মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল, ২০১৯

চাকরি মানে সেবা

চাকরি মানে খেলার মাঠ নয় যে খেলতে নামলেন আর সময়ের দিকে তাকাতে থাকবেন। চাকরি মানে সেবা। সেবা করার কোনো বয়স থাকতে পারে না। কারো মনে হলো চল্লিশ বছর বয়সে চাকরি করবে মানে সেবা করবে, এক‌টি কল্যানমূলক রাষ্ট্রে সেই ব্যবস্থাও থাকা আবশ্যক। পৃথিবীর কোথাও কী আছে এটা দেখা খুব জরুরী নয়, পৃথিবীর কোথাও কী আমরা রপ্তানি করবো এটা দেখার বিষয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই, এই বাংলায় আছে, আমরা তাঁর আদর্শ পৃথিবীর অন্য দেশে রপ্তানি করতে পারি এবং করেছি। এই লেংদেয়া বয়সীনীতি জাতিকে মানসিকভাবে দুর্বল করে তুলে, মানসিকভাবে দুর্বল জাতি উন্নত রাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারে না। সাহসিক মানসিকতাও একটি জাতির বিশাল সম্পদ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সাহসের চিহ্নসূচক।

এক‌টি কথা প্রচলিত আছে। আর তাহলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া মেধার দিক থেকে তৃতীয় নাম্বার ছাত্রটি হয় রাজনীতিবিদ, দ্বিতীয় নাম্বার ছাত্রটি হয় আমলা, আর প্রথম নাম্বার ছাত্রটি হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের সেবার সাথে জড়িত। রাজনীতিবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষক হওয়ার ব্যাপারে কোনো বয়সফ্রেম নেই। আমলাতান্ত্রিক সেবার সাথে মানে চাকরির পাওয়ার ব্যাপারে বয়সফ্রেম থাকবে কেন!?

চাকরি হলো পোশাক যা মানুষের সামাজিক মর্যাদার সাথে জড়িত, সামাজিক মর্যাদা না থাকলে মানুষ মারা যায় না কিন্তু মানুষকে বেঁচে থাকতে গেলে সামাজিক মর্যাদার প্রয়োজন হয়। সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি নিশ্চিতকরন একটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক কয়েকটি কাজের এক‌টি। যে জাতি যত বেশি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন সেই জাতি তত বেশি উন্নত। উন্নত মানে ব্রিজ কালভার্ট নির্মান নয়। ব্রিজ কালভার্ট যদি মানসিক প্রশান্তির কারন না হয় তাহলে তা অবনতির নামান্তর।
ত্রিশ বছর পর কোনো স্টুডেন্ট আর স্টুডেন্ট থাকে না। ত্রিশ বছরের পর কোনো স্টুডেন্টের সার্টিফিকেট আর কোনো কাজে আসে না। চাকরি একজন স্টুডেন্ট না-ই পেতে পারে, সবাই শুধু  চাকরি করবে এটিও একটি জাতির জন্য আশাব্যঞ্জক কথাপ্রবাহ নয় কিন্তু ....ত্রিশ বছরের পর একজন স্টুডেন্টের সার্টিফিকেট মৃত বলে ঘোষিত হবে তা মেনে নেওয়ার নয়। ঘর বড় না করে ঘরের বড় মানুষদের ঘর থেকে বের করে দেয়ার নীতি কখনো সুস্থ সাবলীল হতে পারে না।

কবিতা লিখে সিনেমা নির্মান করেও এক‌টি জাতির উপকার করা যায়। কারো মনে হতে পারে পুলিশ হয়ে এক‌টি জাতির উপকার করবে। কারো মনে হতে পারে পলান সরকার হয়ে এক‌টি জাতির উপকার করবে। বয়সফ্রেম উপকার করার পথে অন্তরায় হয়ে কাজ করতে পারে না।

জনগন যদি বলতে শুরু করেন রাষ্ট্র পরিচালনা অনেক কঠিন কাজ। রাষ্ট্র পরিচালকের শুধু অভিজ্ঞতা থাকলে হবে না বয়সও থাকতে হবে, আই মিন বয়সের এক‌টি সীমানা থাকতে হবে। তাহলে?তাহলে আমরা অনেক গুরুত্বপূর্ন রাজনীতিবিদদের হারাতে পারি অথবা  বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাতে পারি। জনগন তা করবে না। কারন জনগন রাজনীতিবিদদের কাছে দেশটা বলতে গেলে বাগি দিয়ে দিছেন!

