সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

আ ফা লের মা মাছ 🐠

মাননীয় বিচারক— পৃথিবীকে আপনি জামিনে নয়— বেখেসুর খালাস ঘোষণা করুন! কোনো আইনি ধারায় আপনার কাছে আমরা বিচার চাইতে আসি নাই— আমরা আপনার দয়ার দরিয়ায় সিজদারত হে বিচারক!


০২


একটা মানুষ যদি দৌড়াইয়া কোনো কিছু ধরতে চায় তাহলে সে নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করে— একটা মানুষ যখন নিজের ভেতরে দৌড়ায় তখনই সে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে❤️🕊️


০৩


ভয় আসবে মনে— ভয় মনে আসা স্বাভাবিক— তবে ভয়কে বয়ফ্রেন্ড বানানো যাবে না হে  সওদাগর।


টেনশন, ভয়, লোভলালসা পরিকল্পনা একসঙ্গে স্নায়ুর খনিতে বসবাস করে— তাদের থেকে পরিকল্পনা বা আইডিয়াকে আলাদা করে নিতে হবে— আলাদা করে নিতে হবে সৎ সাহসকে।


ধানক্ষেত থেকে ধান পাওয়া যায়— কিন্তু চাল পেতে হলে কাটা, মাড়াই, শুকানো লাগে। স্বর্ণের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই— সুচিন্তার ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই। 


স্বর্ণ সাধারণত পাথর বা মাটির সঙ্গে মিশে থাকে। খুব কম ক্ষেত্রেই ছোট দানার মতো (placer gold) নদীর বালিতে পাওয়া যায়, সেটাও পরিশোধন ছাড়া ব্যবহারযোগ্য নয়।


স্বাস্থ্যকর চিন্তা বা উপকারী আইডিয়া অনেক ক্ষতিকর রিপুর সাথে মিশে থাকে— সেখান থেকে তাদেরকে আলাদা করে নিতে হয়— প্রজ্ঞার ফিল্টার দিয়ে স্বাস্থ্যকর চিন্তাকে আলাদা করে নিতে হয়।


ভয় কিংবা টেনশন আসা স্বাভাবিক— অস্বাভাবিক হলো তাদের সাথে বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডসুলভ আচরণ করা।


০৪


শিয়ালের সামনে মুরগি রেখে প্রমাণ করার কিছু নাই শিয়াল মুরগি খায় না— শিয়াল মুরগি খায় প্রমাণিত।


০৫


যেখানে পাওয়ার আশা থাকে না, যেখানে হারানোর ভয়ও থাকে না— ঠিক সেখানেই যখন জন্ম নেয় শ্রদ্ধা, সেই শ্রদ্ধার নাম তাকওয়া। তাকওয়ায় পরিপূর্ণ হৃদয়ে প্রভু অবস্থান করেন, যেমন করে ঘন অন্ধকারে অবস্থান করে পূর্ণিমার চাঁদ।


০৬


যতটুকু পারেন ততটুকু দুর্নীতি বন্ধ করলে হবে না—


যতটুকু দরকার, ততটুকু দুর্নীতি বন্ধ করতেই হবে।


দুর্নীতি কমানো কোনো দয়ার বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্রের ন্যূনতম দায়িত্ব। যেখানে যতটা কঠোরতা দরকার, সেখানে ঠিক ততটাই কঠোর হতে না পারলে ন্যায় শুধু কথায় থেকে যায়, কাজে নয়।


০৭


কথা দিয়ে যে কথা রাখে না সে শত্রু হওয়ারও যোগ্যতা রাখে না— কথা দিয়ে যে কথা রাখে সে শত্রু হলেও স্বর্ণের মতো দামি।


০৮


প্রেম কবরের নীরব অন্ধকারে চলে গেলে— যেও না তার কাছে মুনকার–নাকির হয়ে সওয়াল–জবাব করতে— যেও না, হে প্রেমিক, কবরের সেই প্রেমের কাছে— বরং নিঃশব্দে, গভীর মমতায় কবরের উপর একটি ফুলগাছ রোপণ করে এসো যেন কোনো এক ভোরের কোমল আলোয় কবরে প্রস্ফুটিত ফুলের দিকে তাকিয়ে তুমি বলতে পারো— হে ফুল, তুমি অপরূপ সুন্দর— কিন্তু তোমার চেয়েও গভীর, তোমার চেয়েও অনন্ত সুন্দর আমার প্রেম।


০৯


প্রভু, তোমার কথা যখনই মনে আসে, আমি হাসি— এক উপায়হীন হাসি। কারণ তুমি ভাজা মাছকে ক্ষমতা দিয়েছ প্রাজ্ঞ খিজির (আলাইহিস সালাম)-কে চেনার, অথচ আমাকে দাওনি একটি ভাজা মাছের ক্ষমতাকেও জানার।


১০


নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি মানুষের কিংবা রাষ্ট্রের দুর্দশার লক্ষণ— আর সোনা বা মেটালের মূল্য বৃদ্ধি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার লক্ষণ।


১১


শুধু থালা-বাসনে খানা খেলেই মানুষ হওয়া যায় না— মানুষ হতে গেলে সারা পৃথিবীর কল্যানের চিন্তায় অ্যাকশন থাকতে হয়— কুকুরের মতো হাড্ডি দখলের প্ল্যান এন্ড অ্যাকশন  নিলে হয় না কেবল— মগজের কাজ বাড়াতে হবে— ভোগের কাজ কমাতে হবে।


১২


আপনার জীবনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিন আছে। এক— যেদিন আপনি পৃথিবীতে জন্ম নিলেন। দুই— যেদিন আপনি জেনে গেলেন এই পৃথিবীতে আপনার জন্মের কারণ।


মজার কথা হলো, যেদিন আপনি জানবেন কেন আপনি জন্মগ্রহণ করেছেন, ঠিক সেই দিনই আপনার জন্ম হলো।


১৩


Sometimes words are too poor to inspire you again; sometimes inspiration itself is too poor to get something again. I myself realize the words “be easy,” and then it happens to be easy.


১৪


মানুষের জীবনে দুই ধরনের ব্যথা আছে— এক ধরনের ব্যথা মানুষকে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত করে— ফলে ব্যথাবহনকারী ব্যক্তি হয়ে ওঠে একান্ত ব্যক্তিগত। আরেক ধরনের ব্যথা ব্যক্তিকে পরিবর্তন করে— ব্যক্তি হয়ে ওঠে সামষ্টিক এবং সামষ্টিক কল্যাণে নিয়োজিত আত্মা। অর্থাৎ একটি ব্যথা মানুষকে নিজের মধ্যে আটকে রাখে; অন্যটি মানুষকে পৃথিবীর সাথে সংযুক্ত করে। 


১৫


Intention or intentionally are very popular words among many people, though they are not always famous in the true sense. By using these words, many people try to make others understand that they did not mean what they uttered. They often say, “I didn’t say it intentionally.”


But the reality is that both the conscious mind and the unconscious mind have intentions. Some people may be honest when they say this, but many are not.


For example, when you know that the demand for milk will increase in the market today, your mind tells you that you should sell milk at a higher price than usual. You wait for customers who are willing to pay more— This is the intention of the conscious mind.


On the other hand, when you know that the demand for milk in the market is normal, you prepare to sell milk at the regular price and go back home. Yet somewhere in your mind there remains a silent wish that you might still be able to sell it at a higher price— This is the intention of the unconscious mind.


