রবিবার, ৩ মে, ২০২৬

নোবডি এন্ড সামবডি

নোবডি হওয়ার চর্চা আসলে হারিয়ে যাওয়া নয়— বরং নিজেকে সীমাবদ্ধ ‘আমি’ থেকে মুক্ত করা। যখন মানুষ নিজের অহংকে ধীরে ধীরে সরিয়ে রাখে তখন সে আর আলাদা কোনো সত্তা হয়ে থাকে না— সে প্রবাহ হয়ে যায়, অনুভব হয়ে যায়, এক ধরনের অদৃশ্য শক্তির মতো কাজ করতে থাকে— যেন উচ্চ কম্পাঙ্কে চলা এক নীরব অস্তিত্ব— যার উপস্থিতি আছে কিন্তু কোনো দাবি নেই।


এই চর্চা গভীরভাবে ব্যক্তিগত। এখানে ভাষা অনেক সময় ব্যর্থ হয়, আর ব্যাখ্যা অনেক সময় বিভ্রান্ত করে। তাই নোবডি হওয়ার পথটা একান্তই নিজের— নিঃশব্দ, সংযত, আর সচেতন।


যোগাযোগের মুহূর্তে তাই প্রয়োজন সংবিধিবদ্ধ সতর্কতা— কারণ সব অনুভব প্রকাশের জন্য নয়, কিছু অনুভব কেবল উপলব্ধির জন্য।


নোবডি মানে নিজের ইগো বা ‘আমি’ ভেঙে ফেলা। তখন ব্যক্তি নিজেকে আলাদা সত্তা হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর কোনো প্রবাহের অংশ হিসেবে অনুভব করে। 


Somebody হওয়া মানে শুধু কেউ একজন হওয়া নয়— এটা নিজেকে একটি আলাদা সত্তা হিসেবে দেখায়, নিজের অস্তিত্বকে কেন্দ্র করে দাঁড়ানো, নিজের পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা। আর Nobody হওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া নয়— বরং নিজেকে অতিক্রম করা। ‘আমি’র সীমা ছাড়িয়ে গিয়ে এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো যেখানে ব্যক্তি আর আলাদা থাকে না— সে হয়ে যায় অনুভব, প্রবাহ, নীরব এক উপস্থিতি।


তাই Somebody আমাদের গড়ে তোলে— আর Nobody আমাদের মুক্ত করে।


সুফিরা একে বলে নফসের তাসাউফ বা নফস ও আমির শুদ্ধিকরণ। অর্থাৎ ভেতরের ‘আমি’কে পরিশুদ্ধ করার নীরব সাধনা। নফসের তাসাউফ মানে নিজের ভেতরের আমিকে চিনে ফেলা— তার লোভ, অহং, কামনা আর অস্থিরতাকে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আনা। Somebody হতে চায় নফস— নিজেকে বড় করতে, আলাদা করে তুলতে। আর Nobody হতে শেখায় তাসাউফ— নিজেকে অতিক্রম করতে, নীরবে পরিশুদ্ধ হতে।


নফস যখন আম্মারা থেকে লাওয়ামা— আর লাওয়ামা থেকে মুতমাইন্না হয়ে ওঠে— তখন মানুষ আর শুধু মানুষ থাকে না— সে হয়ে ওঠে এক প্রশান্ত সত্তা। এই পথ উচ্চারণের নয়— অনুভবের, প্রদর্শনের নয়— নীরব সাধনার। 


এই পথ কোনো থিউরি নয়— এটা সম্পূর্ণ প্র্যাকটিক্যাল সাধনা। শুধু ধারণা বা আলোচনা দিয়ে এখানে পৌঁছানো যায় না। এটি অভিজ্ঞতার আগুনে তেলে ভেজে নেওয়ার মতো এক রূপান্তর। যে জ্ঞান বাস্তব অনুশীলনে পরিণত হয় না, তা কেবল কথা হয়ে থাকে— পরিবেশনযোগ্য হয় না।