চাকরির বয়সসীমা বেঁধে দেয়ার মধ্যে এক‌টি চালাকি রয়েছে। বয়সসীমার ভেতরে যারা চাকরি পায় না তারা সরকারি খাতায় বেকার। বেকারদের নিয়ে সরকারের যত টেনশন। গরীব পরিবারের সন্তান হয় বিদেশে গিয়ে টাকা পাঠালে পরিবারের লাভ নতুবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা একা বসবাস করলে পরিবারের লাভ। অর্থাৎ পরিবার চায় সন্তান এক‌টি অর্থকরী ফসল হয়ে উঠুক। সন্তান যদি অর্থকরী ফসল না হতে পারে তখন পরিবার চায় সন্তানটি অন্তত নিজের মতো থাকুক ভিক্ষাবৃত্তি করে হলেও। গরীব রাষ্ট্রের চিন্তাও ঠিক গরীব পরিবারটির মতো।

একবার ভেবে দেখুন ত বয়সসীমা যদি একটি মানুষের কার্যদক্ষতার সীমা হয় তাহলে আমরা পৃথিবীর কত কত বড় বড় মানুষদের কার্যসেবা থেকে বঞ্চিত হতাম। আল্লা যদি মনে করতেন ত্রিশের পর একজন মানুষ প্রায় সেবা দেয়ার উপযোগ হারিয়ে ফেলে। তাহলে কী হতো!? কী হতো জানি না, তবে আমরা কুরান শরীফ নাও পেতে পারতাম!

জনগন কোনো এক সাংবিধানিক সত্ত্বাকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। কেন দিয়েছে? দিয়েছে কারন জনগন ভালো থাকতে চায়।

সাংবিধানিক সত্ত্বা কখনো নিজেকে জনগনের মালিক মনে করা ঠিক নয়। জনগন সাংবিধানিক সত্ত্বার কামলা না। জনগন নিজের প্রয়োজনে সংবিধান নির্মান করে আবার নিজের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করে। সাংবিধানিক সত্ত্বা যখন ক্ষমতার লোভে জনগনকে ধোঁকা দিতে চায় জনগন তা উপলব্ধি করার যথেষ্ট জ্ঞান প্রজ্ঞা রাখে। কারন বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে স্বাধীন হয়েছে অনেক আগেই, এখন বাংলাদেশ যথেষ্ট সাবালক। সাবালক বাংলাদেশকে পরিচালনা করতে গিয়ে নাবালকের মতো কাজ করবেন তা কখনো সময় মেনে নিবে না। সময় কখনো লজিক দেখায় না, ম্যাজিক দেখায়। সময়ের ম্যাজিক দেখার আগে আমাদেরকে ন্যায় নিষ্ঠাবান দায়িত্বশীল ও সত্যবাক হতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পৃথিবী থেকে চলে যাবার পর বাংলাদেশটা যেন তাদের কাছে শিশুখেলনা আর তারা তা দিয়ে ঝুনঝুনি বানিয়ে আনন্দ খেলছে। দেশটাকে নিজের বগলের সম্পত্তি না ভেবে জনগনের আমানত ভাবতে শিখুন। নতুবা কবি বলে উঠতে পারে "ভাত দে হারামজাদা নতুবা মানচিত্র খাব।" ভাতের ধারনা কোনো  সময় মৌলিক চাহিদা আবার কোনো সময় মৌলিক মর্যাদার দিকে ইঙ্গিত করে।

একজন ছাত্রের প্রথম অধিকার পড়াশোনা শেষ করার পর চাকরি পাওয়ার অধিকার। তারপরও জীবনানন্দ দাশ কেন লিখবে "পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি।" পৃথিবীতে বিশুদ্ধ চাকরি নাই, কারন পৃথিবীর গভীর থেকে গভীরতম অসুখ। সিংহাসন চালায় শিয়াল অথচ সিংহাসনে বসার কথা ছিল সিংহের। কর্নেল তাহের শেষ পর্যন্ত শিয়ালের সাথে পেরে উঠতে পারেননি। তাইতো এখনো লক্ষ লক্ষ বেকার যুব সমাজ। লাখ লাখ বেকার স্টুডেন্ট হতাশার জোয়াল কাঁধে গরু হয়ে ঘাস খাবে আর আপনি কনট্রাক্টর হয়ে নতুন নতুন গোয়ালঘর তৈরি করবেন আর বলবেন দেশ উন্নত হচ্ছে। ভুল। সব ভুল। আপনার কথায় যথেষ্ট ঝাল থাকলেও তা জনগনের জিহ্বা পর্যন্ত পৌঁছবে না।