The intention of the conscious mind often tries to deceive others, while the intention of the unconscious mind sometimes tries to deceive the conscious mind itself.


So, my struggling brothers and sisters, remember this: no cell in the body works without intention. Through the activity of cells, hormonal factors are produced. And through these hormonal factors, the entire system of information and communication within the body is completed—through which I and you exist as human beings, just as animals exist as living beings.


Thank you— both to myself and to all of you.


১৬


কুয়াশা কখনো করে না— কখনোই করবে না সূর্যের প্রশংসা। 


১৭


এই জাতির এক অদ্ভুত আচরণগত বৈশিষ্ট্য আছে— তারা নিজের অক্ষমতা দেখে কাঁদে না, কিন্তু অন্যের অক্ষমতা দেখে হাসে। যেন অন্যের ব্যর্থতাই তাদের আনন্দের উৎস। সত্য কথা হলো— এই জাতি হাসতে জানে, কিন্তু হাসাতে জানে না; কাঁদতে জানে এবং কাঁদাতেও জানে। 


১৮


Failure is a teacher— an excellent but expensive one, demanding a high price as the fee for your learning. Sometimes, however, it asks only a small price, because the lesson it offers is also small. 


১৯


রাজা একজন মানুষ— সিংহাসন কেবল তার মাথার টুপি, তার মর্যাদার প্রতীক। কিন্তু যখন রাজা নিজেকেই রাজত্ব ভেবে বসে, তখনই পদদলিত হয় জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা। ঠিক সেই মুহূর্তেই জনগণ জেগে ওঠে— তারা খুঁজতে থাকে নতুন এক মাথা, যার উপর অর্পণ করা যায় সেই মর্যাদার মুকুট। এভাবেই একদিন রাজত্ব বদলায়— রাজা নয়, টিকে থাকে কেবল ক্ষমতার অনন্ত চক্র।


২০


অধিকাংশ মানুষ মনে করে পুরুষ শুধু সুন্দরী বা সফল নারী চায়। কিন্তু সত্যটা আরও গভীর— সে চায় এমন একজন মানুষ, যার ভেতরে শান্তি আছে। সৌন্দর্য কিংবা সফলতা তখনই মূল্য পায়, যখন তা ঘর ও জীবনে প্রশান্তি বয়ে আনে। কারন সম্পর্ক টিকে থাকে সৌন্দর্যে নয়— স্বস্তিতে। সফলতায় নয়—সমঝোতায়।


ঝগড়া নয়, প্রয়োজন সংলাপ— আধিপত্য নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা। তাই ইতিহাসও বলে— ঝগড়াটে রাজার চেয়ে


শান্তিপ্রিয় ভিক্ষুকই অনেক সময় বেশি কল্যাণ বয়ে আনে।


২১


মেয়েদের এখনো অল্প বয়সে বিয়ে হয়, মা হয়ে যায় প্রস্তুতি ছাড়াই, স্বপ্নগুলো শুকিয়ে যায় সংসারের চাপে। আমরা তখন ধর্মকে দোষ দেই। কিন্তু সত্যিটা অস্বস্তিকর— ধর্ম না, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিই মেয়েদের আটকে রাখে। ধর্ম মানুষকে গরীব করে না— গরীব করে মানসিক সংকীর্ণতা, গরীব করে সুযোগের অভাব, গরীব করে চিন্তার দরিদ্রতা।


ধর্মের জন্ম হয়েছিল মুক্তির জন্য, শান্তির জন্য, মানুষকে মানুষ করার জন্য। কিন্তু আমরা? আমরা ভাতা দিয়ে বিবেক ঢাকি, সংখ্যা দিয়ে বাস্তবতা লুকাই, আর উন্নয়নের নামে এক ধরনের নীরব প্রতারণা চালাই। নারীকে এগিয়ে নিতে চাইলে— টাকা নয়, চিন্তার বিপ্লব দরকার। কারন একটা ভাতা একজন মানুষকে বাঁচাতে পারে, কিন্তু একটা দৃষ্টিভঙ্গি একটা প্রজন্মকে বদলে দিতে পারে। 


আর শুনুন— নারী পিছিয়ে নেই, নারীকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। আপনার উন্নয়নের ক্যামেরায় তাকে না দেখা গেলেও, জীবনের গভীর সত্যটা বদলায় না— রক্তের শক্তি, সৃষ্টির উৎস, টিকে থাকার সাহস— সবকিছুর শিকড়েই আছে নারী।


নারীকে এগিয়ে নেওয়ার বড় বড় কথা বলার আগে, তাকে নিচে নামিয়ে রাখার অভ্যাসটা বন্ধ করুন। কারণ নারীকে টেনে তুলতে হয় না— তাকে শুধু আটকে রাখা হাতগুলো সরিয়ে দিলেই সে নিজেই উঠে দাঁড়ায়।


২২


বড় হতে হতে যে বড়ো হয়ে যায়— এমন কারো কাছ থেকে দূরে থাকা চায়— বড় হতে হতে যে মহৎ হয়ে উঠে তার সঙ্গ নিয়ে নিজেরে রঙিন বানাই। 


২৩


অজ্ঞতা থেকে ভয়। ভয় থেকে ক্ষয়।  অর্থাৎ যে বিষয়ে তুমি ভয় পাচ্ছো সেই বিষয়ে তোমার জ্ঞান কম। আর ভয়ের এমন এক দারুণ ক্ষমতা আছে যে সে তোমাকে মানসিকভাবে একেবারে পঙ্গু করে দিতে পারে। ফলে তোমার ক্ষয় অনিবার্য। ক্ষয়ের শেষ প্রান্তে আবারও জয়— অনিবার্য জয়। কারন তুমি এমন এক শক্তি যার রূপান্তর আছে কিন্তু বিনাশ নাই।


২৪


ভালো হতে পয়সা লাগে— পয়সা লাগে না খারাপ হতে। 


২৫


যার হাতেই আপনি ক্ষমতা দিবেন সেই আপনার ক্ষমতা কেড়ে নিবে— কারন ভিক্ষুক কখনো ভিক্ষা দেয় না!


২৬


দুধ দীর্ঘজীবন লাভ করলে সেই আর দুধ থাকে না। সে হয়ে যায় দই, দুধ আরও দীর্ঘজীবন লাভ করলে সে হয়ে যায় ঘি, দুধ আরও দীর্ঘজীবন লাভ করলে সে হয়ে যায় পনির, দুধ আরও দীর্ঘজীবন লাভ করলে সে হয়ে যায় ঔষধ।


সো, দীর্ঘজীবনকে প্রক্রিয়া করে নিতে পারলে আপনি হবেন প্রাকৃতিক মানুষ, আর প্রক্রিয়া করতে ব্যর্থ হলে আপনি হবেন প্রক্রিয়াজাত মানুষ।


দুধ যেমন যত্ন আর সঠিক প্রক্রিয়ায় রূপ বদলায়, তেমনি মানুষও সময়ের ভেতর দিয়ে বদলায়। পার্থক্য শুধু— কে নিজেকে গড়ে, আর কে কেবল বদলে যায়। বদলানোর মধ্যেও এক ধরনের সৌন্দর্য আছে। আর সেই সৌন্দর্য দ্বিধায় থাকে না— সে গ্রহণ করে বা বর্জন করে। সৌন্দর্য কখনো ঝুলে থাকে না; সে স্পষ্ট— হয় ‘হ্যাঁ’, নয় ‘না’।


২৭


এই সমাজে যাদের আমরা ক্ষমতাধর ও ধনী বলে দেখি তারা নিজের শক্তিতে নয়— জনগণের শ্রম, আস্থা আর সুযোগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।


সময় আসছে, যখন মানুষ বুঝবে তার ঘামের মূল্য কে নিচ্ছে— সেই বোঝাপড়া থেকেই জন্ম নেবে জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার আর সমতার দাবি।


পরিবর্তন আসবে— লুটপাট দিয়ে নয়, সচেতনতা আর অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে।


২৮


লোভ থেকে যে লাভ আসে আর লাভ থেকে যে লোভ আসে দুই-ই বিনিয়োগ মানসিকতাকে ফাদে ফেলে। শয়তানের ফাদ থেকে মুক্ত থাকতে হলে লোভের লাভ এবং লাভের লোভ বাদ দিতে হবে।


তাহলে লোভ কী?


