রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

সবাই ভোগী তিনিই কেবল যোগী

 — আম্মু, চলো আমরা বাইরে যাই। 

— না, মা। আমরা বাইরে যাবো না। 

— কেনো আম্মু? 

— বাইরে আমরা নিরাপদ না, মা! 

— আম্মু কেনো নিরাপদ না? 

— বাইরে ভয়ঙ্কর স্বার্থপর লোক বাস করে? 

— আম্মু, কাল দুপুরে আব্বু তোমাকে স্বার্থপর বলেছিল না? 

— অই চুপ কর, তর বাপ একটা বিজলা স্বার্থপর।  

— আম্মু বিজলা কি? 

— বিজলা অইলো তর মাথা— বুঝা লাগবো না, ঘুমা।

শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬

একটু পরে ট্রেন

 — সারারাত জার্নি আজ। 

— কই যাবেন?

—ফেনী ফিরবো। একটু পর ট্রেন।


— আজকের চাঁদ সুন্দর। সুন্দর চাঁদ আর ট্রেন— চমৎকার। খুবই ভালো জার্নি হবে।


— চমৎকার হবার কারণ নাই।  শোভন টিকেট তার উপর একা।


— আপনি একা নন। আপনার সাথে আমাদের আশীর্বাদ আছে ত। যার সাথে আশীর্বাদ থাকে মাটিকে সে স্বর্গলোক  করে তুলে।


— বাংলা সাহিত্যে পড়েছেন না?


— হুম। Blessing is a strong ever bullet proof bin.


এসব সাহিত্য টাহিত্য নিয়ে যত কম ঘাটাঘাটি করবেন তত ভাল থাকবেন বিলিভ মি। এই সাহিত্যে পড়ে আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল। স্থূল চিন্তার মানুষের ভিড় দমবন্ধ লাগে।


—সত্য বলেছেন। সঠিক বলেছেন। When life is thought, thought is dangerous. We look for before and after and pine for what is not.


— দুনিয়াদারি ভাল লাগে না! অসহ্য! 


— জানেন আমার কাছে পৃথিবীর কোনো মিনিং নেই তারপর মিনিং খুজঁতে থাকি।


— মিনিং খুঁজে লাভ নেই। 


— একটি শিশির কনা হয়তো মিনিং হয়ে পাশে দাঁড়িয়ে যাবে।

— শুভকামনা।


আরেকটি কথা, সাহিত্যের কারনেই মানুষ কেবল আমার কাছে মানুষ নয় ভিন্ন কিছুর ছায়া, সাহিত্যের কারনেই মানুষকে ভালোবাসতে পারি, শ্রদ্ধা করতে পারি।


— আমিও একসময় তাই ভাবতাম। তবে শিশির কণা না এসে রীতিমতো জলোচ্ছ্বাস এসেছে আর ভেঙেচুড়ে দিয়ে গেছে সব মাঠঘাট প্রান্তর।


— Things fall apart—  অনেক ভাঙনের পর এক সৃষ্টি।


— Yes things fall apart and centre will not hold anymore. 


— Every center hold for certainly center and center is almost margin. আনন্দের সীমান্তে গেলে মানুষের জ্ঞান থাকে না, কষ্টের সীমান্তে গেলে মানুষের জ্ঞান থাকে না, মানুষ মধ্যবর্তী ফলবতী ফলভোগী গাছ।


—কোন সীমান্তই নেই আমার ধারেকাছে। অদ্ভূত আঁধার এক। 


— জানেন অন্ধকারই একমাত্র চরিত্রবান। 

— কি জানি! 


— ফেনী পৌঁছে যাবেন চারটায়?


— ট্রেন তো আসলো না এখনো। লেইট। 


— ট্রেনের নাম কী?

— উদয়ন। 

— কী সুন্দর নাম!

— হু। বাংলাদেশের সব ট্রেনের নামই কম বেশি সুন্দর শুধু কালনী ছাড়া। 

— হা হা হা। 


— 😐। কেমন একটা কালনাগিনী ভাব আছে। 

— কেন মা কালী ভাব নেই?