চাকরি ইজ চাকরি। দেশকে দেশের মানুষকে দেশের ভৌগলিক অবস্থানকে কল্যানমূলক করে রাখার জন্য দেশের প্রতিটি জনগনকে চাকরের মতো আন্তরিকভাবে কাজ করা প্রতিটি পদক্ষেপই চাকরি। চাকরিকে কোটটাই অফিস আদালত, ইউনিফর্ম ইউনিভার্সিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা খুব আদিম পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনা।

সৈয়দ শামসুল হক প্রায় নয়টার ভেতরে স্নান খাওয়া শেষ করে অফিসে যেতেন। তাঁর অফিস কোথায় জানেন? তার ফ্লাটের আরেকটি রুম, আরেকটি রুমের এক‌টি টেবিল যেখানে তিনি পড়াশোনা ও লেখালেখি করতেন। সৈয়দ শামসুল হকের কাছে পড়াশোনা ও লেখালেখি করাটা ছিল চাকরি। তাই আমাদের প্রত্যেকের চাকরি করতে হবে এবং রাষ্ট্রকে আমাদেরকে চাকরি করার সমস্ত ব্যবস্থা করে দিতে হবে, তার জন্য অবশ্যই কোনো বয়সফ্রেম থাকবে না। কারন আমরা কাজী নজরুল ইসলামের "যৌবনের গান"  প্রবন্ধটি পড়েছি, আমরা জানি যৌবন আর বার্ধক্যের পার্থক্য কোথায় কেমন!?

সোমবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৯

জামাইবাবু

বিয়ের প্রথম কয়েক বছর পাওয়ারপ্লে চলে। এই সময়টাতে জামাইবাবু চার ছক্কা পিটায়। এই সময়টাতে জামাইবাবুকে বিরক্ত না করা ভালো। মানে তাকে তার মতো খেলতে দেন। এই সময়টাই রান তুলে নেয়ার যোগ্য সময়। একসময় ফিল্ডার সারা মাঠ ছড়িয়ে যায়। তখন জামাইবাবু আস্তেধীরে ইনজামাম কিংবা রাহুল দ্রাবিড়ের মতো দেখেশুনে খেলে। তখন পানি পানের বিরতিও চলে। তখন জামাইবাবুকে চা খাওয়ার জন্যে ডাক দেয়া যেতেই পারে। চল্লিশের শেষে আবার পাওয়ারপ্লে। তখন কিন্তু আবার চার ছক্কা পিটানোর মৌওসুম। তখন জামাইবাবু আবার ব্যস্ত হয়ে পড়বে। তখন আবার তাকে তার মতো খেলতে দিতে হবে।

জামাইবাবুদের খেলা শেষ হয় না। তবে অনেকে অধিক খেলতে গিয়ে মাঠ ছাড়তে হয়।

শনিবার, ২৭ এপ্রিল, ২০১৯

চাচা মিয়া

ঠিক মাথার উপরে। আকাশটা ঠিক মাথার উপরে। সূর্যটাও। তেষ্টা পেয়েছে খুব। আশেপাশে টিউবওয়েল খুঁজে যাচ্ছি। পেয়েছি বটে। পঞ্চাশোর্ধ্ব এক চাচা জল পান করছেন-- এক গ্লাস দুই গ্লাস তিন গ্লাস। অবাক করা ব্যাপার। দেখলাম চাচা মিয়া দোকান থেকে দুপুরের খাবার খেলেন মাত্র। খাবার খাওয়ার পর একজন মানুষ এতো জল খেতে পারে!?

চাচা, এতো জল খাচ্ছেন, কোনো সমস্যা?

না। ডাক্তর কইছে হাওনের ফর যতলা ফানি হাওন যা অতলা হাইবার লাইগগা। আগে হাওনের ফর সাত আট গেলাস ফানি হাইতে ফারছি, অহন ফারি না।

চাচা মিয়া খাবারের সাথে সাথে এতো পানি পান করা ঠিক না।

কী কও মিয়া, আমার ডাক্তর লন্ডন থেইক্কা চ্যালেস কইরা পাস কইরা আইছে, অত বেশি বুইঝ না, বেশি বুঝা বালা না।