লোভ হলো প্রয়োজনের সীমা ছাড়িয়ে আরও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এটা শুধু “চাওয়া” না— এটা হলো চাওয়ার মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারানো।


তাহলে লাভ কী? 


লাভ হলো বিনিয়োগ বা কাজের মাধ্যমে পাওয়া বাস্তব, হিসাবযোগ্য অর্জন। লাভ = শৃঙ্খলিত ফলাফল। লোভ + লাভ = লাভকে ধ্বংস করার সম্ভাবনা অথবা অস্থিতিশীল সাফল্য।


২৯


The intention of making no one happy is often the first step toward making everyone happy. 


৩০


যে সেবায় ত্যাগ থাকে, সেই সেবাই পূজা— সেই প্রার্থনা। শরীরের শ্রম আর মনের আন্তরিকতার মিশ্রণে তপস্যা জন্ম নেয় ত্যাগের ঘরে। যে অভ্যাস প্রয়োজনেও ত্যাগ করা যায় না, তাকে ভালো অভ্যাস বলা যায় না মিয়া ভাই— ওটা তখন দাসত্ব।


তাই খারাপ অভ্যাস ছাড়তে হয়, আর ভালো অভ্যাসকেও কখনো কখনো বিসর্জন দিতে জানতে হয়; কারণ স্বাধীন আত্মা কোনো কিছুরই বন্দিফল নয়।


৩১


হয় চুপ থাকেন অথবা চুপ রাখেন— ইজ দ্যা বেস্ট মেথড অব কমিনিউকেশন। 


৩২


ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি— 'যে যায় লঙ্কায়, সে হয় রাবণ।' যদি কথাটা সত্যি হয়, তাহলে লঙ্কা আসলে রাবণ তৈরির কারখানা। প্রশ্ন হলো, আমরা সেই কারখানা এখনো টিকিয়ে রেখেছি কেন? তাহলে কি আমরা চেতনে বা অবচেতনে রাবণ হওয়ার সম্ভাবনাকে লালন করি? নাকি সত্যটা অন্য কোথাও— রাবণ তৈরি হয় না লঙ্কায়, রাবণ লুকিয়ে থাকে মানুষের ভেতরে; লঙ্কা কেবল তাকে প্রকাশ হওয়ার সুযোগ দেয়। ক্ষমতার কাঠামো তাই ধ্বংস করলেই রাবণ বিলুপ্ত হয় না, বরং প্রয়োজন সেই চেতনার পরিবর্তন, যা ক্ষমতাকে সেবায় রূপান্তরিত করে— শাসনে নয়।


৩৩


আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে মহাকালীন করে তুলেছেন— আমাদের কাজী নজরুল ইসলাম মহাকালীন যন্ত্রণাকে ব্যক্তিগত করে তুলেছেন। 


অথবা


রবীন্দ্রনাথ নিজের কান্নাকে সবার কান্না করেছেন— নজরুল সবার কান্নাকে নিজের কান্না করেছেন।


৩৪


প্রেম আর আগুনকে জাগ্রত রেখে তুমি ঘুমাতে পারবে না— ঘুমাতে পারবে— ঘুমে যদি পুড়ে যাওয়ার ভয় না থাকে। 


৩৫


দেশের জন্য যত অবদানই রাখা হোক— একজন নেতা কখনো সবার প্রশংসা পান না। সমালোচনা, বিরোধিতা এবং ভুল বোঝাবুঝি নেতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবুও প্রকৃত নেতৃত্ব হলো প্রতিকূলতার মাঝেও ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা ধরে রেখে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে কাজ করে যাওয়া।


নেতৃত্বের পথ প্রায়ই একাকী হয়— নেতৃত্বের ত্যাগ অনেক সময় অদৃশ্য থেকে যায়— এর ভারও সবাই অনুভব করতে পারে না— কিন্তু সময় শেষ পর্যন্ত তাদেরই মূল্যায়ন করে, যারা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে যায়। 


একটি প্রবাদ শুনে শুনে বড় হয়েছি— “সত্যের নাও সাতবার ডুবে, সাতবার ভাসে; মিথ্যার নাও একবার ডুবলে আর ভাসে না।”


সময় কখনো কখনো সত্যকে আড়াল করে রাখতে পারে— কিন্তু পরাজিত করতে পারে না। মিথ্যা হয়তো কিছুদিনের জন্য জয়ী বলে মনে হয়— কিন্তু তার স্থায়িত্ব নেই। শেষ পর্যন্ত সত্যই মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, আর মিথ্যা নিজের ভারেই ডুবে যায়।


তাই সময়কে সময় দিতে হয়— কারণ সত্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার অপেক্ষা করার ক্ষমতা।


৩৬


আপনার মন্দ বললে যদি আমার কোনো উপকারই না হয়, তাহলে আমি কেন আপনার মন্দ বলব? অন্যের মন্দ বলতে বলতে মানুষ আসলে নিজেরই ক্ষতি করে।


জমিতে তামাক চাষ করলে যেমন ধীরে ধীরে জমির উর্বরতা কমে যায়— তেমনি মানুষের চিন্তার জমি— এই ছোট্ট ব্রেইন, যার আয়তন মাত্র ১,২০০–১,৪০০ ঘন সেন্টিমিটার সেখানেও আমরা চিন্তার বীজ বপন করি যেখানে আমাদেরকে সহযোগিতা করে  প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন (স্নায়ুকোষ)। 


সেখানে চাইলে ইতিবাচক চিন্তা চাষ করা যায়— আবার নেতিবাচক চিন্তাও। কিন্তু বারবার নেতিবাচক চিন্তা চাষ করলে মনের উর্বরতা কমে যায়— দৃষ্টিভঙ্গি সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, শান্তি নষ্ট হয়।


মনে রাখবেন, জমি কিন্তু একটাই। সেই জমিতে কী ফলাবেন, সেই সিদ্ধান্তও আপনার।


আর একটি কথা— নেগেটিভকে পজিটিভ বলে চালিয়ে দেওয়াও এক ধরনের নেগেটিভতা। সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলার সাহসই ইতিবাচকতার প্রথম শর্ত।


৩৭


ক্ষমতা চরিত্রের জন্য ঠিক ততটাই যতটা খাদ্য শরীরের জন্য। হজমশক্তি না থাকলে খাদ্য যেমন বিষ হয়ে ওঠে তেমনি আত্মসংযম না থাকলে ক্ষমতাও ধ্বংসের কারন হয়ে দাঁড়ায়।