— ট্রেন আসছে।  ট্রেনে উঠে কথা বলছি। 


— ঠিক আছে। 


— অতঃপর ট্রেন আসিলো।  আর আমি চাপিয়া বসিলাম। 


— সাথের মহিলা কী ফেনীই যাবেন? 


—সাথে মহিলা কি করে নিশ্চিত হলেন?


— যেহেতু চাপিয়া বসিলেন। 

— 😃। 

— অ। 

— তাহলে সাথে কে?


— সাথে  একজন মহিলাই। অপরিচিতা। 


—অপরিচিতা কারো কাছ থেকে কিছু খাবেন না কিন্তু। 

— হু। 

— আপনার বাড়ি কোথায়?

— ব্রাক্ষণবাড়িয়া এবং পৃথিবী, পৃথিবী আমার বাড়ি।

শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

পাবজিখা ভ্যালি

শুনেন একটি কথা বলি। আপনি আমার কথা শুনতে বাধ্য নন। আমি বলে যাবো আমার কথা। পাবজি ভ্যালি কিংবা পাবজিখা ভ্যালি ইজ মোর দ্যান সুইজারল্যান্ড। আপনি বলতেই পারেন কোথায় বান্দরবান আর কোথায় বৃন্দাবন।  আপনার কথা আপনার কাছেই জমা থাকুক। আমি বলে যাবো আমার কথা।  ভুটানের পাবজি ভ্যালিতে যে পরিমাণ সান আছে, যে পরিমাণ অক্সিজেন আছে, যে পরিমাণ স্বচ্ছ জল আছে, যে পরিমাণ প্রাকৃতিক বৈচিত্র আছে সেই পরিমাণ সামগ্রিক কিছু সুইজারল্যান্ডে নাই মিয়া ভাই। আপনি বিশ্বাস করার দরকার নাই, সুযোগ থাকলে প্রমাণ করে দেখাবেন আশা করি। 


পাবজিখা ভ্যালিতে শীতে অতিথি পাখি আসে। এবং এই অতিথি পাখির জন্যে ভুটান সরকার সারাবছর এই ভ্যালিতে চাষাবাদ নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।  রাতে যাতে বন্যপ্রাণী অতিথি পাখির কোনো ক্ষতি করতে না পারে সেই ব্যবস্থাও করেছে। ব্লাক নেক ক্রেইন নামে দারুণ দুটি পাখি দেখেছি সেখানকার জাদুঘরে। পাখি দুটি অসুস্থ হয়ে যায়। অসুস্থ দুটি পাখিকে সুস্থ করে ভুটান সরকার। এই উপমহাদেশের আথিতেয়তা পেয়ে পাখি দুটি ভুলে যায় নিজ দেশে ফেরত যেতে। একজনের নাম  রেখেছে প্রেমা, আরেকজনের নাম রেখেছে কর্মা। কে রেখেছে নাম?  ভুটান কর্তৃপক্ষ। 


অতিথি পাখি নিয়ে দারুণ একটি জাদুঘর দেখতে পাই পাজজি ভ্যালিতে।  পাখির জন্যে এমন সুন্দর আদর ভুটানের সুন্দর মানসিকতার পরিচয় বহন করে। অবশ্যই বহন করে।


ভুটানে এখন বসন্ত। এবং আজকে মে মাসের এগারো তারিখ। দুই হাজার ছাব্বিশ সাল।  তাপমাত্রা এগারো ডিগ্রি সেলসিয়াস। পাবজি ভ্যালিতে হাটছি। হাতে ক্যামেরা। দুই পাশে পাহাড়। মাঝখানে তৃনভূমি। ঘাস খাচ্ছে ঘোড়া।  তৃনভূমির মাঝদিয়ে বয়ে গ্যাছে বাঘের চোখের মতো তৎক্ষনাৎ সজাগ সর্পিল রাস্তা।  সেই রাস্তা দিয়ে হাটছি।  রাস্তার দুই পাশে ঘাস খাচ্ছে গরু। এই গরুগুলো বাংলাদেশের গরুর মতো নয়। শরীরের লোম বটগাছের নিচেবসা ধ্যানরত সাধুর চুলের মতো। এই রাস্তাটি যখন পাহাড়ের পাদভূমিতে যায় ঠিক তখনই ঘন জঙ্গলের পাশ দিয়ে যেতে হয় পাবজি ভ্যালির মূল  শহরে।  