তাই নফসের এই পথকে সত্যিকার অর্থে অর্জনযোগ্য করতে হলে প্রয়োজন একজন যোগ্য পথপ্রদর্শক— একজন গাইড, একজন উস্তাদ। কারণ এই পথচলা মানে শুধু জানা নয়—নিজেকে বদলে ফেলা। আর নিজেকে বদলাতে হলে দরকার এমন একজন, যিনি আগে নিজে পথটা হেঁটে দেখেছেন।


যেটাকে কুরানের ভাষায় সিরাতুল মুস্তাকিম বলা হয়। সিরাতুল মুস্তাকিম শুধু একটি পথের নাম নয়— এটা জীবনের ভারসাম্য, সত্য ও আলোর দিকে চলার নির্দেশনা। এই পথে চলার বাস্তব চিহ্ন হলো— “সিরাতাল্লাজিনা আন‘আমতা আলাইহিম”— যাদের উপর আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, যারা সেই পথে হেঁটে সফল হয়েছেন। অর্থাৎ পথ একটাই, কিন্তু সেই পথে সফল মানুষের জীবনই আমাদের জন্য দিকনির্দেশনা।


পথকে বুঝতে হলে পথিকদের চিহ্ন পড়তে হয়। সিরাতুল মুস্তাকিম হলো দিক— আর আন‘আমতা আলাইহিম হলো সেই দিকের জীবন্ত প্রমাণ।

চা গরম

ডাক্তার আইরিনের প্রথম দেখা পাই ট্রেনে। চা গরম সিনেমার ট্রেনে। পুরো সিনেমাতে ট্রেনের ভেতর শট একটিই। এই শটের সাইকোলজি হলো ডাক্তার এবং রোগীর মধ্যে মানসিক দূরত্বের কারন আবিষ্কারের একটি কচ্ছপ চেষ্টা। এই চেষ্টায় সফল হতে গেলে আরও গভীরে যেতে হবে। সেই গভীরতার নাম মানুষের ইকোনমি লাইফ এবং শিক্ষা লাইফ। চা গরম সিনেমাটিতে অবহেলিত চাশ্রমিকশ্রেনির করুনদৃশ্য দেখানো হয়েছে, অবহেলিত হওয়ার কারনদৃশ্য দেখানো হয়নি। 


সিনেমা শুরু হয় ড্রোন শটের মধ্য দিয়ে যেখানে চাবাগান দেখা যায়, তার পরপরই পূজাভোগদৃশ্য যেখানে একধরনের চাবাগানস্থ বিশ্বাস প্রকট হয়ে উঠে। প্রকৃতি এবং লোকজ বিশ্বাস দিয়ে সিনেমা শুরু হয়, নন্দিনির পরিশ্রমের ফলজয় দিয়ে সিনেমা শেষ হয়— যা লোকজ জীবনবোধ থেকে বৈজ্ঞানিক জীবনাচারে পর্দাপন প্রক্রিয়ার সিনেমিক ট্রিটমেন্ট। 


চা গরম— পরিচালনায় শঙ্খ দাশগুপ্ত— শুধু একটি ওয়েবফিল্ম নয় বরং আমাদের সমাজের এক অবহেলিত বাস্তবতার নির্মম অথচ সংবেদনশীল প্রতিচ্ছবি।


চরকি, Oxfam in Bangladesh এবং European Union-এর সহায়তায় নির্মিত এই কাজটি শুরু থেকেই আলাদা মনোযোগ দাবি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে তা হলো— এর গল্প বলার ভঙ্গি এবং চরিত্রগুলোর জীবন্ত উপস্থিতি। 


শুনুন— বাংলায় একটি প্রবাদ আছে— সাগরে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কিসের ভয়। চাশ্রমিক, যাদের সাগরসম কষ্ট বেদনা  যাতনা, তাদেরকে ধারণ করবে এমন নির্মিত গল্প আমরা এখনো পাইনি, আর সেই গল্পে প্রাণ দিবে এমন অভিনয়প্রাণ পাওয়ার কাজটা এতটাও সহজ নয়— তবে চা গরম কঠিন কাজটাকে সহজ করার পথে সহায়তা করেছে— বিভাত আসবেই এমন ডকুফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে, বিভাত আসবেই অভিনয় জগতে এমন ওয়েবফিল্ম টাইপের কাজ চলতে থাকলে।


এমন মানে কেমন?  


