুল বাকা করতে চান তারা ঘিকে অনেক মূল্যবান মনে করেন—মনে করতে পারেন না তিনার আঙুল কত শক্তিশালী।


৪১


তিনি যাকে ডেকে নেন— তিনি তাকে ঢেকেও রাখেন— ঢেকে রাখেন কথার রোদ থেকে: ঢেকে রাখেন প্রশংসার তুফান থেকে: ঢেকে রাখেন ছায়ার মায়া থেকে।


তিনি তাকে প্রকাশ করেন কাশমুক্ত সময়ে— সময়ের মুকুট দিয়ে!


৪২

জ্ঞান যেখানে জীবিত, মারফত (معرفَة) সেখানে মৃত— মারফত যেখানে জীবিত, জ্ঞান সেখানে মৃত— জ্ঞানের চোখে সৃষ্টি দেখা যায় আর মারফতের চোখে দেখা যায় স্রষ্টা!


৪৩


শীতের রোদে একটি নরম আলো আছে— যেনো প্রিয়তমার আণুবীক্ষণিক আঙুল— হালকা ছোয়ায় হৃদয়ে নিয়ে আসে বিটার কোল্ড— কাপতে কাপতে জড়িয়ে ধরার উষ্ণ আনন্দ।


৪৪


তোমার সাথে কথা হয় না প্রিয়— কিন্তু তোমার জন্যে দোয়া থাকে অনিবার্য। তোমাকে দেখা হয়না বহুদিন— কিন্তু তোমার দেখার দৃষ্টি যেনো প্রসারিত হয় এই প্রার্থনা মনে আমার। দেখা হলে কথা হলে গলাতে গলা মিশিয়ে আড্ডা হলেই যত্ন নেয়া বলে না— যত্ম একটি গোপন বাতাস যা দেহত্যাগ করা প্রিয় আত্মার মতো চারপাশে ঘুরঘুর করে অবিরাম অবিরত। 


৪৫


আগাছার সংখ্যা বেড়ে গেলে পশু মোটাতাজা হতে থাকে— মানুষের বাড়ে উপবাস!


৪৬


যা দিয়ে দেখছেন 'জগৎ মানুষ পৃথিবী' তাই মনে হবে— যা দেখছেন— তা, তা না!


৪৭


একটা সাপ জালে আটকে আছে— সেই সাপের আপনি উপকার করবেন। সেই সাপকে বাচাতে হবে। কারণ সেই সাপের অবদানও আপনার জীবনে আছে আপনার প্রকৃতিতে আছে। সাপকে বাচাতে গেলে সে আপনাকে ছোবল দিতে পারে। কারন আপনাকে অনুধাবন করার ক্ষমতা তার নেই। অথবা আপনার মতো মানুষ সাপের উপর এতো আক্রমণ করেছে যে সাপের কাছে মানুষের আরেক নাম আক্রমণ। 


কোনো প্রাণী আক্রমণ করে না নিজের প্রয়োজন ছাড়া— কোনো প্রাণী উপকার করে না নিজের প্রয়োজন ছাড়া! এই সমাজ এই সভ্যতা এই প্রকৃতি প্রয়োজনের সুতোয় বাঁধা এক ধারাবাহিক ধারা।


৪৮


নমরুদ অর্থ খোদাদ্রোহী— আর একটি অর্থ হলো বাঘিনী। আরব কিংবদন্তি অনুযায়ী নমরুদকে ছোটবেলায় এক বাঘিনী স্তন্যপান করায়— কথিত আছে ইডিপাসের মতো নমরুদ তার পিতাকে হত্যা করে নিজের মাকে বিয়ে করে।


নমরুদ যখন ইব্রাহিম নবীকে ধ্বংস করার জন্যে নিজের সমস্ত পরিকল্পনা নির্মাণ করছে তখন ছোট্ট একটি মশা নমরুদের বেচে থাকার পরিকল্পনা ধ্বংস করে দেয়।


মাই ডিয়ার পৃথিবীবাসী— নমরুদ এবং ইব্রাহিম নবীকে হিস্টোরিক্যাল ফ্যাক্ট ধরে মশাকে মেটাফর ভাবুন— হিসাব মিলে যাবে— চিন্তা করার হিসাব: কথা বলার হিসাব: কাজের হিসাব। 


৪৯


বড় জায়গায় বড় সমস্যা— হয়তোবা লুকায়িত। ছোট জায়গায় ছোট সমস্যা— হয়তোবা প্রকাশিত!


৫০


বাংলাদেশের গ্রামে আসলে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠিত হয়ে গ্যাছে— কেউ কাউরে বড় হতে দেয় না— টেনেটুনে হলেও নিচে নামায়— কেউ খাবে, কেউ খাবে না— তা হবে, তা হবে না।


৫১

তুমি আমার কি ক্ষতি করবে— আমি তো নিজেই আমার ক্ষতি করি! তুমি আমার কি উপকার করবে— তুমি তো তোমারই উপকার করে নিলে!!