ভাবছি মূল শহরে যাবো। একা একা। হেটে হেটে।  হাতে ক্যামেরা। দেখছি দূরের সেই পাহাড়ের পাদদেশের রাস্তা দিয়ে কারা যেনো আসছে।  কাছে আসতেই দেখি বিউটিফুল এক মানবী।  বিউটিফুল মানে বিউটিফুল। রোমানিয়া তার বাড়ি। নারীর হাতে ক্যামেরা। এবং আমার হাতে ক্যামেরা।  বিউটিফুল মানবীর সাথে দুইজন গাইড। 


মানবীকে জিজ্ঞেস করলাম— Is that any tiger through that jungle?  


মানবী সিরিয়াস মোডে উত্তর দিলো— There is no tiger but beautiful deer. You should careful about that beautiful deer. 


আমি সিরিয়াস মোডে ভয় পাওয়ার চেষ্টা করলাম।  আমার অভিনয়কে সে বাস্তব মনে করে আমাকে স্বাভাবিক করার জন্যে সে হেসে হেসে বললো— Just kidding.  


ঠিক তখন আমি তাকে বললাম— I am in proof that you are that beautiful deer and I am always very much careful about you. 


আমার কথা শুনে তারপর সে এমন এক হাসি দিলো যেনো  পাবজি ভ্যালির সৌন্দর্যে অতিথি পাখি এসে নামলো। 

তারপর আর কথা বাড়লো না আমাদের। বাড়লো না ঠিক নয়— কথা বাড়ালাম না। কিছু সৌন্দর্য দূরত্বেই ভালো লাগে।


হাটছি— সেই পাহাড় পাদদেশের রাস্তার দিকে। পাহাড় পাদদেশের রাস্তায় গিয়ে মনে হলো আর নাই যাই।  এই রাস্তায় মায়াময়ী টান আছে। ফিরতে পারবো না শেষে। রাত হয়ে যাবে।  


ভ্যালির তৃনভূমির কাছে ফিরে আসি। ফিরে আসি ঘোড়া আর গরুর কাছে।  একটা গান লেখার চেষ্টা করছি। লিখেও ফেলছি। কাউকে শুনাতে পারলে ভালো লাগতো।


হঠাৎ দেখি এই নীরব রাস্তা দিয়ে এক নারী হেটে আসছে— লেইফ রাইট লেইফ রাইট ভঙ্গিতে।  বললাম— আমি কী তোমার সাথে হাটতে পারি। সে বললো— অবশ্যই।  নারীর সাহস দেখে ভালো লাগলো।  অবশ্যই আমার কাছে যা সাহস মনে হচ্ছে ভুটানের জীবনে তা স্বাভাবিক।


হাটতে হাটতে তার সাথে গল্পে জমে গেলাম। জানলাম তার নাম কর্মা। নাম শুনে অতিথি পাখির কথা মনে পড়লো। তার স্বামী এখানকার নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। সে পরিপূর্ণ হাউজওয়াইফ।  হাটতে হাটতে আমার সদ্য লেখা গানটি শুনালাম। সে গানটির অর্থ জানতে চায়লো। আমি তাকে অর্থ শুনালাম।  সে বললো— খুবই সুন্দর কথা এবং মিষ্টি সুর।  এবং সে জানতে চায়লো— আমি গায়ক কিনা।  গান গাওয়ার চেষ্টা করি— বললাম তাকে।  তারপর আমরা আরও হাটলাম। অন্ধকার নেমে আসবে প্রায়। সে চললো তার বাড়ির দিকে, আমি চল্লাম my home resort এর দিকে।  আমি তাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ এক্সারসাইজ শেখালাম। কর্মা আমাকে শেখালো কেমন করে অতিথিদের দাওয়াত দিতে হয়।  সন্ধ্যা নেমে এলো। আমি নামলাম আমার অভিসুন্দর রুমে যেখান থেকে পাজভি ভ্যালির সেই বিখ্যাত পাহাড়টি দেখা যায় যেখানে মেঘ আর পাইন গাছ একসঙ্গে অভিসারে যায়।

সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

সোনার বাংলা

নৌকা যেমন জলে বাঁচে

ধান বাঁচে শিষে 

নদী বাঁচলে কৃষক বাঁচে

সোনার বাংলাদেশে

রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

নোবডি এন্ড সামবডি

নোবডি হওয়ার চর্চা আসলে হারিয়ে যাওয়া নয়— বরং নিজেকে সীমাবদ্ধ ‘আমি’ থেকে মুক্ত করা। যখন মানুষ নিজের অহংকে ধীরে ধীরে সরিয়ে রাখে তখন সে আর আলাদা কোনো সত্তা হয়ে থাকে না— সে প্রবাহ হয়ে যায়, অনুভব হয়ে যায়, এক ধরনের অদৃশ্য শক্তির মতো কাজ করতে থাকে— যেন উচ্চ কম্পাঙ্কে চলা এক নীরব অস্তিত্ব— যার উপস্থিতি আছে কিন্তু কোনো দাবি নেই।


এই চর্চা গভীরভাবে ব্যক্তিগত। এখানে ভাষা অনেক সময় ব্যর্থ হয়, আর ব্যাখ্যা অনেক সময় বিভ্রান্ত করে। তাই নোবডি হওয়ার পথটা একান্তই নিজের— নিঃশব্দ, সংযত, আর সচেতন।


যোগাযোগের মুহূর্তে তাই প্রয়োজন সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা— কারণ সব অনুভব প্রকাশের জন্য নয়, কিছু অনুভব কেবল উপলব্ধির জন্য।


নোবডি মানে নিজের ইগো বা ‘আমি’ ভেঙে ফেলা। তখন ব্যক্তি নিজেকে আলাদা সত্তা হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর কোনো প্রবাহের অংশ হিসেবে অনুভব করে। 


Somebody হওয়া মানে শুধু কেউ একজন হওয়া নয়— এটা নিজেকে একটি আলাদা সত্তা হিসেবে দেখায়, নিজের অস্তিত্বকে কেন্দ্র করে দাঁড়ানো, নিজের পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা। আর Nobody হওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়— বরং নিজেকে অতিক্রম করা। ‘আমি’র সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে ব্যক্তি আর আলাদা থাকে না— সে হয়ে যায় অনুভব, প্রবাহ, নীরব এক উপস্থিতি।


তাই Somebody আমাদের গড়ে তোলে— আর Nobody আমাদের মুক্ত করে।


সুফিরা একে বলে নফসের তাসাউফ বা নফস ও আমির শুদ্ধিকরণ। অর্থাৎ ভেতরের ‘আমি’কে পরিশুদ্ধ করার নীরব সাধনা। নফসের তাসাউফ মানে নিজের ভেতরের আমিকে চিনে ফেলা— তার লোভ, অহং, কামনা আর অস্থিরতাকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা। Somebody হতে চায় নফস— নিজেকে বড় করতে, আলাদা করে তুলতে। আর Nobody হতে শেখায় তাসাউফ— নিজেকে অতিক্রম করতে, নীরবে পরিশুদ্ধ হতে।


নফস যখন আম্মারা থেকে লাওয়ামা— আর লাওয়ামা থেকে মুতমাইন্না হয়ে ওঠে— তখন মানুষ আর শুধু মানুষ থাকে না— সে হয়ে ওঠে এক প্রশান্ত সত্তা। এই পথ উচ্চারণের নয়— অনুভবের, প্রদর্শনের নয়— নীরব সাধনার। 