তাহলে বলছি। যেখানে  মানবিক মূল্যবোধ থেকে গল্পবোধ জন্মে এবং গল্পবোধ থেকে লাইট ক্যামেরা এ্যাকশন হাটতে চলতে এবং দৌড়াতে শুরু করে। 


সিনেমায় আইরিন চরিত্রে সাফা কবির নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে হাজির করেছেন। তার পারফরম্যান্সে যে পরিমিতিবোধ, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। কমেডি, আবেগ, দ্বিধা— সবকিছুতেই সে  অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক পরিমিতিবোধ সমান। আমার কাছে এটি তার এখন পর্যন্ত সেরা কাজ বললে খুব বেশি বাড়িয়ে বলা হবে না। মিঠু চরিত্রে পার্থ শেখ বরাবরের মতোই নির্ভরযোগ্য। তবে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠেছেন রবিন দা চরিত্রে রেজওয়ান পারভেজ। তার অভিনয় এতটাই স্বাভাবিক যে, চরিত্র আর অভিনেতার সীমারেখা যেন মুছে যায়। কোথাও কোথাও তাকে দেখে রাজেশ শর্মা-র কথা মনে পড়েছে।


কি বলেন তো— চা গরম সিনেমাটিকে মূলত তিনটি স্তরে ভাগ করে দেখতে চাই— শহরের চরিত্র, চা-বাগানের শ্রমিক চরিত্র, আর বাবু/ম্যানেজার চরিত্র। শহরের মানুষগুলো স্পষ্টতই প্রিভিলেজড— তাদের ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি, এমনকি সমস্যা দেখার ভঙ্গিও আলাদা। অন্যদিকে, চা-বাগানের শ্রমিকরা চরম আনপ্রিভিলেজড— তাদের জীবন শুধু কষ্টের নয়, একধরনের নীরব বন্দিত্ব। আর মাঝখানে যে বাবু বা ম্যানেজার চরিত্র— সে আপোষকামী। ম্যানেজার বা বাবু চরিত্রটিকে অনেকেই হয়তো “No Man’s Land” ভাবতে পারেন— কিন্তু সে আসলে ঠিক তা নয়। সে কোনো শূন্য ভূখণ্ড না বরং এক জীবন্ত বাফার জোন— উপরের ক্ষমতা আর নিচের বঞ্চনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক আপোষকামী সত্তা। তার সহানুভূতি আছে, কিন্তু তা প্রতিরোধে রূপ নেয় না; তার অবস্থান আছে, কিন্তু তা অবস্থানহীনতার মতোই অনিশ্চিত। সে যেন দুই দিকের টানাপোড়েনে আটকে থাকা এক মানুষ— যে না পুরোপুরি মালিকপক্ষের, না পুরোপুরি শ্রমিকের। এই মাঝামাঝি অবস্থানই তাকে সবচেয়ে বেশি মানবিক এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি অসহায় করে তোলে— আর ঠিক এখানে এ কে আজাদ সেতুর সেতুময় অভিনয় একেবারে চায়ের মধ্যে যেনো চিনি— ভালো কিন্তু সমালোচনা আছে। সমালোচনা কোথায় তাহলে? সমালোচনাটা হলো তিনার গাম্ভীর্য তেমন করে প্রকাশ পায়নি, গাম্ভীর্য অহংকারের রূপ নিয়েছে। 