যারা নিজের ক্ষমতা দেখানোর ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রন করতে পারে না— তারা আসলে ক্ষমতার যোগ্যতার কাছেই পরাজিত। ক্ষমতা অর্জনের চেয়ে ক্ষমতা হজম করার সামর্থ্য অনেক বড়। ক্ষমতা প্রদর্শন করার আকাঙ্ক্ষা যত প্রবল চরিত্রের পরিপক্বতা তত প্রশ্নবিদ্ধ। সত্যিকারের শক্তিশালী মানুষ নিজের শক্তি প্রদর্শনে নয়, নিজের শক্তিকে সংযত রাখায় বিশ্বাসী।


ক্ষমতা মানুষের মর্যাদা বাড়ায় না— মানুষ কতটা ক্ষমতা হজম করতে পারে সেটাই তার প্রকৃত উচ্চতা নির্ধারণ করে। যে মানুষ নিজের অহংকার, আবেগ ও প্রদর্শনের লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না— সে যত বড় ক্ষমতার অধিকারীই হোক না কেন শেষ পর্যন্ত সেই ক্ষমতার ভারেই নত হয়ে যায় সে। কারন ক্ষমতা কখনো চরিত্র সৃষ্টি করে না— চরিত্রই ক্ষমতাকে মর্যাদা দেয়।


৩৮


ফুটবল খেলা আমি অবশ্যই দেখি। হাতের কাজ শেষ করে যখন কিছু অবসর পাই, তখন খেলা দেখি। কিন্তু আমি খেলা দেখি— খেলার ফলাফল নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। কারন  যেকোনো ফলাফল-চিন্তা এক ধরনের উত্তেজনা তৈরি করে— স্বাভাবিক আমিকে অস্বাভাবিক আমিতে রূপান্তরিত করে।


তাই কোথাও ভ্রমণে গেলেও আমি কোনো নির্দিষ্ট স্পটের প্রেমিক হয়ে উঠি না। আমার কাছে প্রতিটি মুহূর্তই ভ্রমণ— গন্তব্য নয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর পথটাই আসল ভ্রমণ।


গোটা পৃথিবী যেন এখন ফলাফলবাদী হয়ে উঠেছে। একসময় পড়তাম— “জন্ম হোক যথাতথা, কর্ম হোক ভালো।” আর এখন যেন বাস্তবতা দাঁড়িয়েছে— “কর্ম হোক যথাতথা, ফলাফল হোক ভালো।”


এই ফলাফলবাদী পৃথিবী মানুষকে আরও বিভক্ত করবে, আরও ভোগবাদী করে তুলবে। কারন যখন ফলই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে তখন পথের সৌন্দর্য, শ্রমের আনন্দ এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা— সবই ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে।


আমার কাজ কর্ম করে যাওয়া— ফলাফল এনে দেওয়া কর্মের কাজ। কর্ম না করে যদি ফলাফল নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি তবে তা ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার মতোই অবাস্তব চেষ্টা।


আবার কর্ম করার সময়ও যদি ফলাফল নিয়েই ভাবতে থাকি তবে আমার মনোযোগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়— এক ভাগ কর্মে, অন্য ভাগ ফলাফলে। মনোযোগ যখন বিভক্ত হয় তখন কোনো কাজ থেকেই শতভাগ ফল বেরিয়ে আসে না।


গ্রামবাংলার একটি প্রবাদ আছে— "দুই নৌকায় পা দিলে, পা থাকে না।" কর্মের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। যে মন পুরোপুরি কাজে নিবিষ্ট, সেই মনই সর্বোচ্চ সামর্থ্য প্রকাশ করতে পারে। ফলাফল তখন তার নিজের সময়ে, নিজের নিয়মেই এসে ধরা দেয়।


কর্ম আমার হাতে— ফলাফল কর্মের হাতে। তাই ফলের নয়, কর্মের প্রতি বিশ্বস্ত থাকাই প্রজ্ঞার লক্ষণ।


৩৯


যেখানে আপনার ক্ষমতা কাজ করে না সেখানে বলেন "আল্লাহ ভরসা।" আর যেখানে ক্ষমতা কাজ করে সেখানে বলেন "দেখে নেব।" অর্থাৎ আপনি নিজেই নিশ্চিত নন, আপনার প্রকৃত ভরসা কোথায়। আগে নিজেকে নিশ্চিত করুন। তখন ভরসা খুঁজতে হবে না; আপনি নিজেই ভরসার প্রতীক হয়ে উঠবেন।


প্রভু কখনো শুধু মাছ হাতে তুলে দেন না; তিনি ছিপ ধরিয়ে দেন যাতে আপনি সারাজীবন নিজের চেষ্টায় মাছ ধরে খেতে পারেন।


৪০


ভেড়ার পালের সামনে যে থাকে সেও ভেড়াই— সামনে থাকা ভেড়া এবং পালের একেবারে শেষের ভেড়ার মধ্যে গুনগত কোনো পার্থক্য নাই— সিংহ পালে চলে না— পলে পলে চলে— প্রতিটি সিংহের গুনগত পার্থক্য আলাদা— তারা আলাদা হয়েও বনের রাজা। সিংহ যে বনের রাজা এই কথা সিংহ বলে না— বলে ভেড়ার পাল।


৪১ 


উপার্জন, যশ, সুনাম কিংবা খ্যাতি যদি আপনাকে নিজের সত্যের পথে অটল থাকার কারনে আপনজনদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়— তবে বুঝবেন আপনি সুবিধার চেয়ে বিবেককে বেশি মূল্য দিয়েছেন। সত্যের পথের এই একাকীত্ব অনেক সময় কেয়ামতের ময়দানের একাকীত্বের মতোই গভীর।


কিন্তু উপার্জন, যশ ও খ্যাতি যদি আপনাকে সত্য বিসর্জন দিয়ে কেবল আপনজনদের সন্তুষ্ট রাখার উপায়ে পরিণত করে— তবে সতর্ক হোন। তখন আপনি প্রজ্ঞার নয়, আপসের পথে হাঁটছেন। এই আপস একদিন আপনাকে ভেতর থেকে নিঃস্ব করে দেবে— এমন নিঃস্ব, যার সবকিছু আছে, অথচ নিজের বলে কোনো অর্জন নেই।


৪২


যার অভাব আছে, তার অভাব দূর করতে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করুন। দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক অভাব মানুষের মনে অনিরাপত্তা, হতাশা ও মানসিক দারিদ্র্যের জন্ম দিতে পারে। সেই কারণে অভাবগ্রস্ত মানুষকে করুণা নয়— সম্মান ও সহায়তা দিন।


অভাবের চাপ কখনো কখনো মানুষের মধ্যে হীনমন্যতা ও হিংসার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। আর এই অনুভূতিগুলো দীর্ঘদিন লালিত হলে তা কৃপণতার মতো মানসিক প্রবণতায় রূপ নিতে পারে। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়— অনেক মানুষ অভাবের মধ্যেও উদার, আত্মমর্যাদাবান ও মহান থাকেন।


মিতব্যয়িতা ও কৃপণতা এক নয়। মিতব্যয়ী ব্যক্তি জানেন কোথায়, কখন এবং কতটুকু ব্যয় করা উচিত— তিনি অপচয় করেন না— আবার প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রেও কার্পণ্য করেন না। অন্যদিকে কৃপণ ব্যক্তি সঞ্চয়ের আনন্দে প্রয়োজনীয় ব্যয়ও এড়িয়ে যান। ফলে অর্থ জমলেও সম্পর্ক, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জীবনের স্বাভাবিক ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