এই পথ কোনো থিউরি নয়— এটা সম্পূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল সাধনা। শুধু ধারণা বা আলোচনা দিয়ে এখানে পৌঁছানো যায় না। এটি অভিজ্ঞতার আগুনে তেলে ভেজে নেওয়ার মতো এক রূপান্তর। যে জ্ঞান বাস্তব অনুশীলনে পরিণত হয় না, তা কেবল কথা হয়ে থাকে— পরিবেশনযোগ্য হয় না।


তাই নফসের এই পথকে সত্যিকার অর্থে অর্জনযোগ্য করতে হলে প্রয়োজন একজন যোগ্য পথপ্রদর্শক— একজন গাইড, একজন উস্তাদ। কারণ এই পথচলা মানে শুধু জানা নয়—নিজেকে বদলে ফেলা। আর নিজেকে বদলাতে হলে দরকার এমন একজন, যিনি আগে নিজে পথটা হেঁটে দেখেছেন।


যেটাকে কুরানের ভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম বলা হয়। সিরাতুল মুস্তাকিম শুধু একটি পথের নাম নয়— এটা জীবনের ভারসাম্য, সত্য ও আলোর দিকে চলার নির্দেশনা। এই পথে চলার বাস্তব চিহ্ন হলো— “সিরাতাল্লাজিনা আন‘আমতা আলাইহিম”— যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, যারা সেই পথে হেঁটে সফল হয়েছেন। অর্থাৎ পথ একটাই, কিন্তু সেই পথে সফল মানুষের জীবনই আমাদের জন্য দিকনির্দেশনা।


পথকে বুঝতে হলে পথিকদের চিহ্ন পড়তে হয়। সিরাতুল মুস্তাকিম হলো দিক— আর আন‘আমতা আলাইহিম হলো সেই দিকের জীবন্ত প্রমাণ।

চা গরম

ডাক্তার আইরিনের প্রথম দেখা পাই ট্রেনে। চা গরম সিনেমার ট্রেনে। পুরো সিনেমাতে ট্রেনের ভেতর শট একটিই। এই শটের সাইকোলজি হলো ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে মানসিক দূরত্বের কারন আবিষ্কারের একটি কচ্ছপ চেষ্টা। এই চেষ্টায় সফল হতে গেলে আরও গভীরে যেতে হবে। সেই গভীরতার নাম মানুষের ইকোনমি লাইফ এবং শিক্ষা লাইফ। চা গরম সিনেমাটিতে অবহেলিত চাশ্রমিকশ্রেনির করুনদৃশ্য দেখানো হয়েছে, অবহেলিত হওয়ার কারনদৃশ্য দেখানো হয়নি। 


সিনেমা শুরু হয় ড্রোন শটের মধ্য দিয়ে যেখানে চাবাগান দেখা যায়, তার পরপরই পূজাভোগদৃশ্য যেখানে একধরনের চাবাগানস্থ বিশ্বাস প্রকট হয়ে উঠে। প্রকৃতি এবং লোকজ বিশ্বাস দিয়ে সিনেমা শুরু হয়, নন্দিনির পরিশ্রমের ফলজয় দিয়ে সিনেমা শেষ হয়— যা লোকজ জীবনবোধ থেকে বৈজ্ঞানিক জীবনাচারে পর্দাপন প্রক্রিয়ার সিনেমিক ট্রিটমেন্ট। 


চা গরম— পরিচালনায় শঙ্খ দাশগুপ্ত— শুধু একটি ওয়েবফিল্ম নয় বরং আমাদের সমাজের এক অবহেলিত বাস্তবতার নির্মম অথচ সংবেদনশীল প্রতিচ্ছবি।


চরকি, Oxfam in Bangladesh এবং European Union-এর সহায়তায় নির্মিত এই কাজটি শুরু থেকেই আলাদা মনোযোগ দাবি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে তা হলো— এর গল্প বলার ভঙ্গি এবং চরিত্রগুলোর জীবন্ত উপস্থিতি। 