নন্দিনীর বাবার মদ্যপান কিংবা মৃত্যুঞ্জয়ের বারবার “মরে গিয়েও বেঁচে থাকা”— এসব কেবল প্রতীক নয়, এগুলো এক ধরনের রাজনৈতিক ভাষা। প্রশ্নটা এখানে— চা-বাগানে মদ এত সহজলভ্য কেন? এটা কি নিছক অভ্যাস, নাকি পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রণের অংশ? এই জায়গাতেই সিনেমা কিছুটা থেমে যায়। মৃত্যুঞ্জয় আসলে বেঁচে আছে— কিন্তু কীভাবে, কেন— এই অস্তিত্বের প্রশ্নটাকে পরিষ্কার করে না। যেন বাস্তব আর প্রতীকের মাঝখানে ঝুলে থাকে চরিত্রটি।


আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে— ভর্তি কোচিংকে এখানে ইতিবাচকভাবে দেখানো হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। শিক্ষা এখানে মুক্তির পথ নয়  বরং আরেক ধরনের চাপের যন্ত্র। তবে অভিনয়ের জায়গায়—

শহরের চরিত্ররা শহরের মতোই হয়েছে, স্বাভাবিক। কিন্তু চা-শ্রমিক চরিত্রগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এমনকি বলা যায়— ওরাই পুরো সিনেমাটাকে টেনে সামনে নিয়ে গেছে।


নমস্কার দিদি— আমি রবিন চাঁদ মুর্মু— এই কথার মধ্য দিয়ে আমার চোখ অভিনেতা হিসাবে তাকে প্রথম আবিষ্কার করে। সাফা কবিরকে আলো দিয়েছে রবিন চাঁদ মুর্মু। সাফা কবিরের অভিনয় ভালো হয়েছে, তবে তার ভালোকে সামনের দিকে প্রাগ্রসর করেছে রবিন চাঁদ মুর্মু যার ভাষা থ্রোয়িং এবং অভিনয়ের মধ্যে ফারাক খুবই কম যা তাকে অনন্য অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জন্মের পর থেকে চা বাগানের রবিন দা গোফ রেখেছে। আর কাঠালগাছটা সেই উচু টিলায় রয়ে গেছে। তাই গোফে তেল দিয়েও লাভ হচ্ছে না— রবিনদা রবিনদা-ই থেকে গেলো— গরীবের কাছে স্বপ্ন হলো চিড়িয়াখানার বাঘের মতো, যেটা বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর লাগে, কিন্তু ভেতরে যাবার আর সাহস হয় না। 


নন্দিনী চরিত্রে সারাহ জেবীন অদিতি ছিলেন পুরো গল্পের প্রাণ। তার অভিনয়ে এতটা স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল যে মনে হয়েছে সে অভিনয় করছেন না বরং বেঁচে আছে সেই চরিত্রের ভেতর। এর আগে তাকে বোহেমিয়ান ঘোড়া-তে দেখা গেলেও  “চা গরম”-এ সে যেন নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।


গল্প ও চিত্রনাট্যে সাইফুল্লাহ রিয়াদ অসাধারণ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সংলাপগুলো যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি কমিক রিলিফগুলোও এসেছে খুব স্বাভাবিকভাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা— শেষটা গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে একটি আলাদা স্বাদ দিয়েছে।


চা বাগানের শ্রমিকদের জীবন যেখানে দিনের পর দিন পরিশ্রমের পরও মজুরি থাকে মাত্র ১৮০-১৮৫ টাকা— এই নির্মম বাস্তবতাকে চলচ্চিত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরেছে। আমরা যারা চা বাগানে ঘুরতে যাই, ছবি তুলি, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি— তাদের জীবনের এই দিকটি প্রায়ই চোখ এড়িয়ে যায়। “চা গরম” সেই অদেখা জীবনকেই সামনে নিয়ে আসে।


লোকেশন, লাইট, ক্যামেরা, কালার গ্রেডিং— সবকিছু মিলিয়ে ভিজ্যুয়াল দিক থেকেও চা গরম সিনেমাটি চোখের জন্য এক ধরনের শান্তি। সিলেটের সবুজকে যেভাবে ফ্রেমবন্দী করা হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। স্কিনে কালারটোন  কোনো কোনো জায়গায় মার খেয়েছে— তাড়াহুড়ো করার কারনে এমনটা হয়ে থাকে তবে নন্দিনির কালারটোন একেবারে পারফেক্ট— চাকন্যা নন্দিনি। কস্টিউম ঠিক আছে তার। 


আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটা কথা বলি— চা-বাগানের শীতের সকাল এক ধরনের জাগরণ। কুয়াশার শাড়ি ধীরে ধীরে খুলে নেয় সূর্য, আর সেই মুহূর্তে চোখে একধরনের ঝাঁকুনি লাগে— যেন হাজার বছরের ঝিমুনি এক নিমিষে কেটে যায়— মন হঠাৎ করেই হয়ে ওঠে অদ্ভুত চাঙা, ফুরফুরে। কিন্তু চা গরম-এ সেই স্পর্শটা পাইনি। চা-বাগানের বৃষ্টিও আলাদা এক ভাষা— সে বৃষ্টি থামতে চায় না, মনে হয় যেন চা-শ্রমিকের কান্না, ঘাম আর রক্তেরই আরেক নাম অথবা এক অনিবার্য সর্বনাশের প্রতিধ্বনি। এই বৃষ্টির সৌন্দর্য, এই বেদনার গভীরতা— সিনেমার প্রবাহে সেভাবে উঠে আসেনি।


পঞ্চগড়ে গিয়ে কোনো এক শীতে দেখেছিলাম একটি চাগাছ— চাগাছটি আম গাছের মতো বড়। চা গরম সিনেমা দেখে জানতে পারি, চাগাছ বটগাছের মতো বড় হতে পারে কিন্তু তাকে বড় হতে দেয়া হয় না। চাগাছকে খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার স্বপ্ন। চাগাছের মতোই চাবাগানের শ্রমিক— তাদের শ্রম খেয়ে বেচে থাকে টাকাওয়ালার পেট। শ্রমিকদের ঘাম আর রক্তে টিকে থাকে, বেচে থাকে সভ্যতা অথচ তারা থাকে অন্ধকারের ভেতর আরও এক অন্ধকারে। রবিনদা শ্রমিকদের লিডার টাইপের তবে লিডার নয় ঠিক। চা গরমে তার হাটার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত। দুর্দান্ত অভিনয়। তার কথা বলার স্টাইল দুটি— আস্তে আস্তে টেনে টেনে এবং দ্রুত।  দুর্দান্ত অভিনয়।  নন্দিনি একেবারে মাটির মানুষ এবং পুরো স্কিনে তাকে মাটিঘেষা স্বপ্নপুরির মতো লাগছে। নন্দিনীর বাড়িটিও কিন্তু মাটির। দুদিন পরে মেয়েটার বিয়ে। তারপরও তার মন যেনো স্বপ্নবাড়ি। তার স্বপ্নবাড়ি যখন বাস্তবতার মুখ দেখে ঠিক তখনই সিনেমায় ড্রামাটিক প্রবাহ আসে যা দর্শকের মনে করুন রসের প্রবাহ আনে যা বীররসের আরেক নাম। 


অনেক সীমাবদ্ধতা থাকার পরও চা গরম কেবল একটি গল্প নয়— এটি একটি জীবন ধারার গল্প। এখানে নায়ক-নায়িকা নয় বরং মানুষের বেঁচে থাকা, স্বপ্ন দেখা আর সংগ্রামমুখর ইমেজই চরিত্র হয়ে উঠেছে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৬

কালের শাম

মেঘ আমি আশা ছিলো পাখি হয়ে উড়বো 

রঙিন আকাশ সবুজ পাহাড় স্বপ্নমতো ধরবো

গরম বাতাস হঠাৎ করে লাগলো আমার ডালে 

বৃষ্টি হলাম জন্ম আমার পানসে নদীর খালে 

খাল থেকে নদীতে যাবো যাবো সাগর বাড়ি 

নদী থেকে গরম বাতাস নিলো আমায় ধরি 

বাষ্প হয়ে আকাশ মাঠে মেঘ হলো আমার নাম 

মৃত্যুঘরে জন্ম হবো গল্প হবো হবো কালের শাম

রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

আশরাফুল মাখলুকাত

 — আসুন আমরা ধর্ম নিয়ে কথা বলি।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে টেবিল গরম থাকবে। টেবিলে খাবার সার্ভ না করলেও চলবে।