লন্ডন থেকে চ্যালেঞ্জ করে যে ডাক্তার পাশ করে আসে সেই ডাক্তারের রোগী পানি কেন যেকোনো বিষ খেলেও হজম হয়ে যেতে পারে,  তাই বুঝলাম চাচাকে বুঝানোর ক্ষমতা আমার নেই, নিজেই কম বুঝে জল পান না করে রাস্তা বরাবর সোজা হাঁটা ধরলাম, ততক্ষনে চাচা মিয়া আরও এক গ্লাস জল খেয়ে নিলেন।

বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৯

সাধারন

সাধারন এমন অসাধারন যে চোরকে মারে কিন্তু সন্ত্রাসকে ভয় পায়

বুধবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৯

একলা ঘরে একলা আকাশ

আকাশের ভীষন জ্বর
জঙ্গলে নেমেছে ঝড়
মাথার উপর কঠিন তুফান
আকাশের লাগছে ডর
মা গেছেন সুদূর জাপান
বাবা গেছেন বনে
বড় দাদা ডেটিংয়ে গেছেন
সুস্মিতা সেনের সনে
পাড়াত সব মানুষ আছেন অফিস টুফিস কাজে
বন্ধুরা তার ব্যস্ত চরম কোচিং টুচিং সাজে
একলা ঘরে একলা আকাশ সকাল থেকে রাত
বাড়তে থাকে নিজের সাথে আকাশের সংঘাত
বাবা ফিরেন গভীর রাতে
দাদা ফিরেন গভীর প্রাতে
মাও তার খোঁজ নেন রোজ আপডেট ইমোতে
একলা ঘরে একলা আকাশ সকাল থেকে রাত
সুখের আগুনে সিদ্ধ আকাশ যেন চুলার ভাত

মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৯

আমার মতো যেদিন পৃথিবী হবে

ছোটকাল থেকে আমার একটা বিশেষ রোগ আছে। আর তাহলো সাজানো রোগ। আমার চারপাশটাকে সব সময় সাজিয়ে রাখতে চাই। সাজানো যেকোনো কিছু  আমার ভালো লাগে খুব করে।

যেদিন থেকে পড়ার টেবিল বলে কিছু একটা আছে সেইদিন থেকে আমার টেবিলে অন্য কারো হাত দেয়া বারন। একটা পোকাও যদি আমার টেবিলের উপর দিয়ে হেঁটে যেতো কোনো প্রকার সিসি ক্যামেরা ছাড়াই আমি টের পেতাম। টেবিলে হাত দেয়া বারন কারন অন্য কেউ হাত দেয়া মানে অগোছালো করে ফেলা। আমি দেখেছি আমি ব্যবহারিক জিনিস সম্পর্কে যত যত্নবান তত যত্নবান মানুষ আজও আমার চোখে পড়েনি।

অনেকে নিজের জিনিসটা খুব যত্ন করে রাখে কিন্তু অন্যের জিনিসের প্রতি উদাসীন। আমি নিজের জিনিসের চেয়ে অন্যের জিনিসের প্রতি অধিক যত্নবান। হ্যাঁ। দায়িত্ব নিয়ে বলছি।

আমরা যদি আমাদের চারপাশটা সুন্দর পরিচ্ছন্ন মার্জিত করে রাখি তাহলে কী খুব অর্থের প্রয়োজন!?

অবশ্যই না।

জাস্ট ইচ্ছার প্রয়োজন।

বাড়িতে আমাদের ঘরের সামনে যে ফুলের বাগান আছে তা আমার চেষ্টায় করা। ফুলের বাগান করার পর দেখা গেল বাড়ির লুকই দৃ‌ষ্টিনন্দনের ডাক খায়। পেয়ারা গাছের চারপাশ সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে ঘের দেয়ার পর পেয়ারা গাছের পরিবেশ অন্যরকম সৌন্দর্যের হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে। এই কাজগুলো করেছিলাম ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার আগে। কাজগুলো করতে আমার অনেক টাকা খরচ হয়নি। জাস্ট ইচ্ছা করেছিলাম। লালপুর বাজার থেকে কয়েকটি ফুলের চারা কিনে আনছিলাম। ইট বাড়িতেই ছিল। এক বিকালে কয়েক ঘন্টার জন্য এক ইটমিস্ত্রিকে ডেকে আনি এবং কাজ শেষে তার হাতে তিনশত টাকা তুলে দেই। বেস-- হয়ে গেলো।