শুনুন— বাংলায় একটি প্রবাদ আছে— সাগরে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কিসের ভয়। চাশ্রমিক, যাদের সাগরসম কষ্ট বেদনা  যাতনা, তাদেরকে ধারণ করবে এমন নির্মিত গল্প আমরা এখনো পাইনি, আর সেই গল্পে প্রাণ দিবে এমন অভিনয়প্রাণ পাওয়ার কাজটা এতটাও সহজ নয়— তবে চা গরম কঠিন কাজটাকে সহজ করার পথে সহায়তা করেছে— বিভাত আসবেই এমন ডকুফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে, বিভাত আসবেই অভিনয় জগতে এমন ওয়েবফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে।


এমন মানে কেমন?  


তাহলে বলছি। যেখানে  মানবিক মূল্যবোধ থেকে গল্পবোধ জন্মে এবং গল্পবোধ থেকে লাইট ক্যামেরা এ্যাকশন হাটতে চলতে এবং দৌড়াতে শুরু করে। 


সিনেমায় আইরিন চরিত্রে সাফা কবির নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে হাজির করেছেন। তার পারফরম্যান্সে যে পরিমিতিবোধ, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কমেডি, আবেগ, দ্বিধা— সবকিছুতেই সে  অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক পরিমিতিবোধ সমান। আমার কাছে এটি তার এখন পর্যন্ত সেরা কাজ বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। মিঠু চরিত্রে পার্থ শেখ বরাবরের মতোই নির্ভরযোগ্য। তবে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠেছেন রবিন দা চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ। তার অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক যে, চরিত্র আর অভিনেতার সীমারেখা যেন মুছে যায়। কোথাও কোথাও তাকে দেখে রাজেশ শর্মা-র কথা মনে পড়েছে।


কি বলেন তো— চা গরম সিনেমাটিকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করে দেখতে চাই— শহরের চরিত্র, চা-বাগানের শ্রমিক চরিত্র, আর বাবু/ম্যানেজার চরিত্র। শহরের মানুষগুলো স্পষ্টতই প্রিভিলেজড— তাদের ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি সমস্যা দেখার ভঙ্গিও আলাদা। অন্যদিকে, চা-বাগানের শ্রমিকরা চরম আনপ্রিভিলেজড— তাদের জীবন শুধু কষ্টের নয়, একধরনের নীরব বন্দিত্ব। আর মাঝখানে যে বাবু বা ম্যানেজার চরিত্র— সে আপোষকামী। ম্যানেজার বা বাবু চরিত্রটিকে অনেকেই হয়তো “No Man’s Land” ভাবতে পারেন— কিন্তু সে আসলে ঠিক তা নয়। সে কোনো শূন্য ভূখণ্ড না বরং এক জীবন্ত বাফার জোন— উপরের ক্ষমতা আর নিচের বঞ্চনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক আপোষকামী সত্তা। তার সহানুভূতি আছে, কিন্তু তা প্রতিরোধে রূপ নেয় না; তার অবস্থান আছে, কিন্তু তা অবস্থানহীনতার মতোই অনিশ্চিত। সে যেন দুই দিকের টানাপোড়েনে আটকে থাকা এক মানুষ— যে না পুরোপুরি মালিকপক্ষের, না পুরোপুরি শ্রমিকের। এই মাঝামাঝি অবস্থানই তাকে সবচেয়ে বেশি মানবিক এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি অসহায় করে তোলে— আর ঠিক এখানে এ কে আজাদ সেতুর সেতুময় অভিনয় একেবারে চায়ের মধ্যে যেনো চিনি— ভালো কিন্তু সমালোচনা আছে। সমালোচনা কোথায় তাহলে? সমালোচনাটা হলো তিনার গাম্ভীর্য তেমন করে প্রকাশ পায়নি, গাম্ভীর্য অহংকারের রূপ নিয়েছে। 