— আসুন অমুক ভাইয়ের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র এই বিষয়ে কথা বলি।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে মানুষ ভাইরে নিয়া পইরা থাকবো— বাইরে কি দরকার, কি দরকার না— তা নিয়ে কোনো কথা হবে না।


— বাহ! আপনার মাথায় তো ব্যাপক বুদ্ধি!


— এইভাবে প্রসংশা করবেন। তাহলে প্রসংশা নির্ভর সোসাইটি নির্মাণ হবে এবং সোসাইটি একসময় নিন্দা বা সমালোচনা সহ্য করতে পারবে না।


— তাহলে কি হবে?


— তাহলে সমালোচনা করলেই গুম হবে, এ্যারেস্ট হবে, মারামারি হবে, রাষ্ট্র অস্থির হবে, জল ঘোলা হবে, ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করবে কতিপয় সুবিধারা।


— সুবিধারা ঘোলা জলে মাছ শিকার করলে কি হবে?


তাহলে যারা সুবিধা দেন তারা দিনে দিনে সুবিধাদের হাতে মারা পরবেন এবং একসময় সুবিধা প্রদানকারী যখন থাকবে না তখন সুবিধা গ্রহণকারী এবং গ্রহণকারী মারামারি করে শেষ হয়ে যাবে!


— তারপর? 

— তারপর মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত!?

১৪৩৩ বাংলা

মুন্নী আপার সঙ্গে আমার প্রথম আড্ডা— মাটি ক্যাফেতে। আজ। আজ শুক্রবার ১৪৩৩। আপা অসাধারণ লেখেন। অনেকের কাছে তিনি একজন প্রখর সাংবাদিক, কিন্তু আমার কাছে তিনি মূলত একজন লেখক। গল্প লিখেন, কবিতা লিখেন— আর তাঁর লেখায় ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ তেমন গুরুত্ব পায় না; বরং জীবন আর ভাষার যাপনই সেখানে প্রধান হয়ে ওঠে।


শাহনাজ মুন্নী আপার কবিতায় আছে দৃশ্যায়নের ঝলক, সম্পর্কের এক সহজ, স্বচ্ছ প্রবাহ।


আমিন ভাইও আলাদা করে বলার মতো মানুষ— তিনি সুন্দরভাবে জীবনকে চর্চা করেন। তাঁর ভ্রমণসঙ্গ আমার ভীষণ ভালো লাগে। আমিন ভাই আর মুন্নী আপা ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাচ্ছেন— এই যাত্রার সঙ্গেও যেন এক ধরনের গল্প জড়িয়ে আছে।

একবার এক দূতাবাসে মুন্নী আপা কবিতা পড়ছিলেন। আমি আর আমিন ভাই গিয়েছিলাম শ্রোতা হয়ে। কবিতা পাঠ বা আবৃত্তি  শেষ হওয়ার পর এক বিদেশি কবি বললেন, “একটা প্রেমের কবিতা পড়বেন?” মুন্নী আপা হেসে বললেন, “এতক্ষণ তো প্রেমের কবিতাই পড়লাম!”