তারপর হাসনাহেনা ফুল কিনে আনি। যেহেতু রাস্তার পাশেই আমাদের বাড়ি সেহেতু জোছনা রাতে হাসনাহেনা যখন গন্ধ ছাড়ে প্রায় মানুষ কিছুক্ষনের জন্যে হলেও একটু দাঁড়ায়। তাতেই পথিকের আনন্দ, আমারও আনন্দ।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এক রুমে আটজন থাকতাম। আটজন এক রুমে রিফিউজিরাও থাকে না। একটা গোয়াল ঘরেও গরু হিসাব মাফিক রাখা হয়। আটজন কেমন করে এক রুমে থাকতাম তা ভাবতে গেলে ঘৃনায় লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে। কাছের ছোট ভাই বড় ভাই সারা বাংলাদেশেই আমার আছে। কাছের মানে খুব কাছের। তারা রাতে আমার সাথে থাকতে চায়তো মাঝেমধ্যে কিন্তু তাদেরকে আমি রাখতে পারতাম না। সরকারি হাসপাতালের বেডের চেয়েও ছোট বেডে দুইজন থাকতাম, দুজন করে চারটি বেডে আটজন। নিজেদের কার্বনডাইঅক্সাইডে যখন রাত বাড়ার সাথে সাথে রুম ভার হয়ে আসে তখন অতিথিদের এনে কষ্ট দেয়ার চিন্তা কবিরা গুনার শামিল। কবিরা গুনা মানে বড় অপরাধ।

একবার মনে আছে গভীর রাতে আমার সেনাবাহিনী ভাই ফোন দেন। রাতে আমার সাথে থাকতে চান। আমি ভাইকে না করতে পারিনি, আবার আমার রুমেও নিতে পারিনি। সোহেলের সাথে ভাইকে রাতে থাকার ব্যবস্থা করে দেই। সোহেল এখন বাংলাদেশ পুলিশে আছে। কেউ যখন আমার সাথে থাকতে চায়তো আমি যখন না করতে পারতাম না তখনই আমি সোহেলকে ফোন দিতাম। সোহেল খুব ভালো অবস্থায় থাকতো এমন না। আমার অবস্থা দেখে আমার মানুষেরা কষ্ট পাক তা আমি চাইতাম না। সোহেল থাকত সূর্যসেন হলে আর আমি থাকতাম••••। যাক আমার হলের নামটা নাইবা বললাম।

যেহেতু ঢাকা মেডিকেলের পাশেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেহেতু প্রায় পরিচিত মানুষ একটা রাত থাকার জন্যে ফোন দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের খুব বড় মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে সমাদৃত। ফলে এখানে যখন কেউ পড়তে আসে তার প্রতি স্বাভাবিকভাবে অন্যদের নিডসাম ডিমান্ড অধিক থাকে। তারপরও  হলজীবনে রুমে আমি কোনো গেস্ট আনিনি। আমার কাছের কয়েকজন আমার রুমে ছিল কিন্তু তখন রুম একেবারে ফাঁকা ছিল। অর্থাৎ কোনো ছুটিতে সবাই যখন বাড়ি যায় বা রুমের সদস্য সংখ্যা যখন কোনো কারনে দুইতিন জন থাকতো আমি রুমে কয়েকজনকে এনেছি বিচ্ছিন্নভাবে। তবে তা খুবই নগন্য ঘটনা। আমি যাদের সাথে বেড শেয়ার করতাম তাদের প্রায় গেস্ট আসতো।

একদিন রাতে চাঁদপুরের এক গেস্ট আমার সাথে থাকে। আমি তাকে চিনি না। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে অনেক রাতে হলে ফিরতাম। আমি ওয়াশরুমে গেলে আমার সাথে একজনের প্রায় দেখা হতো। তিনি হলেন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সোহাগ ভাই। ভাই আমাকে দেখে একটা হাসি দিতেন, আমিও হাসি দিতাম। সোহাগ ভাই ফ্রেশওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করতেন। ভাইয়ের দেখাদেখি আমিও একটা ফ্রেশওয়াশ কিনে আনি। একদিন ব্যবহার করেছিলাম। তারপর আর ব্যবহার করা হয়নি। ফ্রেশওয়াশ দিয়ে মুখে ঢলাঢলি খুবই ক্লান্তিকর ব্যাপার।