তাই অভাবকে অবহেলা নয়— সহমর্মিতার সঙ্গে মোকাবিলা করুন— আর অর্থ ব্যবহারে কৃপণতা নয়— প্রজ্ঞাপূর্ণ মিতব্যয়িতাকে বেছে নিন।


সহায়তা মানে ভিক্ষা দেওয়া নয়— সহায়তা মানে এমন একটি সুযোগের ব্যবস্থা করে দেওয়া যাতে মানুষকে আর কখনো ভিক্ষা করতে না হয়। সাময়িক দান ক্ষুধা মেটাতে পারে কিন্তু সক্ষমতা সৃষ্টি মানুষকে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে শেখায়। প্রকৃত সহায়তা মানুষের হাতে ভিক্ষার পাত্র তুলে দেয় না— বরং তার হাতে তুলে দেয় কাজের উপকরণ, দক্ষতা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি।


৪৩


কর্তব্যকে দূরে ঠেলে, যারা সুবিধাকে বুকে টেনে নেয়, তারা যখন সেই সুবিধা থেকে নিজেদের প্রত্যাশিত সুবিধা পায় না, তখন আক্ষেপ করে বলে— "সারাটা জীবন দুধকলা দিয়ে সাপ পুষেছি।"


কিন্তু সত্যটা ভিন্ন। তারা সাপ নয়, সুবিধাকেই লালন করেছে। আর দুধকলার সাপও অন্য কেউ নয়— তারা নিজেরাই।


৪৪


তার সাথে যদি আপনি সংসার করেন তার মন্দ কোথাও বলিয়েন না— তার মন্দ যদি বলতেই হয় সংসারটা আর করিয়েন না— নিজেদের সমস্যা নিয়ে নিজের মধ্যে আলোচনা পর্যালোচনা হতে পারে— নিজেদের সমস্যার কথা, গর্তের কথা  বাজারে তুলতে হয় না— মনে রাখবেন, ঘরে গর্ত আছে জানলে, সাপ ইন্দুর আসবে— সংসার আসবে না।


৪৫


মানুষটা যাতে মারা যায় তার সমস্ত আয়োজন আমরা করি— মানুষটা মরে যাওয়ার পর শোকের আয়োজন আমরা করি— শোকের আয়োজনে তার সাথে আমাদের কি দারুণ দারুণ সম্পর্ক ছিলো তার বর্ণনা করি— আয়োজনটা আমরা ভালো পারি— নিজের প্রয়োজনের আয়োজন। 


আমরা নিজের প্রয়োজনে সাহায্যের হাত রাখি, নিজের প্রয়োজনে সাহায্যের হাত তুলে ফেলি— এই কথা যেদিন অকপটে বলতে পারবো সেইদিন রাষ্ট্রের কিংবা সমাজের একটা যৌথ সিস্টেম দাঁড়াবে— অন্যথায় প্রচলিত সিস্টেমকে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করবে।


৪৬


প্রেমিক হতে হলে দরকার তৃষ্ণা— জানার নয়, পাওয়ারও নয়; অনুভবের তৃষ্ণা। জ্ঞানী হতে হলে দরকার আগ্রহ। আগ্রহ থেকে জন্ম নেয় অনুসন্ধান, অনুসন্ধান থেকে জন্ম নেয় জ্ঞান। আর যখন সেই জ্ঞান বিনয়, অভিজ্ঞতা ও মানবিকতায় পরিপক্ব হয়, তখন জন্ম নেয় প্রজ্ঞা।


একটি জ্ঞানের শহর আরেকটি জ্ঞানের শহরকে প্রশ্ন করে, তর্ক করে, নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়— সেখান থেকেই কখনও কখনও গড়ে ওঠে মতের দেয়াল, দ্বন্দ্বের পৃথিবী।


কিন্তু প্রেমের পৃথিবী ভিন্ন। সেখানে জয়-পরাজয়ের হিসাব নেই— আছে আত্মসমর্পণ, সহমর্মিতা ও সংযোগ। তাই প্রেমের পৃথিবী প্রজ্ঞার পৃথিবী, প্রশান্তির পৃথিবী, তৃষ্ণার পৃথিবী— যেখানে প্রশ্নের চেয়ে উপলব্ধি বড়, আর যুক্তির চেয়ে মানবিকতা গভীর।


৪৭


ঘড়ির মধ্যে সময় খুজতে যেওনা রেজা— যেখানে ঘড়ি নাই সেখানেও সময় থাকে!


৪৮


সবাই বলে— শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ অর্জুন— শ্রেষ্ঠ গদাধর ভীম— শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক নকুল— বিপদের পদধ্বনি শুনতে পাওয়া সুন্দর পুরুষ সহদেব— আর সত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ যুধিষ্ঠির।


কিন্তু এই পাঁচ শ্রেষ্ঠ পুরুষের সঙ্গে জীবন কাটানো দ্রৌপদীর কথা কেউ বলে না। কারণ, সে নারী।


নারীর শ্রেষ্ঠত্বের শস্যগোলা আয়োজনের কথা ইতিহাস খুব কমই লিখে রাখে। একজন নারীকে পাঁচজন মানুষকে ভালোবাসা, সম্মান, দায়িত্ব ও সম্পর্কের ভারসাম্যে ধারণ করতে কী পরিমাণ মানসিক শক্তি, ধৈর্য, প্রজ্ঞা এবং সামর্থ্যের প্রয়োজন— সে হিসাব কেউ রাখে না।


ভাবুন তো, পাঁচজন শ্রেষ্ঠ মানুষকে মেইনটেইন করার জন্য দ্রৌপদীকে কতখানি শ্রেষ্ঠ হতে হয়েছিল!


তবে ভাববেন কেন? ভাবতেও তো শক্তি লাগে। আর সেই ধৈর্য ও শক্তি আপনাদের থাকার কথা নয়— আপনারা তো এমনিতেই শক্তিশালী!


৪৯


মাটির সঙ্গে স্বর্ণের নিয়মিত দেখা হলে— নিয়মিত আড্ডা হলে মাটি স্বর্ণ হয়ে যায় না। স্বর্ণ, স্বর্ণের সঙ্গে আড্ডা না দিয়েও স্বর্ণই থাকে। মজার ব্যাপার হলো— স্বর্ণ স্বর্ণের সঙ্গেই থাকে, মাটিও মাটির সঙ্গেই থাকে।


ডিমে তাপ দিলে প্রাণের জন্ম হয়— খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে বাচ্চা— মুরগিকে তাপ দিলে প্রস্তুত হয় খাবার। তাপ একই, ফল ভিন্ন।


এই পৃথিবীতে সান্নিধ্য আর তাপ— দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সান্নিধ্য সবাইকে স্বর্ণ বানায় না— আর তাপও সবাইকে জীবন্ত করে তোলে না। মাটি স্বর্ণের পাশে থেকেও মাটিই থেকে যায়— আবার একটি ডিম সঠিক তাপে জীবনের জন্ম দেয়—আর একটি মুরগি সেই একই তাপে খাদ্যে পরিণত হয়।