নন্দিনীর বাবার মদ্যপান কিংবা মৃত্যুঞ্জয়ের বারবার “মরে গিয়েও বেঁচে থাকা”— এসব কেবল প্রতীক নয়, এগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষা। প্রশ্নটা এখানে— চা-বাগানে মদ এত সহজলভ্য কেন? এটা কি নিছক অভ্যাস, নাকি পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণের অংশ? এই জায়গাতেই সিনেমা কিছুটা থেমে যায়। মৃত্যুঞ্জয় আসলে বেঁচে আছে— কিন্তু কীভাবে, কেন— এই অস্তিত্বের প্রশ্নটাকে পরিষ্কার করে না। যেন বাস্তব আর প্রতীকের মাঝখানে ঝুলে থাকে চরিত্রটি।


আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে— ভর্তি কোচিংকে এখানে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। শিক্ষা এখানে মুক্তির পথ নয়  বরং আরেক ধরনের চাপের যন্ত্র। তবে অভিনয়ের জায়গায়—

শহরের চরিত্ররা শহরের মতোই হয়েছে, স্বাভাবিক। কিন্তু চা-শ্রমিক চরিত্রগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এমনকি বলা যায়— ওরাই পুরো সিনেমাটাকে টেনে সামনে নিয়ে গেছে।


নমস্কার দিদি— আমি রবিন চাঁদ মুর্মু— এই কথার মধ্য দিয়ে আমার চোখ অভিনেতা হিসাবে তাকে প্রথম আবিষ্কার করে। সাফা কবিরকে আলো দিয়েছে রবিন চাঁদ মুর্মু। সাফা কবিরের অভিনয় ভালো হয়েছে, তবে তার ভালোকে সামনের দিকে প্রাগ্রসর করেছে রবিন চাঁদ মুর্মু যার ভাষা থ্রোয়িং এবং অভিনয়ের মধ্যে ফারাক খুবই কম যা তাকে অনন্য অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জন্মের পর থেকে চা বাগানের রবিন দা গোফ রেখেছে। আর কাঠালগাছটা সেই উচু টিলায় রয়ে গেছে। তাই গোফে তেল দিয়েও লাভ হচ্ছে না— রবিনদা রবিনদা-ই থেকে গেলো— গরীবের কাছে স্বপ্ন হলো চিড়িয়াখানার বাঘের মতো, যেটা বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর লাগে, কিন্তু ভেতরে যাবার আর সাহস হয় না। 


নন্দিনী চরিত্রে সারাহ জেবীন অদিতি ছিলেন পুরো গল্পের প্রাণ। তার অভিনয়ে এতটা স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল যে মনে হয়েছে সে অভিনয় করছেন না বরং বেঁচে আছে সেই চরিত্রের ভেতর। এর আগে তাকে বোহেমিয়ান ঘোড়া-তে দেখা গেলেও  “চা গরম”-এ সে যেন নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।


গল্প ও চিত্রনাট্যে সাইফুল্লাহ রিয়াদ অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সংলাপগুলো যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি কমিক রিলিফগুলোও এসেছে খুব স্বাভাবিকভাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা— শেষটা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে একটি আলাদা স্বাদ দিয়েছে।


চা বাগানের শ্রমিকদের জীবন যেখানে দিনের পর দিন পরিশ্রমের পরও মজুরি থাকে মাত্র ১৮০-১৮৫ টাকা— এই নির্মম বাস্তবতাকে চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে। আমরা যারা চা বাগানে ঘুরতে যাই, ছবি তুলি, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি— তাদের জীবনের এই দিকটি প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। “চা গরম” সেই অদেখা জীবনকেই সামনে নিয়ে আসে।