বলছিলাম অনেক রাতে হলে ফিরে দেখি একজন অপরিচিত ছেলে বেডে শুয়ে আছে। বুঝতে পারি গেস্ট। অনেক অস্বস্তি থাকার পরও আস্তে করে শুয়ে পড়ি। শুয়ার কিছুক্ষনের মধ্যে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসি। না না। কোনো বাজে স্বপ্ন দেখার ব্যাপার স্যাপার না। আমার মুখ ভরে গ্যাছে ছেফে। ছেফে মানে থুথুতে। আমার পাশে ঘুমানো অতিথি কাকে যেন স্বপ্নে গালি দিচ্ছে আর ছেফ দিচ্ছে। স্বপ্নের সেই ভাগ্যবান লোক কে আমি জানি না কিন্তু বাস্তবের ভাগ্যহত লোকটি আমি। তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে যাই এবং স্নান করি। তারপর সেই রাতে আর ঘুমাইনি। মলচত্ত্বরে হাঁটতে হাঁটতে সকাল করে ফেলি।

হলজীবনে আমরা যে রুমে থাকি তা পরিষ্কার করার জন্য প্রতিদিন সকালে একজন আসেন। তিনি কোনোরহমে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্বখানা পালন করে যান। যে ময়লা বসবাস করে রুমে আল্লার রহমতে সেই ময়লাই থেকে যায়। তাছাড়া রুমসদস্য বাইরে থেকে এসেই বিছানায় শরীর লেলিয়ে দেন। পায়ের ময়লা পায়ের জায়গায় থাকে না-- বিছানায় যায়। প্রথম প্রথম খুব ঘেন্না লাগতো। আস্তে আস্তে আমিও তাদের মতো মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল জীবনমতো হয়ে উঠি। ডাস্টবিন সামথিংকে ডাস্টবিন হুলথিং ভাবতে শিখি।

আমার এক প্রিয় ভাইয়ের রুমে আমি প্রায় থাকতাম। ভাইয়ের রুম ঢাকা শহর থেকে একটু দূরে। ভাই আমাকে প্রায় গালি দিতেন। গালি দেয়ার কারন পরিচ্ছন্নতা বিষয়ক। ভাইয়ের গালি শুনে আমি মনে মনে হাসতাম। গামছা বাথরুমে রেখেই বের হয়ে যেতাম। ভাই এ জন্যে গালি দিতেন। বাথরুম শেষে এক বালতি পানি ঢালার জন্যে বলতেন, আমি তা করতাম না, ভাই এ জন্যে গালি দিতেন। ভাইয়ের গালি শুনে আমি মনে মনে হাসতাম। কারন তিনি যে পরিচ্ছন্নতার কথা বলতেন তা অনেকটা ডাস্টবিনে পারফিউম দেয়ার মতো। তাই আমি ভাইয়ের পরিচ্ছন্নতার জ্ঞান দেখে ভেতরে ভেতরে হাসতাম।

পরিচ্ছন্নজ্ঞান আর রুচিবোধের চমৎকার এক জায়গা আবিষ্কার করেছিলাম সাবিতা আপার বাসায়। সাবিতা আপা আমাদের চীনাগ্রুপকে তাঁর বাসায় নেমন্তন্ন দেন। আমরাও যাই। গিয়ে অবাক হয়ে যাই। কত সুন্দর করে সাজালেন তিনি তাঁর চারপাশ! আপা সুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট। আপা যেমন করে তাঁর ফ্লাট সাজাতে পেরেছেন তেমন করে কী হলকে সজ্জিত করতে পেরেছেন!? মন এক, সৌন্দর্যচেতনা এক, তাহলে ব্যষ্টিক আর সামষ্টিক জায়গায় এতো পার্থক্য কেন!?

অবশ্যই কারন রয়েছে। পাহাড় সহনশীল বলেই আমরা পাহাড় বেয়ে উঠতে পারি। চারপাশকে গোছানো আর পরিচ্ছন্ন করে গড়ে তুলার জন্য যে সহনশীল মানসিকতা প্রয়োজন তা আমাদের নেই। আমরা টাকার উপরে ঘুমাতে রাজি আছি কিন্তু সৌন্দর্যের ভেতর ঘুমাতে অক্ষম।

ছোটকালে ইসলাম শিক্ষা বইয়ে পড়েছিলাম পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ। বই থেকে কথাটি জানার আগেও পরিচ্ছন্নতা আমার চরিত্রে ছিল। চরিত্রে ছিল থাকবে আছে। এখন আর টেবিল না-- পুরো ফ্লাট পরিচ্ছন্ন রাখি। একদিন! একদিন পুরো পৃথিবীটা পরিচ্ছন্ন গোছানো স্বাস্থ্যকর করে রাখবো!!

সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৯

প্র শ্ন

আল্লার কথা মানেনি হাওয়া, মানুষের কথা কেমনে মানবে হাওয়ার সন্তান!?