তাই কোথায়, কাকে, কতটুকু এবং কী উদ্দেশ্যে তুমি তোমার সময়, শ্রম, ভালোবাসা ও তাপ দিচ্ছ তা আগে জেনে নাও হে কারিগর। কারন সবকিছুকে একইভাবে স্পর্শ করা যায় না। কেউ সান্নিধ্যে বদলায়, কেউ বদলায় না— কেউ তাপে জন্ম দেয় জীবন— কেউ তাপেই হয়ে ওঠে ভোজনের উপকরণ।


৫০


আমাদের নির্মাতারা দর্শককে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে সিনেমা বানাচ্ছে না— দর্শক বানাচ্ছে— দর্শক সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখছে না— মজা দেখছে— লাল নীল হলুদ মজা— কটকডি মজা।


৫১

পক্ষে গেলে দুলা ভাই— বিপক্ষে গেলে চুলার ছাই

তা তৈ তা তৈ

কষ্ট আসে মনে

বৃষ্টি যেমন আসে

বৃষ্টি পেলে মাটির মন আনন্দে নাচে হাসে 

বুঝলে বুঝপাতা 

কষ্ট মনের বোনাস ভাতা 

শুকিয়ে যাওয়া স্বপ্নজুড়ে

জোছনামাখা ঢেউ 

কাবিল চিন্তা কষ্ট বাজায় তা তৈ, তা তৈ

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

স্রোত

উড়তে থাকা পাখি যখন ছায়ার মায়ায় পড়ে 

ডানায় তখন রোদ ক্লান্তি ভীষণ ভর করে 

ছায়াহীন পাখি আমি রোদের তাপে চলি

মেঘ আমার দীক্ষাঘর বাতাসের কথা বলি

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ব্রিটিশ থেকে আজ

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের “সেভেন সিস্টার্স” নামে পরিচিত সাত রাজ্যের মধ্যে Arunachal Pradesh, Meghalaya এবং Nagaland বিশেষভাবে ব্যতিক্রমী। ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কারণে এই তিন রাজ্য ভারতের মূল ভূখণ্ডের অনেক অঞ্চলের চেয়ে ভিন্ন এক পরিচয় বহন করে।


অরুণাচল প্রদেশে শতাধিক উপজাতীয় ভাষা ও উপভাষার অস্তিত্ব রয়েছে। পাহাড়, অরণ্য ও নদীবেষ্টিত এই রাজ্যে এক জনগোষ্ঠীর ভাষা অন্য জনগোষ্ঠীর কাছে প্রায়ই অপরিচিত। ফলে পারস্পরিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজি একটি নিরপেক্ষ সেতুভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রশাসন, শিক্ষা ও সরকারি কর্মকাণ্ডে ইংরেজির উপস্থিতি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


মেঘালয়ের চিত্রও কম বৈচিত্র্যময় নয়। খাসি, গারো ও জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। তবে শিক্ষা, প্রশাসন এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইংরেজির ব্যাপক ব্যবহার এই রাজ্যকে ভারতের অন্যতম ইংরেজি-নির্ভর অঞ্চলে পরিণত করেছে।

অন্যদিকে নাগাল্যান্ডে রয়েছে বহু নাগা ভাষা। ভাষাগত বৈচিত্র্য এতটাই বিস্তৃত যে ইংরেজিই এখানে সরকারি ভাষা এবং প্রশাসন ও শিক্ষার প্রধান মাধ্যম। পাশাপাশি নাগামিজ নামের একটি যোগাযোগভাষাও সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়।


ধর্মীয় দিক থেকেও এই তিন রাজ্যের পরিচয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। অরুণাচল প্রদেশে ঐতিহ্যবাহী উপজাতীয় বিশ্বাস, হিন্দুধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম— তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে হিন্দুধর্ম অনুসারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও খ্রিস্টধর্মের প্রভাবও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।


মেঘালয়ে খ্রিস্টধর্ম সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্ম। খাসি, গারো ও জৈন্তিয়া জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ খ্রিস্টান, ফলে চার্চ ও খ্রিস্টীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


নাগাল্যান্ডে খ্রিস্টধর্মের প্রভাব আরও গভীর। ভারতের সবচেয়ে খ্রিস্টান-প্রধান রাজ্যগুলোর অন্যতম এই অঞ্চলে জনসংখ্যার বিপুল অংশ খ্রিস্টধর্ম অনুসরণ করে— বিশেষ করে ব্যাপ্টিস্ট সম্প্রদায়ের অনুসারীরা এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

ভারতের মানচিত্রে এই তিন রাজ্য শুধু ভৌগোলিক সীমানার অংশ নয়; তারা বহুভাষিক সহাবস্থান, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় পরিবর্তনের এক অনন্য উদাহরণ। শত শত ভাষার ভিড়ে ইংরেজি এখানে যোগাযোগের সেতু, আর পাহাড়ি জনপদজুড়ে খ্রিস্টধর্মের উপস্থিতি এই অঞ্চলকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র সামাজিক পরিচয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই তিন রাজ্য তাই বৈচিত্র্যের মধ্যেও সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।


Mother Teresa এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করেছে, তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই অঞ্চলকে তাঁর প্রধান কর্মক্ষেত্র বানাননি।


মাদার তেরেসার কাজের কেন্দ্র ছিল Kolkata। সেখান থেকেই তাঁর সংগঠন ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও সমাজচ্যুত মানুষের সেবায় কাজ বিস্তৃত করে।


উত্তর-পূর্ব ভারতে, বিশেষ করে Meghalaya, Nagaland, Assam এবং Arunachal Pradesh-এ মিশনারিজ অব চ্যারিটির সিস্টাররা অনাথ আশ্রম, বৃদ্ধাশ্রম, স্বাস্থ্যসেবা ও দরিদ্র মানুষের সহায়তামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

তবে নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ে খ্রিস্টধর্মের বিস্তারের প্রধান কারণ মাদার তেরেসা নন। সেখানে উনবিংশ ও বিংশ শতকে ইউরোপীয় ও আমেরিকান ব্যাপ্টিস্ট এবং অন্যান্য খ্রিস্টান মিশনারিরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে বড় ভূমিকা পালন করেন। মাদার তেরেসার অবদান ছিল মূলত মানবসেবা ও দাতব্য কার্যক্রমে, ধর্মান্তরকরণে নয়।


১৯৪৬ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত “call within a call” বা বিশেষ ধর্মীয় আহ্বানের কথা উল্লেখ করেন।


“Call within a call” (ডাকের ভেতর আরেক ডাক) কথাটি Mother Teresa নিজেই ব্যবহার করেছিলেন। তখন তিনি কলকাতার একটি ক্যাথলিক স্কুলে শিক্ষকতা করতেন এবং সন্ন্যাসিনী হিসেবে জীবনযাপন করছিলেন। ১৯৪৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর দার্জিলিং যাওয়ার পথে ট্রেনে তিনি গভীর এক ধর্মীয় অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, তিনি যিশু খ্রিস্টের কাছ থেকে একটি বিশেষ আহ্বান পেয়েছেন—কনভেন্টের নিরাপদ জীবন ছেড়ে সবচেয়ে দরিদ্র, অসহায় ও অবহেলিত মানুষের মাঝে গিয়ে কাজ করার জন্য।


এই কারণেই তিনি একে “call within a call” বলেছিলেন। অর্থাৎ: প্রথম “call” ছিল সন্ন্যাসিনী হওয়ার আহ্বান।