তখন বুঝলাম— তাদের কাছে প্রেমের কবিতা মানে আরও খোলামেলা, আরও প্রকাশ্য কিছু। আমরা মজা পেয়েছিলাম— সেই মুহূর্তটা এখনো মনে আছে।


মেঘনা নদীর পাড়ে ছোট্ট একটা কফির দোকান—‘মাটি ক্যাফে’। উজ্জ্বল ভাই লন্ডন থেকে ফিরে এসে এটি গড়ে তুলেছেন। নরসিংদীতে যাত্রাবিরতির দিনে সেখানে জড়ো হলাম আমরা— মুন্নী আপা, সরকার আমিন ভাই, প্রথম আলোর নরসিংদী প্রতিনিধি প্রণব দা, আর আমি।


নীরব, নির্মল বাতাস আমাদের চুপ করে থাকতে দেয়নি— আমরা কথা বলেছি। সব আড্ডা মুখর হয় না— কিন্তু আজকের আড্ডাটা হয়েছিল।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

ফুলবাহার

ফুল যখন ফুটতে চায়

ফুটতে দিও তাকে

রঙের ভেতর স্বপ্ন থাকে

গন্ধ লুকিয়ে ডাকে

কাঁটা হয়ে থেকো না আর মৃত্যুধরা হাতে

প্রতি শ্বাসে বেচে থাকো ঘাত-প্রতিঘাতে

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

জীবনের খালবিল

এক বছর আগের কথা। আমার চুল তখন বড়— ঝুটি বেঁধে রাখি। ভ্রমণে বের হয়েছি। কোনো এক গ্রাম এলাকায় ভ্রমণ করছি। রিকসাওয়ালা মামা খুবই মজার মানুষ। মামার সব কথা বেশ মজা লাগছিলো। রিকসা থেকে নেমে যাবো এমন সময় হঠাৎ করে তিনি মাটিতে শুয়ে গেলেন এবং আমার পায়ে চুম্বন করতে লাগলেন। আমি না সড়াতে পারছি পা, না সড়াতে পারছি রিকসাওয়ালা মামাকে। মানুষ জমে গ্যাছে। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলেন! সে কি কান্না!  


অবশেষে উনাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে যাই। খাবার খেতে খেতে কাহিনি কী জানতে চাই।


— যখন আপনার কাছ থেকে ভাড়া নিতে যামু তখন আমার পীরের চেহারা ভাইসসা উঠছে আপনার মধ্যে। তারপর আমি কি করছি কিচ্ছু কইবাম পারুম না। 


মামা কইবাম না পারলেও, আমি ঠিকই কইবাম পারছি। পরের দিন সেলুনে গিয়ে সব চুলকে আল্লার রহমতে ইন্নালিল্লাহি করে দিছি।


আজকের ঘটনা। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকের ঘটনা। বাজারে যাচ্ছি। খাসির মাংস খেতে ইচ্ছে করছে— ঝালঝাল করে।  মাথায় টুপি।  হঠাৎ এক লোক— চিনি না জানি না— আমাকে দেখেই বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দেয়। ওরে দয়াল— একি অবস্থা। যাক, যেকোনো উপায়ে উনাকে নিয়ে চায়ের দোকানে যাই। চা খেতে খেতে কাহিনি কী জানতে চাই। 


— ভাই, গতকাল রাতে এক ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখি। গভীর এক গর্ত। গর্তে আগুন আর আগুন। আগুনে পড়ে যাচ্ছি। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করছি। কিন্তু কোনোক্রমেই রক্ষা পাচ্ছি না— আগুনের দিকে যাচ্ছি তো যাচ্ছি। হঠাৎ একটি হাত আসে। এবং সেই হাত আমাকে রক্ষা করে। যে লোকটা আমাকে রক্ষা করে চেহারাটা হুবহু আপনার মতো। তাই আফনাকে দেখে আমার মাথা ঠিক রাখতে পারি নাই। আফনে মনে কিছু নিয়েন না ভাই। 


বাসায় আসি। বহুদিন নিজেরে আয়নায় দেখি নাই। আজকে দেখলাম। দেখি, চুল আবার বড় হয়ে গ্যাছে। টুপির নিচে বড় চুলে বেশ ভালো মানুষ  ভালো মানুষ একটা লুক আসছে।


গ্রাম এলাকায় একটা প্রবাদ আছে— আগে দর্শনধারী, পরে গুনবিচারী। আজকে থেকে প্রবাদ ঘুরে গেলো— আগে গুনবিচারী, পরে দর্শনধারী।