লোকেশন, লাইট, ক্যামেরা, কালার গ্রেডিং— সবকিছু মিলিয়ে ভিজ্যুয়াল দিক থেকেও চা গরম সিনেমাটি চোখের জন্য এক ধরনের শান্তি। সিলেটের সবুজকে যেভাবে ফ্রেমবন্দী করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। স্কিনে কালারটোন  কোনো কোনো জায়গায় মার খেয়েছে— তাড়াহুড়ো করার কারনে এমনটা হয়ে থাকে তবে নন্দিনির কালারটোন একেবারে পারফেক্ট— চাকন্যা নন্দিনি। কস্টিউম ঠিক আছে তার। 


আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা বলি— চা-বাগানের শীতের সকাল এক ধরনের জাগরণ। কুয়াশার শাড়ি ধীরে ধীরে খুলে নেয় সূর্য, আর সেই মুহূর্তে চোখে একধরনের ঝাঁকুনি লাগে— যেন হাজার বছরের ঝিমুনি এক নিমিষে কেটে যায়— মন হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে অদ্ভুত চাঙা, ফুরফুরে। কিন্তু চা গরম-এ সেই স্পর্শটা পাইনি। চা-বাগানের বৃষ্টিও আলাদা এক ভাষা— সে বৃষ্টি থামতে চায় না, মনে হয় যেন চা-শ্রমিকের কান্না, ঘাম আর রক্তেরই আরেক নাম অথবা এক অনিবার্য সর্বনাশের প্রতিধ্বনি। এই বৃষ্টির সৌন্দর্য, এই বেদনার গভীরতা— সিনেমার প্রবাহে সেভাবে উঠে আসেনি।


পঞ্চগড়ে গিয়ে কোনো এক শীতে দেখেছিলাম একটি চাগাছ— চাগাছটি আম গাছের মতো বড়। চা গরম সিনেমা দেখে জানতে পারি, চাগাছ বটগাছের মতো বড় হতে পারে কিন্তু তাকে বড় হতে দেয়া হয় না। চাগাছকে খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার স্বপ্ন। চাগাছের মতোই চাবাগানের শ্রমিক— তাদের শ্রম খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার পেট। শ্রমিকদের ঘাম আর রক্তে টিকে থাকে, বেচে থাকে সভ্যতা অথচ তারা থাকে অন্ধকারের ভেতর আরও এক অন্ধকারে। রবিনদা শ্রমিকদের লিডার টাইপের তবে লিডার নয় ঠিক। চা গরমে তার হাটার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত। দুর্দান্ত অভিনয়। তার কথা বলার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত।  দুর্দান্ত অভিনয়।  নন্দিনি একেবারে মাটির মানুষ এবং পুরো স্কিনে তাকে মাটিঘেষা স্বপ্নপুরির মতো লাগছে। নন্দিনীর বাড়িটিও কিন্তু মাটির। দুদিন পরে মেয়েটার বিয়ে। তারপরও তার মন যেনো স্বপ্নবাড়ি। তার স্বপ্নবাড়ি যখন বাস্তবতার মুখ দেখে ঠিক তখনই সিনেমায় ড্রামাটিক প্রবাহ আসে যা দর্শকের মনে করুন রসের প্রবাহ আনে যা বীররসের আরেক নাম। 


অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও চা গরম কেবল একটি গল্প নয়— এটি একটি জীবন ধারার গল্প। এখানে নায়ক-নায়িকা নয় বরং মানুষের বেঁচে থাকা, স্বপ্ন দেখা আর সংগ্রামমুখর ইমেজই চরিত্র হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

কালের শাম

মেঘ আমি আশা ছিলো পাখি হয়ে উড়বো 

রঙিন আকাশ সবুজ পাহাড় স্বপ্নমতো ধরবো

গরম বাতাস হঠাৎ করে লাগলো আমার ডালে 

বৃষ্টি হলাম জন্ম আমার পানসে নদীর খালে 

খাল থেকে নদীতে যাবো যাবো সাগর বাড়ি 

নদী থেকে গরম বাতাস নিলো আমায় ধরি 

বাষ্প হয়ে আকাশ মাঠে মেঘ হলো আমার নাম 

মৃত্যুঘরে জন্ম হবো গল্প হবো হবো কালের শাম