দ্বিতীয় “call” ছিল সন্ন্যাসিনীর জীবন বজায় রেখেও দরিদ্রদের মধ্যে সরাসরি সেবা করার আহ্বান। এই অভিজ্ঞতার পর তিনি কয়েক বছরের মধ্যে কনভেন্ট ছেড়ে কলকাতার বস্তিতে কাজ শুরু করেন এবং পরে Missionaries of Charity প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫০ সালের ৭ অক্টোবর তিনি Missionaries of Charity প্রতিষ্ঠা করেন। 


ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। একজন বিশ্বাসী খ্রিস্টান এটিকে ঈশ্বরের আহ্বান হিসেবে দেখবেন, আর একজন ইতিহাসবিদ এটিকে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা গভীর ধর্মীয় প্রেরণা হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন।


নোবেল কমিটি তাঁকে এই পুরস্কার দেয় দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত মানুষের সেবায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ। তিনি কলকাতাকে কেন্দ্র করে মানবসেবামূলক কাজ পরিচালনা করতেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity বিশ্বের বহু দেশে সেবামূলক কার্যক্রম চালায়।


একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো, নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি ঐতিহ্যগত নোবেল ভোজ (banquet) বাতিল করার অনুরোধ করেছিলেন। সেই অর্থ দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হয়।


নোবেল ভোজ (Nobel Banquet) হলো নোবেল পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের পর আয়োজিত একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নৈশভোজ। প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর, Alfred Nobel-এর মৃত্যুবার্ষিকীতে Stockholm-এ নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। এরপর সুইডেনের রাজপরিবার, নোবেল বিজয়ী, বিজ্ঞানী, কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ ও আমন্ত্রিত অতিথিদের নিয়ে এক বিশাল আনুষ্ঠানিক ভোজের আয়োজন করা হয়। এটিই নোবেল ভোজ বা Nobel Banquet।


১৯৭৯ সালে Mother Teresa নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার পর অনুরোধ করেন, এই ভোজের জন্য যে অর্থ ব্যয় হতো তা যেন দরিদ্র মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করা হয়। তাঁর এই অনুরোধ ব্যাপকভাবে আলোচিত হয় এবং তাঁর মানবসেবামূলক দর্শনের একটি প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁর অনুরোধ গ্রহণ করা হয় এবং ভোজের ব্যয় দাতব্য কাজে দেওয়া হয়।


১৯৮০ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান Bharat Ratna লাভ করেন। কিন্তু ২০১৬ সালে “Saint Teresa of Calcutta” হিসেবে স্বীকৃতি (Canonization) তিনি মৃত্যুর প্রায় ১৯ বছর পরে পান। ক্যাথলিক চার্চে কাউকে “Saint” বা সাধু হিসেবে ঘোষণা করার প্রক্রিয়া সাধারণত মৃত্যুর পরই সম্পন্ন হয়। চার্চ ওই ব্যক্তির জীবন, কর্ম ও ধর্মীয় প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে পর্যালোচনা করে। এরপর Pope Francis ২০১৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে “Saint Teresa of Calcutta” ঘোষণা করেন। 


১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হন এবং সেই বছরই Mother Teresa-কে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান Bharat Ratna প্রদান করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি চার দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন:


১৯৬৬–১৯৭৭

১৯৮০–১৯৮৪


১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। এরপর তাঁর পুত্র Rajiv Gandhi প্রধানমন্ত্রী হন— রাজনীতিতে আসার আগে তিনি পেশাগতভাবে একজন বিমানচালক (পাইলট) ছিলেন। তিনি ভারতের জাতীয় বিমান সংস্থা Air India-তে পাইলট হিসেবে কাজ করতেন— রাজীব গান্ধী প্রথমে রাজনীতিতে আসতে আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর ছোট ভাই Sanjay Gandhi-এর মৃত্যুর পর পরিবারের ও দলের চাপে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৪০ বছর, যা তাঁকে ভারতের ইতিহাসের অন্যতম কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী করে তোলে।


একটি ঐতিহাসিক কৌতূহলের বিষয় হলো, ইন্দিরা গান্ধী নিজে ১৯৮০ সালে মাদার তেরেসাকে ভারতরত্ন প্রদান করেন, অথচ তিনি নিজেও তার আগেই (১৯৭১ সালে) ভারতরত্ন লাভ করেছিলেন। 


১৯৩৪ সালে ইন্দিরা নেহেরু (পরবর্তীকালে ইন্দিরা গান্ধী) শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীর পাঠভবনে ভর্তি হন। তাঁর বাবা জওহরলাল নেহেরুর ইচ্ছায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শুরু করেন। তবে মা কমলা নেহেরুর অসুস্থতার কারণে তাঁর সেই শিক্ষাজীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরে মায়ের চিকিৎসার জন্য তাঁকে ইউরোপে যেতে হয়।


জওহরলাল নেহেরুর নিজের শিক্ষাজীবন ছিল ইংল্যান্ডকেন্দ্রিক। বাড়িতে ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত Harrow School-এ পড়েন। এরপর Cambridge-এর Trinity College-এ Natural Sciences অধ্যয়ন করেন এবং পরে লন্ডনের Inner Temple থেকে আইনশাস্ত্রে শিক্ষালাভ করে ব্যারিস্টার হন।


অন্যদিকে তাঁর বাবা মতিলাল নেহেরু ভারতে শিক্ষালাভ করেই একজন সফল আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তাঁর অর্জিত সম্পদ ও সামাজিক অবস্থানই জওহরলাল নেহেরুর আন্তর্জাতিক শিক্ষার পথ সুগম করে।


ঠাকুর পরিবারের উত্থান আরও আগে। অষ্টাদশ শতকে নীলমণি ঠাকুরদের সময় থেকে পরিবারটি কলকাতায় ব্যবসা ও সম্পদের ভিত্তি গড়ে তোলে। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম সফল ব্যবসায়ী ও জমিদার। ব্যাংক, জাহাজ, কয়লাখনি, নীলচাষসহ বিভিন্ন খাতে তাঁর বিনিয়োগ ছিল। ১৭৯৩ সালের Permanent Settlement-এর পর তিনি বিভিন্ন জমিদারি অধিগ্রহণ করেন। পরে সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ নিজে জমিদারির তদারকি করলেও নতুন কোনো জমিদারি অর্জন করেননি।


রবীন্দ্রনাথের আন্তর্জাতিক পরিচিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে আর্জেন্টিনার সাহিত্যিক ভিক্টোরিয়া ওকামপোর সঙ্গে। ১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনায় অবস্থানকালে ওকামপোর আতিথ্য ও সান্নিধ্য কবিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেই সময়ে রচিত বহু কবিতা পরে ‘পুরবী’ কাব্যগ্রন্থে সংকলিত হয় এবং ১৯২৫ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি তিনি ওকামপোকে উৎসর্গ করেন। কবি তাঁকে ‘বিজয়া’ নামে সম্বোধন করতেন।


ওকামপো ১৯৩১ সালে ‘Sur’ নামে একটি সাহিত্যপত্র প্রতিষ্ঠা করেন। স্প্যানিশ ভাষায় ‘Sur’ অর্থ ‘দক্ষিণ’। নামটির মাধ্যমে তিনি লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। জন্মসূত্রে তিনি রোমান ক্যাথলিক হলেও তাঁর মানসিক বিকাশে ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব ছিল।


ইউনেসকো প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি সক্রিয় অবদান রেখেছেন। আর্জেন্টিনার পেরন সরকারের সময় জেলজুলুমের অভিজ্ঞতাও নিতে হয়েছে তিনার— গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কারাগারে ছিলেন ২৬ দিন।  সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা তার প্রভাবশালী বন্ধুরা এগিয়ে আসেন সেই সময়। একসময় সে ছাড়া পায়— জনাব  জওহরলাল নেহেরুর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর কারামুক্তির আয়োজনে। রক্ত কথা বলে— আরও কথা বলে রাজনৈতিক স্রোতধারা— ইন্দিরা গান্ধী ১৯৬৮ সালে   আর্জেন্টিনায় যান— ওকাম্পোর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরাকে বিশেষ স্নেহ করতেন ওকাম্পো৷ ইন্দিরা গান্ধীর আগমন উপলক্ষে লিখেছেন বিশেষ নিবন্ধ 'কমলা-চিত্রা ইন্দিরা'। 


সবচেয়ে মজার বিষয় হলো ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো শ্রমিকবিরোধী ছিলেন না— আবার পেরনও সংস্কৃতিবিরোধী ছিলেন না। কিন্তু একজন মনে করতেন স্বাধীনতা ছাড়া সামাজিক ন্যায় সম্ভব নয়— অন্যজন মনে করতেন সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকে শক্তিশালী ও সক্রিয় হতে হবে। আর্জেন্টিনার বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বড় অংশ আসলে এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাতের ইতিহাস।


ওকাম্পো প্রতিষ্ঠিত সাহিত্য সাময়িকী Sur ছিল আর্জেন্টিনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্ল্যাটফর্ম। পেরোনিস্টদের একটি অংশ এটিকে অভিজাত শ্রেণির সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রতীক হিসেবে দেখত। পেরনের রাজনীতি ছিল শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা— আর ওকাম্পোর সাংস্কৃতিক পরিসর ছিল আন্তর্জাতিক বুদ্ধিজীবী জগতের সঙ্গে সংযুক্ত।


আর্জেন্টিনার ইতিহাসে এমন একজন প্রেসিডেন্ট ছিলেন— যিনি শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি— একটি রাজনৈতিক দর্শনেরও জন্ম দিয়েছিলেন। তাঁর নাম হুয়ান ডোমিঙ্গো পেরন।

পেরন বলেছিলেন— একটি রাষ্ট্র শুধু ধনীদের জন্য নয়— শুধু শ্রমিকদের জন্যও নয়— রাষ্ট্র হবে সামাজিক ন্যায়, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সবার জন্য। তাঁর শাসনামলে শ্রমিকদের মজুরি বেড়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা বিস্তৃত হয়েছে, নারীরা ভোটাধিকার পেয়েছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রের ভূমিকা বেড়েছে।


তিনি পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদের মাঝখানে একটি তৃতীয় পথের কথা বলেছিলেন, যার নাম পেরোনিজম। আজও আর্জেন্টিনার রাজনীতিকে বোঝার জন্য একটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ— আপনি কি পেরোনিস্ট, নাকি অ্যান্টি-পেরোনিস্ট?


তবে পেরনের গল্প শুধু প্রশংসার নয়। সমালোচকেরা বলেন, তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করেছিলেন, রাষ্ট্রকে অতিমাত্রায় কেন্দ্রীভূত করেছিলেন এবং তাঁর রাজনীতিতে ব্যক্তিপূজা ও জনতুষ্টিবাদের প্রবণতা ছিল।


তবুও একটি সত্য অস্বীকার করা কঠিন— একজন নেতা মৃত্যুর বহু দশক পরেও যদি একটি দেশের রাজনৈতিক ভাষা নির্ধারণ করে দেন তাহলে তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন— তিনি ইতিহাসের একটি অধ্যায়।


ঐতিহাসিকভাবে ঠাকুর পরিবার ও নেহেরু পরিবার উভয়ই ব্রিটিশ শাসনামলে উচ্চশিক্ষা, সম্পদ ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ পেয়েছিল। তবে তাঁদের ভূমিকা ছিল ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে। ঠাকুর পরিবার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক চিন্তায় নেতৃত্ব দিয়েছে; নেহেরু পরিবার আইন, রাজনীতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আধুনিক ভারতের রাষ্ট্রগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।


১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেহত্যাগ করলেন। তাঁর মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর পরই ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটল ভারতীয় উপমহাদেশে। ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে দুটি ঘটনা আলাদা হলেও, প্রতীকী অর্থে মনে হয়— এক মহান প্রতিভার বিদায়ের পরই যেন এক বৃহৎ সাম্রাজ্যেরও বিদায়ের সূচনা হলো।


একটি বিষয় আমাকে প্রায়ই ভাবায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কেন গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে অনুবাদ করতে হলো, তারপরই কেন তিনি নোবেল পুরস্কার পেলেন? আবার সেই নোবেল পুরস্কারই বা কেন শান্তিনিকেতন থেকে চুরি হয়ে গেল?

এই দুটি ঘটনার মধ্যে কি কেবলই কাকতালীয় সম্পর্ক, নাকি ইতিহাসের গভীরে লুকিয়ে আছে আরও কোনো অনুচ্চারিত প্রশ্ন?


আরও একটি প্রশ্ন আমাকে নাড়া দেয়— শান্তিনিকেতন থেকে ২০০৪ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক ও কয়েকটি মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়— যে ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের নোবেল পদক চুরি করেছে, সে কি শুধুই একজন চোর? নাকি রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার সেই বঞ্চিত মানুষের মতো, যে নিজের প্রাপ্য হিস্যা বুঝে নেওয়ার এক প্রতীকী দাবি জানিয়েছে?


এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো ইতিহাসের কাছে নেই। কিন্তু প্রশ্নটি থেকে যায়— যেখানে স্বীকৃতি, সম্পদ, ক্ষমতা ও মালিকানার ইতিহাস জড়িয়ে থাকে, সেখানে একটি চুরি কি শুধু চুরি— নাকি কখনো কখনো তা ইতিহাসের আরেকটি নীরব ভাষ্যও হয়ে ওঠে?

শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

রব রাবে

ভবে কেবল ডুবে থাকো ভাবে 

সঙ্গ পেলে রঙ্গ করো নির্মোহ রব রাবে

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

আদর ছলছলো

বৃষ্টি এলে কেমন করে ঘুমিয়ে থাকি বলো

টিনের চালের শব্দ যেন আদর ছলছলো 

বৃষ্টি হলে কেমন করে তুমি ঘুম হলে 

তোমায় আমি জাগিয়ে তুলি হঠাৎ চুমুর ছলে 

তোমার দেহে যখন আমি বৃষ্টি ঝরঝর 

টিনের চালের মতো তুমি কাঁপো থরথর

ধীরে ধীরে হয়ে ওঠো শ্রাবণ মাসের নদী 

তোমার জলে ভাসে স্বপ্ন ভালোবাসা অধীর

জীবনজল সাগরমুখী চলছে নিরন্তর

প্রকৃতির রঙে রাঙাই আমরা মনের অন্দর

সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬

আষাঢ় মাস

আষাঢ় মাস— মেঘ আসি আসি করে 

মেঘলা সময়— বৃষ্টির শরীর হৃদয়ে ধরে